এগোচ্ছে অর্থনীতি ॥ প্রধান ৬ সূচকে ইতিবাচক ধারা

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বিদায়ী বছরের পুরোটা সময় অর্থনীতির প্রধান ছয় সূচকে ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল। এর মধ্যে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেড়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কমেছে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার কমানো হয়েছে। ব্যালান্স অব পেমেন্ট ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল, চলতি আয় ইতিবাচক। জানুয়ারিতেই আরেক দফা জ্বালানি তেলের দাম কমানো হবে। এতে করে শিল্পের উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে। বাড়বে বিনিয়োগ। সব মিলিয়ে রূপকল্প-২১ সামনে রেখে যেসব অর্থনৈতিক কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে তার পুরোটা বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রতিটি সূচকে দেশের অর্থনীতি এখন স্থিতিশীল, প্রাণোদীপ্ত, অগ্রসরমান। এই সময়ে রফতানি আয় বেড়েছে, রেমিটেন্স প্রবাহ একটু কমলেও আবার তা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হলেও দাতারা বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন করে অর্থায়ন করছেন। মেগা দশ প্রকল্প বাস্তবায়নে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকেও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দাতাদের প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জনকণ্ঠকে বলেন, বিদায়ী বছরজুড়েই অর্থনীতিতে স্বস্তি ছিল। বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বড় বড় অবকাঠামো বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। তিনি বলেন, মধ্য আয়ের দেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। রূপকল্প-২১ সামনে যেসব অর্থনৈতিক কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে তার সবটাই বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন করতে চায়। তিনি বলেন, বিশ্ব বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হবে। শীঘ্রই অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এদিকে, অর্থনীতির এতসব ভাল খবরের মধ্যে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা চাপে আছে অর্থনীতি। বিনিয়োগ বোর্ডের ওয়ান স্টপ সার্ভিস এখনও বাস্তবায়ন হতে পারেনি। চাহিদা অনুযায়ী উদ্যোক্তারা কলকারখানায় গ্যাসের সংযোগ পাচ্ছেন না। কারখানা গড়তে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত জমি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বেসরকারী খাতের বিনিয়োগে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে করে কর্মসংস্থানেও বাড়ছে নতুন চ্যালেঞ্জ। নতুন বছরে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনে ছয়টি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এগুলো হলো-দুর্বল অবকাঠামো, অর্থনৈতিক বহিমুখিতার অভাব, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, বন্দর সমস্যা, অদক্ষ শ্রমশক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ, জনসংখ্যার চাপ ইত্যাদি। তবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখার জন্য বেসরকারী খাতের বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অর্থনীতির সব সূচকে ইতিবাচক ধারা বজায় থাকায় ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৪ লাখ কোটির বাজেট দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। রূপকল্প-২১ বাস্তবায়নে বাজেটে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হবে দারিদ্র্য বিমোচনে। অবকাঠামো উন্নয়নে পদ্মা সেতুর পাশাপাশি আরও ৯ মেগা প্রকল্প দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ থাকবে নতুন বাজেটে। এজন্য বরাদ্দও বাড়ানো হবে। আয় বাড়াতে করদাতার সংখ্যা ১১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২০ লাখে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ট্যাক্স জিডিপি বাড়াতে আয়কর প্রদানে সক্ষম এমন সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করজালে নিয়ে আসার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের শেষ অর্থবছরে ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। শুধু তাই নয়, এই বাজেট অর্থমন্ত্রী স্বয়ং ঘোষণা দেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক অনুষ্ঠানে মুহিত বলেন, এই সরকারের শেষ সময় ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেট দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান যুব সমাজ যেভাবে কর প্রদানে এগিয়ে আসছে তাতে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা অসম্ভব নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় ৯২ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে। সেই বাজেটের আকার প্রায় পাঁচগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমান ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন হচ্ছে।

তবে রূপকল্প-২১ বাস্তবায়নে যে প্রস্তুতি রয়েছে তাতে আগামী অর্থ বছরে সোয়া চার লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমান সরকারের। বাজেটের আকার এবং আয়-ব্যয় নিয়ে অর্থবিভাগ ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সোয়া চার লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হতে পারে। তিনি বলেন, বাজটের আকার কিছুটা বাড়তে পারে বা কমতে পারে। বিষয়গুলো নিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। সরকারের আয় যেমন বাড়ছে তেমনি ব্যয়ের খাতও বেড়ে যাচ্ছে। বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে এখন ভাল অবস্থায় রয়েছে।

