চা উৎপাদন এবার ৮৫ মিলিয়ন কেজিতে দাঁড়াবে

১৬২ বছরের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দেশে এবার ৮৫ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অনুকূল আবহাওয়া এবং সরকারী নীতি সহায়তার কারণে গত কয়েক বছর ধরে চা উৎপাদন বেড়েছে। এছাড়া উৎপাদন বাড়াতে পাবর্ত্য অঞ্চলের পাশাপাশি সমতল ভূমিতে চা চাষের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। দেশের ১৭টি জেলাকে ঘিরে চা চাষের একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে উচ্চ ফলনশীল ও আকর্ষণীয় গুণগতমানের ২০টি ক্লোন উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই)। চায়ের ক্লোন উদ্ভাবন ছাড়াও এ পর্যন্ত চার ধরনের বাই-ক্লোনাল ও এক প্রকারের পলি-ক্লোনাল বীজ উদ্ভাবন করেছে বিটিআরআই। সংস্থাটি জার্মপ্লাজমসমৃদ্ধ জিন ব্যাংক স্থাপন করেছে ৫১৭টি। চা শিল্প উন্নয়নে আরও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এর ফলে দেশে ধারাবাহিকভাবে চায়ের উৎপাদন বেড়েছে। এ শিল্পের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ঐতিহ্য মেলে ধরতে প্রথমবারের মতো ঢাকায় তিন দিনব্যাপী চা উৎসবের আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ চা বোর্ড। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

পাতা থেকে কিভাবে চা হয়, দেশে কারা এ শিল্পের উদ্যোক্তা, কত প্রকার চা হতে পারে, দেশের কোথায় কোথায় চা চাষ হয় ও হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে চায়ের গুরুত্ব এবং বাংলাদেশে এ শিল্পের সম্ভাবনা কী, চা চাষে সমস্যা ও বাধাগুলো কোথায় এসব বিষয় জানা যাবে চা উৎসবে। এক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের পরই চায়ের অবস্থান ছিল। কিন্তু গত এক দশকে চাহিদা বাড়ায় চা এখন আমদানি পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে চা আর আমদানি নয়, বরং রফতানি পণ্য হিসেবে পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চায় বাংলাদেশ চা বোর্ড। এ লক্ষ্যে চা শিল্প উন্নয়নে একটি পরিপূর্ণ রোডম্যাপও প্রণয়ন করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন জনকণ্ঠকে বলেন, চা সম্ভাবনাময় একটি অর্থকরী ফসল। এক সময়ে রফতানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চা শিল্পের হারানো গৌরব ও ঐহিত্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে বর্তমান সরকার। এলক্ষ্যে চায়ের উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল নেয়া হয়েছে। পাবর্ত্য অঞ্চলের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সমতলে চা চাষ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে চা শিল্পের বিকাশ এবং রফতানি বাড়াতে একটি ‘পথ নকশা’ তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শীঘ্রই পথ নকশাটি প্রকাশ করা হবে।

জানা গেছে, আগামী ১২ থেকে ১৪ জানুয়ারি তিন দিনব্যাপী রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় চা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এ উৎসবে বেসরকারী খাতের সব দেশী-বিদেশী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক, বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অংশগ্রহণ করবে। এছাড়া এবারের মৌসুম শেষে চা উৎপাদনে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টির ধারণা ক্রমেই বাস্তব রূপলাভ করছে। বছরের শেষ পর্যন্ত চা উৎপাদনের এ ধারা ঠিক থাকলে তা হবে গত ১৬২ বছরে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের রেকর্ড।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চা বোর্ডের ডেপুটি ডিরেক্টর ট্রেড রুহুল কবির চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, চা উৎপাদনে সর্বকালের সব রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চা শিল্প উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দেশে প্রথমবারের মতো চা উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। এ উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছেÑ চায়ের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি কমানো। চা শিল্পের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চল ছাড়াও দেশের সমতল ভূমিতে চা শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বেশ কিছু কাজ করা হয়েছে। চা উৎসবের মাধ্যমে কিছু নতুন বার্তা পাবেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা। এক সময়ে রফতানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চা শিল্পের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে সরকার। আশা করা হচ্ছে, চা শিল্প তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।

বাংলাদেশে চা শিল্প ॥ ব্রিটিশদের হাত ধরে ১৮২৪ সালে সিলেট অঞ্চলে প্রথম চা চাষ শুরু হয়। তবে ১৮৬০ সালে হবিগঞ্জের লালচাঁন্দ চা বাগান ও মৌলভীবাজারের মির্তিঙ্গা চা বাগানে প্রথম চায়ের বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেন উদ্যোক্তারা। ২০০০ সালে উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়েও ছোট আঙ্গিকে চায়ের চাষ শুরু হয়। বাংলাদেশে চা শিল্পের বিকাশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৫৭-৫৮ সময়কালে তিনি বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। সে সময়ে চা শিল্পে মাঠ ও কারখানা উন্নয়ন এবং শ্রম কল্যাণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিগত তিন দশক ধরে চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়েনি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার রফতানি বাড়াতে পাট এবং চা শিল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। ইতোমধ্যে পাটের জিন আবিষ্কার করেছে বাংলাদেশ। চায়েরও নতুন ক্লোন আবিষ্কার হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম এবং সুদূরপ্রসারী। জিডিপিতে চা খাতের অবদান ০ দশমিক ৮১ শতাংশ। বাংলাদেশের ১৬২টি বাগানের ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে ২০১৫ সালে ৬৭ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন কেজি চা উৎপন্ন হয়েছে।

