আকাশচুম্বী সাফল্য

গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষায় এবারও আকাশচুম্বী সাফল্য অর্জন করেছে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। সৃজনশীল পদ্ধতির ভয়কে জয় করে পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তি বৃদ্ধি, ছেলেদের পেছনে ফেলে মেয়েদের সামনে চলে আসা, ঝরে পড়া কমে যাওয়া, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি ও শতভাগ ফেল করা স্কুল কমে যাওয়া থেকে শুরু করে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে শিক্ষার সকল সূচকেই। প্রাথমিক সমাপনীতে পাসের হার শতভাগের কাছাকাছি ৯৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৮৪৬ জন। ৯৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ পাস আর দুই লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৮ জিপিএ-৫ পেয়ে জেএসসি ও জেডিসির শিক্ষার্থীরাও চমকে দিয়েছে সকলকে। শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও পরীক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এবারের দুই সমাপনীর সাফল্যকে দেখছেন ইতিবাচক হিসেবেই। অনেকে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ফলে শিক্ষার সব সূচকে অগ্রগতির বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। এছাড়া দেশের সর্ববৃহৎ দুই পরীক্ষাতেই ছাত্রদের পেছনে ফেলে ছাত্রীদের এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে সবচেয়ে বড় সাফল্য বলেও মনে করছেন অনেকে। কারণ এর আগে কয়েকটি সূচকে মেয়েরা এগিয়ে থাকলেও আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ছেলেরা এগিয়েছিল। তবে এবার সাধারণ স্তরের সঙ্গে মাদ্রাসায়ও মেয়েরা পেছনে ফেলেছে ছেলেদের। শিক্ষক ও পরীক্ষকরা বলছেন, এবার কোন পরীক্ষাতেই ছিল না গত কয়েক বছরের মতো প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ, আবার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও কমেছে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা। মফস্বলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দেখিয়েছে চমক। ফলে নেই বিভাগীয় শহরের শিক্ষার্থীদের একচেটিয়া সাফল্য। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় দেশের ১৭টি উপজেলায় একজন শিক্ষার্থীও ফেল করেনি, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার এই চিত্র ইতিবাচক।

কিন্তু প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের পাবলিক পরীক্ষার এই সাফলের পেছনের কারণ কী? জেএসসি ও জেডিসি শিক্ষার্থীদের বিরাট সাফল্যের পেছনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেশ কিছু উদ্যোগ ভূমিকা রেখেছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলছেন, বিনামূল্যে সঠিক সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেয়া, নিয়মিত নির্দিষ্ট তারিখে পরীক্ষা শুরু ও শেষ করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান শুরু হওয়া, টেলিভিশনে সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেরা শিক্ষকদের পাঠদান প্রচার, নকলবিরোধী ব্যাপক প্রচারণাসহ নকল প্রতিরোধে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ ও তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ভাল ফলে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। প্রাথমিক ও ইবতেদায়ীতে শিশুদের সাফল্য নিয়ে প্রায় একই কথা বলেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। তিনি বলছিলেন, শিক্ষার্থীরা ভাল ফল করছে কারণ তারা পরীক্ষায় ভাল করছে। শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ ও শিক্ষার্থী অভিভাবকদের চেষ্টার ফল আজকের এ সাফল্য। শিক্ষার সকল সূচকেই শিশুরা ভাল করেছে। নারীরা দেখিয়েছে বিশাল সাফল্য। তাা পেছনে ফেলেছে ছেলেদের।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি, মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি হয় না। বেসরকারী স্কুলগুলোতে শতভাগ পাস করলেও তাতে উদ্বেগের কিছু নেই। সরকারী স্কুলের সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। এসব স্কুলে শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। তবে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। তাতে ২০১৭ সালে এই সংকট থাকবে না। শিক্ষার্থীদের গাছতলায় বসে ক্লাস করতে হবে না। তখন ফল আরও ভাল হবে।

মন্ত্রী অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের বিষয়ে বলেন, ২০১০ সালের শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ছেড়ে দিতে চান। এজন্য আমরাও নানা উদ্যোগ নিয়েছি। তবে কেবিনেট থেকে যেদিন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে সেদিনই আমরা দায়িত্ব নিব। তাই পিইসি পরীক্ষার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত কেবিনেট থেকেই আসতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উদার নম্বর বা শতভাগ পাস করানোর বিষয়ে আমাদের কোন নির্দেশনা নেই। একজন শিক্ষার্থী যে নম্বর পাবে, তাকে সেটাই দিতে বলা হয়। শিক্ষার্থীরা ভাল ফল করছে তাদের যোগ্যতায়।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান জেএসসি ও জেডিসির ফল সম্পর্কে বলছিলেন, পরীক্ষায় ভাল ফল অর্জন একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অভাবনীয় সাফল্য লাভ করেছে শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর আমাদের মনিটরিং বাড়ানো, অভিভাবকদের সচেতন হওয়া, শিক্ষকদের আন্তরিকতা বৃদ্ধি পাওয়া, বিনামূল্যে বছরের প্রথমে বই বিতরণের কারণেই শিক্ষার্থীরা ভাল সাফল্য পাচ্ছে। তাছাড়া এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসেরও কোন অভিযোগ ওঠেনি।