১০ মেগা প্রকল্পের বরাদ্দ ॥ পদ্মা সেতুসহ ১০ মেগা প্রকল্পের জন্য চলতি বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনে চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ১০টি মেগা প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ‘কাঠামো রূপান্তরে বৃহৎ প্রকল্প ঃ প্রবৃদ্ধি সঞ্চারে নতুন মাত্রা’ শীর্ষক একটি পৃথক বাজেট বইও প্রকাশ করেছে অর্থমন্ত্রণালয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-বিভাগের অধীনে এডিপি’র আওতায় অবকাঠামো খাতের ফাস্ট ট্র্যাক হিসেবে চিহ্নিত ১০টি প্রকল্পের মধ্যে আটটি প্রকল্পের (এলএনজি ও সোনাদিয়া ব্যতীত) মোট প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটেই এই দশ প্রকল্পের জন্য এডিপিতে মোট ১৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট এডিপির প্রায় ১৭ শতাংশ। আগামী বাজেটে এই বরাদ্দ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়। এদিকে মেগা প্রকল্পের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে চললেও রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর ও পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণের কাজ চলছে ধীরগতিতে। যদিও পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র ও মেট্রোরেল প্রকল্পের অগ্রগতি ভাল। ফাস্ট ট্র্যাক হিসেবে এ সব প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। প্রথম পর্যায় মেগা ৬টি প্রকল্পকে ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। পরবর্তী সময়ে যুক্ত করা হয় মাতারবাড়ি বিদ্যুতকেন্দ্রও পায়রা সমুদ্রবন্দর প্রকল্প।

রফতানি আয় ॥ গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রফতানি আয় ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। মোট রফতানির ৮২ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু রফতানি আয় বাড়াতে হলে রফতানিযোগ্য পণ্যের সংখ্যা এবং পরিমাণ বাড়ানো দরকার। এক্ষেত্রে পাট, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, পশুর চামড়া, মৎস্য, চা, ওষুধ, টিনজাত পণ্য, সিমেন্ট, গরুর মাংস, দুধ, মুরগির মাংস, চাল, শাকসবজি ইত্যাদি রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে আশার কথা, বাংলাদেশের অপ্রচলিত পণ্যের রফতানি বেড়েছে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে অর্থনৈতিক অঞ্চল ॥ এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি ও দেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টায় মোট ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এখান থেকে রফতানি আয় করা যাবে অন্তত ৪ হাজার কোটি ডলার। ইতোমধ্যে সরকারী ও বেসরকারীভাবে অনুমোদিত মোট ৩৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। এ ছাড়া অনুমোদনের অপেক্ষায় অন্তত আরও ৩১টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। পর্যায়ক্রমে আগামী ১৫ বছরে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে সরকার। এছাড়া বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর গত ৭ বছরে বিদ্যুত উৎপাদনে ও বিতরণে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে। বিদ্যুত ও জ্বালানি বিভাগ সূত্রানুসারে, বিদ্যুতে গ্যাসের বর্তমান নির্ভরতা ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪২ শতাংশ করা, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদন ২ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার মাধ্যমে ৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করা, উচ্চ মূল্যের আমদানিনির্ভর তেলভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদন ৩০ থেকে কমিয়ে ১৩ শতাংশ করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এছাড়া বিনিয়োগ বাড়াতে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হয়েছে।

মানবসম্পদ ও সামাজিক খাতে অগ্রগতি ॥ দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সরকার সামাজিক উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আগামী ১০ বছরে ১৫ লাখ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করতে চাচ্ছে সরকার। বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান তিন খাত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ৮৬ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ২৬ শতাংশ। শিক্ষায় ৪৯ হাজার ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, মানব সম্পদ উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের বেসরকারী খাতের ব্যবসায়ীরা এখন দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের কথা চিন্তা করেন। বাংলাদেশ হলো দক্ষিণ এশিয়ার পরবর্তী উদীয়মান শক্তি। অর্থনীতির পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে দক্ষমানব সম্পদ উন্নয়ন সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। এছাড়া গত এক বছরে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে সরকারী-বেসরকারীখাতের বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করেছে। এছাড়া বৈদিশক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। রিজার্ভের এই অর্থ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার এখন অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।