চা বোর্ডের তথ্যমতে, ১৯৯০ সালে চায়ের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৮৩ লাখ ৬০ হাজার কেজি এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ ছিল ১ কোটি ৪২ লাখ ১০ হাজার কেজি। আর ২০১৫ সালে চা উৎপাদন ছিল ৬ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার কেজি এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ ছিল ৬ কোটি ৫০ লাখ কেজি।

এদিকে চা কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের তথ্যমতে, ২০০৯-১৩ পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ২ কোটি ৮৭ লাখ ৯৩ হাজার কেজি চা আমদানি হয়েছে। আবার চা বোর্ডের হিসাবে ১৯৯০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত এমন কোন বছর নেই, যেখানে আগেরবারের তুলনায় চা রফতানি কমেনি। চা রফতানিতে ১৯৯০ সালে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছিল ১৫৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে আয় হয় ১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

এছাড়া সিলেটের মালনিছড়া চা বাগানের মাধ্যমে ১৮৫৪ সালে দেশে চা চাষ শুরু হয়। চা বোর্ডের হিসাবে বিশ্বে চা উৎপাদনের পরিমাণ ৪৬২ কোটি ৫০ লাখ কেজি। এর মধ্যে চীন একাই উৎপাদন করে ১৭৯ কোটি কেজি। এরপর ভারত ১১২ কোটি ৬০ লাখ, কেনিয়া ৩৭ কোটি এবং শ্রীলঙ্কা ৩২ কোটি ৮০ লাখ কেজি চা উৎপাদন করে। তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, জাপান ও আর্জেন্টিনার পর বাংলাদেশের অবস্থান দশম।

যদিও চলতি বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫-৭৮ মিলিয়ন কেজি চা। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ৮৫ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এখন প্রতি বছর আনুমানিক ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন কেজি চা বিদেশে রফতানি হয়। এরপরও চলতি বছর ৬ দশমিক ৯ মিয়িলন কেজি চা আমদানি করা হয়েছে। কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, পোল্যান্ড, রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাজ্য, আফগানিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, কুয়েত, ওমান, সুদান, সুইজারল্যান্ডসহ অনেক দেশে রফতানি হয় বাংলাদেশের চা।

উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ॥ বাংলাদেশে চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান কার্যালয়টি ‘চায়ের রাজ্য’ শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত। গবেষণার মাধ্যমে উন্নততর প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগের ধারাবাহিকতার লক্ষ্যেই ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিটিআরআই। শুরু থেকেই ইনস্টিটিউটটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ চা বোর্ডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এ ইনস্টিটিউটের বর্তমানে ৩টি পূর্ণাঙ্গ ও একটি নতুন সৃষ্ট উপকেন্দ্র রয়েছে। উচ্চ ফলনশীল ও আকর্ষণীয় গুণগতমানের ১৮টি ক্লোন উদ্ভাবন করেছেন বিটিআরআই’র গবেষকরা। উদ্ভাবিত চায়ের ক্লোনগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা হেক্টরপ্রতি তিন হাজার কেজি থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে চার হাজার কেজি। অদূর ভবিষ্যতে আরও দুটি নতুন ক্লোন বিটি-১৯ ও বিটি-২০ চা শিল্পের জন্য অবমুক্ত করা হবে। চায়ের ক্লোন উদ্ভাবন ছাড়াও এ পর্যন্ত চার ধরনের বাই-ক্লোনাল ও এক প্রকারের পলি-ক্লোনাল বীজ উদ্ভাবন করেছে বিটিআরআই। এছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে চা আবাদির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে ১৭টি জেলা বিশেষ করে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইলের মধুপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলায় মোট ১ লাখ ১ হাজার ৭২ হেক্টর ক্ষুদ্রায়তনের চাষযোগ্য জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। গত পঁয়তাল্লিশ বছরে আবাদি জমি ৪২ দশমিক ৬ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ৬০ হাজার হেক্টর হয়েছে।

চা শিল্পের সমস্যা ও সমাধানে করণীয় ॥ এ শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, চা শিল্প বিনিয়োগ হচ্ছে না। তীব্র আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখীন এ শিল্পটি। বিদ্যমান ব্যাংক ঋণের সুদের হার এত বেশি যে বিনিয়োগের জন্য ঋণের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা উৎপাদনকারীদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া চা বাগানের জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে, চা কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা এ শিল্পের উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী চা শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। সম্প্রতি উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ চা সংসদের পক্ষ থেকে বিদেশ থেকে নিম্নমানের চা আমদানি বন্ধ বা উচ্চ শুল্কহার আরোপ, চা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদানের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান এবং চুনারুঘাট উপজেলায় চা বাগান নষ্ট করে স্পেশাল ইকোনমিক জোন তৈরি বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ উদ্যোক্তাদের দাবির প্রতি সহমত পোষণ করে তা বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে। বাংলাদেশী চা সংসদের সিনিয়ন ভাইস চেয়ারম্যান এম শাহ আলম বলেন, চা শিল্প উন্নয়নে সরকারী নীতি সহায়তা বাড়ানো হলে হারানো ঐহিত্য ফিরিয়ে আনা যাবে।