পৌষের রোদমাখা দিন পিঠা পুলি খেজুরের রসে উৎসব

টিএসসি এলাকাটি খুব বড় নয়। অল্প জায়গা। তাতে কী? অনেকগুলো চুলো জ্বলছে। না, চায়ের দোকানের কথা হচ্ছে না। নতুন করে বসানো চুলোয় চলছে পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক দূর থেকেই ঘ্রাণ আসছে। কোথাও ভাঁপা পিঠা। কোথাও চিতই। যার যা পছন্দ, গরমাগরম খাচ্ছেন। এভাবে দেখতে দেখতে বদলে গেছে গোটা এলাকার পরিবেশ। ঢাকার নয় শুধু, দেশের সর্বত্রই এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। গ্রামের কথা তো বলাই বাহুল্য, প্রায় প্রতি ঘরে ঘরে চলছে পিঠা পুলির উৎসব। মায়ের হাতের পিঠা। সঙ্গে খেজুরের রস। সুস্বাদু পায়েস। সবই পৌষের দান। বছর ঘুরে আবারও এসেছে পৌষ। কবিগুরুর ভাষায়- পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে, আয় আয় আয়…। ষড়ঋতুর দুই মাস চৈত্র ও বৈশাখ খরার। আর ক্ষরণের মাস পৌষ। এই মাসে মৃতপ্রায় দেখতে খেজুর গাছের শরীর থেকে রসের ক্ষরণ হয়। চলে পিঠা পুলির উৎসব।

এদিকে, পৌষের আসা মানে এসেছে শীতও। পৌষের প্রথম দিন থেকেই শীতের শুরু। চলে মাঘের শেষ দিন পর্যন্ত। এ হিসাব অবশ্য পঞ্জিকার। এ সময়ের আগে পরেও শীত থাকে। মধ্য ডিসেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়রি পর্যন্ত শীতকাল। বর্তমানে নবেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি অনুভূত হয় শীত।

তো, হঠাৎ এই শীতল অনুভূতি জন্মের রহস্য কী আসলে? উত্তরে আবহাওয়া অফিস বলছে, বাংলাদেশ বিষুব রেখার উত্তরে। প্রায় সাড়ে ২৩ ডিগ্রী অক্ষাংশে। কিন্তু শীতকালে অবস্থান পরিবর্তন করে সূর্য বিষুব রেখার দক্ষিণে চলে যায়। দক্ষিণে কিছুটা হেলে থাকে। দিন ছোট হয়। বড় হতে থাকে রাত। এর ফলে শীতের প্রকোপ বাড়ে। বাংলাদেশে যখন শীতকাল, পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোয় তখন গ্রীষ্ম। ওসব দেশে বাতাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উত্তর গোলার্ধ থেকে ঠাণ্ডা বাতাস দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। বাংলাদেশের উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা। সেখান থেকে বরফ শীতল বায়ু এ দেশের ওপর দিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে যে ঠা-া বাতাসের প্রবল প্রবাহ সৃষ্টি হয় তা শৈত্যপ্রবাহ নামে পরিচিত। এ সময় তীব্র ঠা-া অনুভূত হয়। এখন, ঠিক এই মুহূর্তেও চলমান আছে হাল্কা শৈত্যপ্রবাহ। তাতেই শীতটা টের পাওয়া যাচ্ছে। তবে মাঘ মাসে শীত এত বেড়ে যায় যে, বাঘও ভয়ে পালায়!

অবশ্য পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের শীতের সঙ্গে বাংলাদেশের শীতের পার্থক্য বিস্তর। কোন কোন দেশে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রীতে নেমে আসে। খুব কাছের দেশ চীনেও তাপমাত্রা মাইনাস নয়-দশ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত নিচে নামে! মেরু অঞ্চল বা এন্টার্কটিকার কথা তো বলাই বাহুল্য। সেখানে বাংলাদেশে তাপমাত্রা ছয় কিংবা পাঁচ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে খুব একটা নামে না। সে দিক থেকে বাংলাদেশে শীত যথেষ্ট উপভোগ্য। বাংলার কবিকে তাই লিখতে হয়- শীত এসেছে লাগলো কাঁপন, লাগলো দোলা প্রাণে/ শীত এসেছে হিমেল হাওয়া, আনন্দ আর গানে…।

