বাংলাদেশে নারীর সাফল্য তাৎপর্যপূর্ণ

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং দেশের ভেতর বেড়ে ওঠা জিহাদি-সন্ত্রাসবাদের উত্থান সত্ত্বেও এ বছর উদ্যাপন করার মতো বিষয় বাংলাদেশের আছে। অক্টোবর মাসের শেষের দিকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) তার সর্বশেষ গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স (জিজিজিআই) প্রকাশ করেছে। এতে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থান অর্জনকারী রাষ্ট্র হয়েছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের মোট ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭২তম। ২০০৬ সাল থেকে সর্বশেষ রিপোর্ট প্রকাশ পর্যন্ত জিজিজিআই প্রক্রিয়ায় ১৯টি বিষয়ে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্তে কিছু ভুল থাকতে পারে। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে লিঙ্গ অসমতা কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটিয়েছে।
বিচ্ছিন্নভাবে ডব্লিউইএফের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করা প্রচলিত রীতির বিপরীত। বিশেষত, যখন ২০১৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনডিপি) নিজস্ব লিঙ্গ অসমতা সূচকে ১৮৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে ১৪২তম স্থানে রেখেছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪৯ ভাগ নারী। তাদের ৭২ ভাগই গ্রামে বসবাস করে। এখনও তারা শ্রমশক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় অনেক কম সুযোগ পেয়ে থাকে। এমনকি পুরুষের তুলনায় তাদের আয়বৈষম্য ব্যাপক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হওয়ায় গৃহ ও কর্মক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকার ক্ষেত্রেও নারীদের জন্য সেখানে অনেক সামাজিক প্রতিবন্ধকতা আছে।
এতকিছুর পরও আশাবাদী হওয়ার মতো অনেক বিষয় আছে। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যা দুটি সামরিক অভ্যুত্থান পেছনে ফেলে ১৯৯১ সাল থেকে নারীরা শাসন করে আসছে। এ কারণে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে জিজিজিআই সূচকে ৭ম স্থানের গৌরব লাভ করেছে দেশটি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার কীর্তি তাদের জীবনের চেয়েও মহৎ। তারা দু’জনেই বাংলাদেশী তরুণীদের কাছে রোল মডেল। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়েই নিরলসভাবে পুরুষতান্ত্রিক প্রাধান্যের স্রোতের বিপরীতে লড়াই করেছেন। বাংলাদেশের নারীদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতিকে আইনসিদ্ধ ও কার্যকর করতে তাদের লড়াই চলছে। তারা সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা তাৎপর্যপূর্ণভাবে বাড়িয়েছেন। ১৯৯০ সালে যেখানে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিল ১০ ভাগ, সেখানে ২০১১ সালে তা দাঁড়িয়েছে ২০ ভাগে।
বলা যায়, রাজনৈতিক মাতৃতন্ত্র নারীদের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে উন্নত করার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ধরনের প্রভাব আছে বাংলাদেশের সমাজে। এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। মেয়েশিশুরা ‘আর্থিক দায়’ ও ‘ছেলেদের তুলনায় কম কাক্সিক্ষত’ এই সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। কারণ ‘নারী অনাকাক্সিক্ষত’ ধারণাটি লিঙ্গভিত্তিক শিশু হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বর্তমানে বাংলাদেশী মায়েরা তাদের সন্তানদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় আকারে মতপ্রকাশ করতে পারেন। কেননা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে লিঙ্গ অসমতা ধীরে ধীরে দূর হয়ে যাচ্ছে। এ বিবেচনায় এটি বৈশ্বিক গড় অগ্রগতিকে ছাপিয়ে গেছে।