খাতা মূল্যায়নকারী শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সরকার বিশেষত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেয়া পদক্ষেপ শিক্ষার গুণগত মানে পরিবর্তন এনেছে এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে কঠোর মনিটরিংয়ে শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার, ইংরেজী ও গণিতসহ বিজ্ঞান বিষয়ে ভাল ফল, গ্রেডিং ও সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জনÑএ সবই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে।

এবারের ফলাফলের অগ্রগতির একটি বড় সূচক হচ্ছে দেশের সর্ববৃহত এ দুই পাবলিক পরীক্ষাতেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ফল ভাল। ফলের এ চিত্রের দিকে তাকালেই শিক্ষার অগ্রগতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার ফলাফল ও অংশগ্রহণসহ সব দিক থেকেই ছাত্রদের থেকে এবার ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পাসের হার বেশি। ছাত্রদের পাসের হার যেখানে ৯৮ দশমিক ৪৪ সেখানে ছাত্রীদের পাসের হার ৯৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল দুই লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছে দুই লাখ ৪৬ হাজার ৮১৮ জন শিক্ষার্থী। ইবতেদায়ীতে পাসের হারেও ছাত্রীরা এগিয়ে। ছাত্রদের পাসের হার ৯৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আর ছাত্রীদের পাসের হার ৯৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। মাদ্রাসার ছাত্রীদের এ ভাল ফল অন্য যে কোন বছরের তুলনায় ব্যতিক্রম।

জেএসসি ও জেডিসিতে এবার ছাত্রদের তুলনায় বেশি অংশ নিয়েছিল ছাত্রীরা। পাসের হার এমনকি জিপিএ-৫ ও বেশি এবার ছাত্রীদের। ছাত্রদের থেকে এবার এক লাখ ৪৬ হাজার ১৩৭ জন বেশি ছাত্রী পাস করেছে। ছাত্রদের পাসের হার ৯২ দশমিক ৯২ এবং ছাত্রীদের ৯৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ ছেলেরা যেখানে পেয়েছে এক লাখ ৬ হ্জাার ৩৪৫ জন, সেখানে মেয়েরা পেয়েছে এক লাখ ৪১ হাজার ২৪৩ জন। মেয়েরা জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৪ হাজার ৮৯৮ জন বেশি। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলছিলেন, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার তা হলো শিক্ষা। আমাদের মেয়েরা সব সুচকে এবার এগিয়ে।

ভাল ফলের পেছনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহ তাদের চেষ্টাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। দীর্ঘদিন প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সরকারের এ কর্মকর্তারা বলছিলেন, সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ, বছরের শুরুতেই বিনামূল্যের বই বিতরণ তো আছেই। তার সঙ্গে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা সবসময় চেষ্টা করছেন। তারা এখন মনে করেন আরও ভাল করতে হবে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমান সরকার বলছিলেন, ফল ভাল করতে শিক্ষার্থী অভিভাবকদের চেষ্টা যেমন আছে তেমনি সরকারের নেয়া পদক্ষেপ বিশেষ প্রভাব ফেলছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত মনিটরিং এ ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। আর সৃৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার করায় ফলে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এদিকে জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবীর বলছিলেন, শিক্ষার প্রায় সকল সূচকে এবার শিশুরা ভাল করেছে। নারীদের অবস্থান খুবই আশাপ্রদ। এসবই আমাদের আশা জাগায়। কারণ দেশের দুটি বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষায় নারীরা ছেলেদের পেছনে ফেলেছে এটা শিক্ষার অগ্রগতির একটি সবচেয়ে বড় চিত্র।

এদিকে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি ও শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়াকে একটি অগ্রগতি বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলাফলে চিত্রে দেখা গেছে, জেএসসি জেডিসি পরীক্ষায় এবার ৯ হাজার ৪৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী পাস করেছে, আবার ২৮টি প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করতে পারেনি।

গত বছর জেএসসি-জেডিসিতে আট হাজার ৫৮৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী পাস করেছিল। আর ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ফেল করেছিল। এই হিসেবে এবার শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮৬৭টি বেড়েছে। আর শূন্য পাস করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ১৫টি। জেএসসিতে এবার ঢাকা বোর্ডের এক হাজার ১২৯টি, রাজশাহীর এক হাজার ৫১৭টি, কুমিল্লার ৩৪৮টি এবং যশোর বোর্ডের ৯৯৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী পাস করেছে। আর চট্টগ্রাম বোর্ডের ১৯২টি, বরিশালে ৯১৯টি, সিলেটে ২৪৪টি, দিনাজপুর বোর্ডের ৮৯৯টি এবং মাদ্রাসা বোর্ডের ৩ হাজার ২০৩টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে মাদ্রাসা বোর্ডের ২০টি, দিনাজপুর বোর্ডের ৬টি এবং ঢাকা ও রাজশাহী বোর্ডের একটি করে প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষার্থী জেএসসি-জেডিসিতে অংশ নিয়েও পাস করতে পারেনি।

Views: 10