পৌষের প্রকৃতিও অদ্ভুত সুন্দর। একটু খেয়াল করলে তা চোখে পড়ে বৈকী। গত এক সপ্তাহে অনেক কিছুই বদলে গেছে। এখন সকাল হলেই সূর্যালোকের দেখা মেলে না। ঘন কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ। রাতে শিশির ঝরছে। প্রকৃতির এ রূপ বর্ণনা করেই জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন- শিশির পড়িতেছিল ধীরে-ধীরে খ’সে;/ নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি/ উড়ে গেলো কুয়াশায়, -কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরো…। অপর এক কবির কবিতায় বর্ণনাটি এ রকম- হে শীত, সবুজের পোষাক খসিয়েছ/ নিয়েছ জড়িয়ে কুয়াশার শুভ্র চাদরে তপসীর সাধনায়…। পৌষে এই কুয়াশা এত হয় যে সূর্য দেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হয়। কবি কিশোর সুকান্ত তাই লিখেছিলেন, সকালের এক- টুকরো রোদ্দুর-/ এক-টুকরো সোনার চেয়েও মনে হয় দামী।/ ঘর ছেড়ে আমরা এদিক-ওদিকে যাই-/এক-টুকরো রোদ্দুরে তৃষ্ণায়…। গ্রামের সাধারণ কৃষক অবশ্য সূর্যের অপেক্ষা করেন না। ভোরে ঘুম থেকে উঠে আইল্যায় হাত ছেঁকে নেন। এভাবে যেটুকু সম্ভব উষ্ণতা সঞ্চয় করে কাজে নেমে যান। পৌষে কৃষকের ফসল ঘরে তোলার কাজ শেষ হয়ে যায়। হাতে তেমন কাজ থাকে না। সবাই উৎসব-আনন্দে মাতে। নতুন ধান থেকে পাওয়া চালে ঘরে ঘরে চলে পিঠা পুলির আয়োজন। পৌষের শেষদিনে ব্যাপক আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় পৌষসংক্রান্তি।

শীতে প্রকৃতিজুড়ে শুরু হয় রং-বেরঙের খেলা। গ্রামে শীত মানেই সরিষার ক্ষেতে দোল খাওয়া কাঁচা হলুদ। আশ্চর্য সুন্দরে চোখ আটকে যায়। খেজুরের রসে ভরে ওঠে মাটির কলসি। ম ম গন্ধ ছড়ায়। শীতের হাওয়ায় কাঁপন ধরে আমলকীর বনে। কবিগুরুর ভাষায়- শীতের হাওয়ার লাগলো নাচন আমলকীর এই ডালে ডালে। পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে…।

শীতকালে ফুলেরাও যেন বাড়তি আবেদন নিয়ে হাজির হয়। সৌন্দর্যের সবটুকু মেলে ধরে। মৌসুমী ফুলে ভরে ওঠে বাগান। হলুদ গাঁদা ফুল এরই মাঝে শীতকে স্বাগত জানিয়েছে। আর গোলাপ তো ফুল নয় শুধু, বিশেষ জাত। খুব প্রিয় গোলাপ সারা বছরই ফোটে। তবে এই এখন মৌসুম। গোলাপের মিষ্টি ঘ্রাণে ক্রমশ চারপাশ ভরে উঠছে। ফুটছে ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, মোরগফুল। মুখ তুলে তাকাচ্ছে সূর্যমুখী। শীতের বিশেষ ফল কমলালেবু। বাজারে প্রতিদিনই আসছে সুমিষ্ট এই ফল। তারও আগে বলতে হয় বড়ইয়ের কথা। শীতের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বড়ই।

আকাশের দিকে তাকিয়েও এখন অনুমান করা যায়, শীত এসেছে। সেখানে উড়ে বেড়াচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে শীতের পাখিরা। প্রায় সারাদেশের বনে, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের শাখায় এখন উৎসব চলছে পাখিদের। দেশীয় পাখিদের সঙ্গে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে যোগ দিয়েছে অতিথি পাখিরা। কবির ভাষায়, শীতের পাখিরা বৈকাল থেকে উড়ে আসে নাতিশীতোষ্ণ দেশে…।

শীতের তরিতরকারির কথা না বললেই নয়। শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, বেগুন, পালংশাক, মটরশুটি কী নেই! সবজির বাজার পরিপূর্ণ। কৈ, মাগুর, শিংসহ অন্যান্য মাছ এ সময় প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।

অবশ্য হতদরিদ্র মানুষের দুর্ভেগ এ সময় বেড়ে যায়। শহরের ছিন্নমূল মানুষকে বেশ ভুগতে হয়। রাতে প্রচ- ঠা-ায় জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কবির ভাষায়, এই শীত ‘বিষাদের প্রতিমূর্তি।’ এমন দিনে ভাগ্যাহত মানুষের পাশে দাঁড়ানো চাই। দাঁড়াবো তো আমরা? দাঁড়ালে তবেই সবার জন্য সমান আনন্দের হবে শীত।