শাহনাজের পথশিশু স্কুল

ছোট বাড়িটির পাশাপাশি চারটি কক্ষের দেয়ালের এক পাশে মীনা কার্টুনের ছবি। অন্য পাশে কাঠ কেটে বানানো বাংলা স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ সারি বেঁধে লাগানো।

ঘরে কোনো টেবিল-চেয়ার নেই। শুধু মেঝেতে বিছানো রয়েছে ম্যাট। তার ওপর ছড়ানো ছিটানো বিভিন্ন খেলনা।
ব্যতিক্রমী একটি স্কুলের শ্রেণিকক্ষের চিত্র এটি। বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের এখানে পাঠদান চলে। নাম ‘শিশুকল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়’। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশু শিক্ষার্থীকে এখানে কোনো টিউশন ফি দিতে হয় না। বই, খাতা ও ইউনিফর্মের (স্কুল ড্রেস) বাধ্যবাধকতাও নেই। এই স্কুলের দরজা খোলা সব শ্রেণির শিশুদের জন্যই। আর সে সুবাদে এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই দুই থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে।

বগুড়ার শেরপুরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে বিশেষ ধরনের স্কুলটি পরিচালনা করছেন শিক্ষিকা শাহনাজ পারভীন। তিনি উপজেলা সদর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং অসহায় শিশুদের স্বাবলম্বী করার মানসে ২০১৩ সাল থেকে চলছে তাঁর এই উদ্যোগ। এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছে ইতিমধ্যে। এর মাধ্যমে তিনি নিজের পাশাপাশি দেশকেও নিয়ে গেছেন বিশেষ এক উচ্চতায়।

বিশ্বসেরা শিক্ষক-২০১৭ (গ্লোবাল টিচার প্রাইজ) পুরস্কারের জন্য প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়েছেন শাহনাজ পারভীন। লন্ডনভিত্তিক ভার্কি ফাউন্ডেশন বিশ্বের ১৭৯টি দেশ থেকে প্রাপ্ত ২০ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে ৫০ জনের একটি তালিকা করেছে। তালিকায় ভারত, পাকিস্তানসহ ৩৭টি দেশের একজন করে শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন। আর তাতে ওপরের দিকেই জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের এই শিক্ষানুরাগী। এবার ৫০ জনের তালিকা থেকে বাছাই করে শীর্ষ ১০ জনের একটি তালিকা হবে। আর সেখান থেকে একজনকে বেছে নেওয়া হবে গ্লোবাল টিচার প্রাইজের জন্য।

সমাজের সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের শিক্ষাদানে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি দিতেই সংস্থাটির পক্ষ থেকে তৃতীয়বারের মতো এই পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের ১৯ মার্চ দুবাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি বিজয়ীকে অর্থ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে এক মিলিয়ন ইউএস ডলার।

১৯৭৬ সালে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার দাঁড়িগাছা গ্রামে শিক্ষক পরিবারে জন্ম শাহনাজ পারভীনের। বাবা মরহুম মানিক উল্লাহ ও মা নুরজাহান বেগম। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখে এসেছেন। ১৯৮৫ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি এবং ১৯৯২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে আলিম পাস করেন তিনি। এরপর বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে আসছেন।

কর্মজীবনেও শাহনাজ পারভীন শুরু থেকেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তিনি ২০১০ সালে জেলাপর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে নির্বাচিত হন জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। এরপর ২০১৬ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ক্লাব লিডার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। সর্বশেষ ২০১৭ সালে একুশে পদক পাওয়ার জন্য রাজশাহী বিভাগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন এই শিক্ষানুরাগী।

শেরপুর পৌর শহরের শান্তিগরে স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে চার সদস্যের সংসার এই কৃতী শিক্ষকের। বড় মেয়ে মাসুমা মরিয়ম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। ছোট মেয়ে আমেনা মুমতারিন শ্রেয়া বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্বামী মোহাম্মাদ আলী শেরপুর শহীদিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় আরবি প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।

শাহনাজ বললেন, ‘আমার এমন উদ্যোগ কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করি। প্রাথমিক স্কুলে দায়িত্ব শেষ করার পর এই স্কুলে সময় দিয়ে আসছি। এতে কখনোই আমার অবহেলা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরিদ্র অশিক্ষিত মা-বাবাকে বুঝিয়ে তাদের সন্তানকে স্কুলে নিয়ে আসছি। ওদের অক্ষরজ্ঞান দিয়ে চলেছি। আবার শ্রমজীবী শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসতে ম্যানেজ করতে হয়েছে ওদের মালিককে। অনেক বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে স্কুলের বয়স আজ তিন বছর। ’

শাহনাজ আরো বলেন, ‘প্রথমে আমার স্কুলে শিক্ষার্থী ছিল মাত্র দুটি ছিন্নমূল শিশু। এরপর বাড়তে থাকে কর্মজীবী শিশু শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে স্কুলটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০ জন। ওরা সবাই সমাজের অসহায় ঝরে পড়া অভাবী পরিবারের কর্মজীবী পথশিশু। সপ্তাহের ছয় দিন বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম। ’

শাহনাজ মনে করেন, অভাব-অনটন অনেক শিশুকে স্কুলের বারান্দায় যেতে দিচ্ছে না। আবার অনেক শিশু একই সমস্যার শিকারে পরিণত হয়ে স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। অথচ এসব শিশুর অনেকেই যথেষ্ট মেধাবী। একটু সুযোগ পেলে ওরা একদিন দেশের সম্পদ হয়ে উঠতে পারবে।

জানা গেল, স্কুলের শিশুদের পোশাক, বইপুস্তক, খাতা-কলমসহ লেখাপড়ার অন্য সব প্রয়োজনীয় উপকরণের জোগান দেন শাহনাজ পারভীন নিজেই। পাঠদান কার্যক্রমের সুবিধার্থে দুজন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। তাঁদের বেতন-ভাতার ব্যয়ও বহন করেন তিনি। নিজের বেতনের অর্থ ও স্বামীর সহযোগিতা নিয়ে চলছে তাঁর এই স্কুলের কার্যক্রম।

শাহনাজের স্কুলে কথা হলো শারীরিক প্রতিবন্ধী ১০ বছরের শিশু শিক্ষার্থী শিপনের সঙ্গে। দেয়ালে টানানো যেকোনো লেখা পড়তে পারে সে। এই শিশুর স্বপ্ন, বড় হয়ে এমন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার। আরেক শিক্ষার্থী সুমি জানাল, সে অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে। কখনো ভাবেনি সে পড়ালেখা শিখবে। এখন সে মনে করছে যে বড় হয়ে ভালো চাকরি করতে পারবে। আর সেদিন সে মাকে আর অন্যের বাড়িতে কাজ করতে দেবে না।