বাড়ছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ – সৈয়দ আবুল হোসেন

বহু বছর ধরে গোটা ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ পোশাকশিল্পের পণ্যের জন্য স্থিতিশীলতার স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত। এ খাতে বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্যস্থল, আঞ্চলিক ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু ও এ ক্ষেত্রে অর্থনীতির দ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করা হয়।

সম্প্রতি কিছু প্রশ্নের উদয় হয়েছে, পোশাকশিল্পে বিভিন্ন দুর্ঘটনাই তার জন্য দায়ী। এর পাশাপাশি এটা নিয়ে অনেক অপপ্রচারও হয়েছে। তবে হিসাব করে দেখা দরকার, আমরা বিদেশ থেকে অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভবান হয়েছি। বিশেষ করে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো থেকে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১০ সালে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে ভারত, পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী অনেক দেশে এ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক। আন্তর্জাতিকভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহের তালিকায় ১২০ থেকে ১১৪তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। ২০১০ সালে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ৯১৩.৩২ মিলিয়ন ডলার, যা ২০০৯ সালের চেয়ে ২১৩ মিলিয়ন ডলার বেশি। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আংকটাড)-এর বিশ্ব-বিনিয়োগ প্রতিবেদনে এ তথ্য ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বলা যায়, ২০১০ সালে বৈদেশিক বিনিয়োগে ভারতে ৩০ শতাংশ, আফগানিস্তানে ৫৮ শতাংশ, ভুটানে ২৫ শতাংশ ও পাকিস্তানে ১৩ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ৩০ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি অন্যান্য দেশের তুলনায় আশাব্যঞ্জক।

পোশাকশিল্পে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে ভালো অবস্থান করে নিয়েছে। এটা অনেকেই মেনে নিতে পারছে না বলে কিছু শত্রুও তৈরি হয়েছে। আর মাঝেমধ্যে দু-একটি দুর্ঘটনা ঘটলে তারা এর সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। আবার মাঝেমধ্যে একটি শ্রেণি ইন্ধন দিয়ে দেশটাকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। এটা হলে অন্য দেশগুলো বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগ নিতে চায়। এ বিষয়ে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে সরকার বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছে, অবস্থা তুলে ধরেছে। সবচেয়ে বিরক্ত ও অস্বস্তিকর বিষয় যে পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা যে কারণে অন্যের ইন্ধনে অচলাবস্থা তৈরি করে, তাদের সে দাবির পেছনে কোনো যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। তবুও তারা অন্যের ইন্ধনে কাজ করে। এ ব্যাপারে সরকার সব সময় তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। যারা সরকারকে পছন্দ করে তারা মনে করে, সব ঠিক আছে। অন্যরা একে হীনস্বার্থে ব্যবহার করে নিজেরা লাভবান হয়।

বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্প খাত রপ্তানির সর্ববৃহৎ অংশ দখল করে রয়েছে। রপ্তানির ৭৮ শতাংশের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা এ খাত থেকে আসছে। জিডিপির ১৭ শতাংশ তৈরি পোশাকশিল্প খাত এনে দিয়েছে। এর ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। বস্ত্র খাতের তিনটি প্রধানতম উপখাত রয়েছে—স্পিনিং, উইভিং ও ডাইং; ফিনিশিং ও প্রিন্টিং খাতও তৈরি পোশাক খাত। দেশকে শিল্প বিপ্লবের দ্বারে পৌঁছে দিয়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প খাত। মাত্র ১৯৮৩ সাল থেকে ৪ শতাংশ মোট রপ্তানি দিয়ে তৈরি পোশাকশিল্প তার যাত্রা শুরু করে। এখন মোট রপ্তানির ৭৮.৮৫ শতাংশ শুধু তৈরি পোশাকশিল্প খাত থেকে আসে।

বিটিএমএ-র ২০১১ খ্রিস্টাব্দের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী দেশে স্পিনিং মিল রয়েছে ৩৮৫টি, যার উৎপাদন ক্ষমতা ৮.৭ মিলিয়ন স্পিন্ডিল, ০.২৩ মিলিয়ন রোটর। উৎপাদিত হচ্ছে ২০৫০ মিলিয়ন কেজি। টেক্সটাইল উইভিং শিল্প রয়েছে ৭২১টি। উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ২৫০ মিলিয়ন মিটার বস্ত্র। বস্ত্র খাতে শুধু উইভিং মিল রয়েছে ৫৮৪টি, ডেনিস মিল রয়েছে ২০টি। হোম টেক্সটাইল ১৭টি, নিট কাপড় তৈরি মিল রয়েছে ২৩৩টি। অন্যদিকে ডাইং, প্রিন্টিং, ফিনিশিং মিল রয়েছে ২৩৩টি। ডাইং-প্রিন্টিং মিলে উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে দুই হাজার ২০০ মিলিয়ন মিটার।

বর্তমানে দেশে তৈরি পোশাকশিল্পের সংখ্যা পাঁচ হাজার ১৫০টি। ১৯৭৮ সালে মাত্র ১২টি শিল্পকারখানা নিয়ে এ দেশে তৈরি পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ৩৫ লাখ নর-নারী এখানে নিয়োজিত। তৈরি পোশাকশিল্পের আরেকটি দিক হচ্ছে নিটওয়্যার শিল্প খাত। দেশের ওভেন শিল্পের পাশাপাশি নিট শিল্প বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে মোট নিটশিল্পের সংখ্যা হচ্ছে এক হাজার ৮২১টি। বিকেএমইএ বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১১ অনুযায়ী, এ খাত দেশের রপ্তানিতে ৪১.৩৬ শতাংশ অবদান রাখছে। অন্যদিকে ওভেন তৈরি পোশাকশিল্প খাত রপ্তানিতে অবদান রাখছে ৩৬.৭৮ শতাংশ।

বস্ত্র খাতে ওভেন, নিট ছাড়াও টেরিটাওয়াল নামে আরো একটি উপখাত রয়েছে। এ খাতে শিল্পের সংখ্যা হচ্ছে ১০৫টি। এর অধিকাংশ শিল্পকারখানা চট্টগ্রাম ইপিজেডে অবস্থিত। কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঢাকায় রয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে টেরিটাওয়াল রপ্তানি হয় ৮৪ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪১.৮২ মার্কিন ডলারের।

প্রথমত, সবিনয়ে কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশ এখনো প্রথম সারির দেশগুলোর একটি দেশ হতে পারেনি। তবে আমরা হতে চাইছি। জাতীয় আয়ের শতকরা হারে বৈদেশিক সাহায্যের ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর একটি দেশ হতে আমাদের আরো সময় লাগবে। অনেক আশা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা সাময়িক উন্নয়ন বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নকে আদর্শ হিসেবে নিয়েছি, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা দূর করতে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশের নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়নে দরকার সমঝোতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত সমঝোতা। এ সমঝোতা হবে জনগণের সঙ্গে জনগণের। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির। সমাজপতি, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গুণীজনদের মধ্যেও সমঝোতা প্রয়োজন। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হওয়া খুবই জরুরি। অন্যথায় আমাদের মধ্যকার অনৈক্য জাতি হিসেবে আমাদের বিশ্বের কাছে ছোট করবে, আমাদের ধ্বংস করে দেবে। প্রবাদ আছে, যে রাজ্যে রাজা ও প্রজার মধ্যে সমঝোতা রয়েছে, সেটাই স্বর্গরাজ্য। এ লক্ষ্যে দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। গণতন্ত্রকে সুসংহত করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন করা সম্ভব। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ বাড়াবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কল্যাণে অবদান রাখবে।