স্বাস্থ্য বাতায়ন এসডিজি অর্জনে সহায়ক হবে

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত অনেক দূর এগিয়ে গেছে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামনে অপার সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩। আট মাসে ১৩ লাখের বেশি মানুষ এর সেবা নিয়েছেন। সঠিকভাবে স্বাস্থ্য বাতায়ন ব্যবহার করা সম্ভব হলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করা সম্ভব হবে।
গতকাল সোমবার ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩: উন্নয়নের লক্ষ্যে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের নিজস্ব কার্যালয়ে এই বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো। এতে সহযোগিতা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিনেসিস আইটি লিমিটেড এবং ইউকেএআইডি। বৈঠকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরিচালক, গবেষক এবং উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। কাজ করলে কিছু ভুল হবে। এ ক্ষেত্রে চাপ অনেক বেশি। তবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি করতে সরকারের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই।
স্বাস্থ্য বাতায়ন সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ ফোন করে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। তবে এই সেবাকে শুধু চমকপ্রদ হিসেবে প্রচার করলেই হবে না। সেবার মান বাড়াতে হবে। সঠিক পরামর্শ দিতে হবে।
দেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি ব্যবহারের অগ্রগতি বর্ণনা করে অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ বলেন, ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার বিষয়টি একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। শুরুর পর থেকে গত আট মাসে এখান থেকে ১৩ লাখের বেশি মানুষের সেবা পাওয়ার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য বাতায়নের পরিচিতি বাড়ানো বা স্বাস্থ্য খাতে যেকোনো ধরনের প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন প্রতিমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, স্বাস্থ্যের উন্নতিতে প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশ পুরস্কৃত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা বা দূরের যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় যথাক্রমে ১০০ এবং ১২ হাজার ডলার। বাংলাদেশে সেই ব্যয় ২৭ ডলার। মাথাপিছু কম ব্যয় করেও বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে অনেক উন্নতি করেছে।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সিনেসিস স্বাস্থ্যের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ডাক্তারের পরামর্শ, হাসপাতাল ও ডাক্তারের তথ্য, অ্যাম্বুলেন্সের তথ্য, জরুরি পরামর্শ, অভিযোগ গ্রহণের জন্য ১৬২৬৩ নম্বরটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চালু করেছে আট মাস আগে। এতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকারের দাতা সংস্থা ইউকেএইডি। এই স্বাস্থ্য বাতায়ন কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ পাওয়া যায়। প্রতিদিন ৪৫ জন চিকিৎসক ও ১৫ জন তথ্যদাতা কাজ করেন। গত আট মাসে ১৩ লাখের বেশি কল এসেছে এই নম্বরে। ৮০ শতাংশ কল আসে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে। ১০ শতাংশ চায় তথ্য। ৮ শতাংশ কল জানতে চায় এই কেন্দ্রের উদ্দেশ্য। ১ দশমিক ২ শতাংশ কল অভিযোগ করে। আর শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কল আসে অ্যাম্বুলেন্স-সেবার জন্য।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে, পোস্টার লাগিয়ে, আরও নানা পন্থায় স্বাস্থ্য বাতায়ন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য, মানুষ যেন ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে। গত আট মাসে কিছু সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত হয়েছে। উদ্যোক্তারা ও কর্মীরা শিখছেন। আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পেলে এই কেন্দ্র থেকে বহু ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
আড়াই ঘণ্টার এই বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদ। আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের মহাপরিচালক আসাদুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত যে কাজ হয়েছে তার মূল্যায়ন হওয়া দরকার। এই কেন্দ্রে ফোন করার পর মানুষের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদা যেন পূরণ হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য বাতায়ন থেকে যাঁরা পরামর্শ দেন, তাঁদের ওষুধের নাম উচ্চারণ করার সময় সতর্ক থাকতে হবে, যেন যিনি ফোন করেছেন তিনি ঠিক ওষুধটি পান। বিটিআরসির মহাপরিচালক (ই অ্যান্ড ও) ইকবাল আহমেদ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে স্বাস্থ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, এই কেন্দ্রে অনেকেই অনেক কারণে ফোন করেন। সেসব তথ্য সংরক্ষিত হচ্ছে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন কিছু পাওয়া যাবে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান স্বাস্থ্য বাতায়নের উদ্যোগকে অনন্য বর্ণনা করে বলেন, এই কাজের মূল্যায়ন দরকার। পাশাপাশি এখানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের প্রশিক্ষণও দরকার। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য বাতায়নের প্রচারে মন্ত্রণালয়ের অধীন জনবলকে কাজে লাগাতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি মোস্তফা জামান বলেন, আত্মহত্যার প্রবণতা ও তামাক নিয়ন্ত্রণে এই বাতায়নকে ব্যবহার করা যেতে পারে।
একাধিক আলোচক বলেন, এই সেবাকে টেকসই করতে হলে যাঁরা পরামর্শ দিচ্ছেন, তাঁদের দক্ষ হতে হবে। ফোনে যেসব সেবার কথা বলা হয়, সেই সেবা যেন মানুষ পায়। না হলে মানুষ বিরক্ত হবে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান শামস-এল-আরেফিন বলেন, এই কেন্দ্রে কারা ফোন করছে, কেন ফোন ফোন করছে, তার মূল্যায়ন দরকার। কী উদ্দেশ্যে এই কেন্দ্র করা হয়েছে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে এই কেন্দ্র কী ভূমিকা রাখবে, তা দেখতে হবে। বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এস কে রায় কেন্দ্রের অপার সম্ভাবনা আছে উল্লেখ করে বলেন, এই কেন্দ্র থেকে রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি, অসংক্রামক ব্যাধি—এসব বিষয়ে মানুষকে বেশি তথ্য দিতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অ্যালাইভ অ্যান্ড থ্রাইবের কান্ট্রি ম্যানেজার জেবা মাহমুদ সারা দেশের ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রের সঙ্গে স্বাস্থ্য বাতায়নের সংযোগ ঘটানোর কথা বলেন। ইউএনএফপিএর বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা সৈয়দ আবু জাফর মোহাম্মদ মুসা স্বাস্থ্য বাতায়নকে স্বাস্থ্যসেবার মূলধারায় আনার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এই কেন্দ্র থেকে নারীর প্রতি সহিংসতা, কিশোরী স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এসব বিষয়ে পরামর্শ দিতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে স্বাস্থ্য খাত সঠিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য বাতায়নের উদ্দেশ্যও সফল হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, এমআইএসের পরিচালক নাজিমুন নেসা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পরিচালক (পিএইচসি) জাহাঙ্গীর আলম, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (এমসিএইচ সার্ভিসেস) মোহাম্মদ শরীফ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) সায়না তাহমিন, এই অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসাশিক্ষা) মো. আবদুর রশিদ, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক খন্দকার শহিদুল গনি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) রাশেদুন্ নেছা, নিপসমের পরিচালক বাইজিদ খুরশিদ রিয়াজ, এটুআই কর্মসূচির জাতীয় পরামর্শক মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের স্বাস্থ্য পরামর্শক ইখতিয়ার উদ্দিন খন্দকার।