শুধু তাই নয়, আশার কথা হচ্ছে, বিভিন্ন শিল্পকারখানার শ্রমিক ইউনিয়নের ৬১ ভাগ নারীর নেতৃত্বে গঠিত। তারা বাংলাদেশের রফতানি খাতে বড় ধরনের অবদান রাখছেন। বিশেষ করে দেশের মোট রফতানির ৮০ শতাংশ অবদান যে তৈরি পোশাক খাতের, সেখানে নারীর অবদান অপরিসীম। এই খাত গত এক দশকে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের ওপরে ধরে রাখতে অবদান রেখেছে। এ খাতে শ্রমশক্তির ৯০ শতাংশেরও বেশি নারী। অধিকন্তু, কলেজ পর্যায়ে মেয়েদের পড়াশোনার গতি কিছুটা শ্লথ হলেও স্কুল পর্যায়ে ছেলেদের পেছনে ফেলেছে তারা। এক দশক আগের চিত্রের সঙ্গে তুলনা করলে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পরিষদে নারীরা তাদের সদস্যপদ পূরণ করেছেন।
আরও উল্লেখ্য, কোনো পর্যায়েই কৃষিজমি বা যন্ত্রপাতির মালিক না হয়েও বাংলাদেশের শস্য ক্ষেত্রে অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছেন নারী। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ধ্রুবতারা হয়ে আছে বাংলাদেশ। ক্ষুদ্রঋণ বাংলাদেশী নারীদের জন্য একটা আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এটা তাদের ক্ষমতায়নের পথ ও আর্থিক স্বাধীনতা দিয়েছে। কয়েকটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতাদের ৯২ ভাগই নারী এবং তাদের বেশিরভাগই গ্রামে বাস করেন। তৈরি পোশাক ও ক্ষুদ্রঋণ খাতের দ্রুত উত্থান এবং নারীদের কল্যাণে এগুলোর অবদান তাদের স্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ১৯৮০-এর দশক থেকে এক লাফে নারীদের গড় আয়ু ১৫ বছর বেড়ে গেছে। এ কারণে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
এতকিছুর পরও বাংলাদেশে লিঙ্গবৈষম্য খুবই বাস্তব এক সমস্যা হয়ে আছে। শ্রমবাজারের দিকে তাকালেই এর উদাহরণ মিলবে। সর্বশেষ ২০১০ সালের উপাত্তে দেখা গেছে, সেখানে মাত্র ৫৮ ভাগ নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে, যা পুরুষের তুলনায় ৩০ পয়েন্ট কম। নারীদের কর্মসংস্থানও হচ্ছে কম দক্ষতাসম্পন্ন, কম মজুরিভিত্তিক পদে, যে কারণে হঠাৎ সমৃদ্ধ হওয়া অর্থনৈতিক চক্রে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা। বাংলাদেশের রফতানিতে নারীর বড় ধরনের অবদান সত্ত্বেও তারা পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় ২০ ভাগ কম বেতন পান। এমনকি প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের।
লিঙ্গ সমতার পথে আরেকটি বড় বাধা হচ্ছে সমাজের গভীরে জেঁকে বসা পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা। সমাজে নারীদের আরও বড় ভূমিকা নেয়ার বিষয়টি পর্যায়ক্রমে গ্রহণীয় হলেও নির্দিষ্ট সংস্কৃতি চর্চায়, বিশেষত গ্রাম এলাকায় তাদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধাও রয়েছে। যেমন- গ্রামীণ এলাকায় এখনও মেয়েদের বোঝা মনে করা হয়। তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দায়সারার চিন্তাও করা হয়। যেহেতু মেয়েদের জন্য যৌতুক দিতে গিয়ে দরিদ্র পিতা-মাতাকে ঋণগ্রস্ত হতে হয়, ফলে বয়সের পার্থক্য বিবেচনা না করে সম্ভাব্য ধনীদের কাছে মেয়েদের ‘বিক্রি’ করতেও পিছপা হন না তারা। এ ধরনের প্রবণতার কারণে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স হয়ে পড়েছে ১৬ এবং দেশব্যাপী মাতৃমৃত্যুর হার এখনও উচ্চমাত্রায় রয়েছে।
মেয়েদের প্রতি শারীরিক নির্যাতনও ব্যাপক হারে আছে দেশটিতে। নারী নির্যাতন রোধে ২০১০ সালে সরকার ‘ডমেস্টিক ভায়োলেন্স প্রিভেনশন অ্যান্ড প্রটেকশন অ্যাক্ট’ নামে আইন কার্যকর করলেও এর প্রয়োগে কঠোরতার অভাব ও জটিলতা রয়ে গেছে। এ ছাড়া কন্যাভ্রুণ হত্যা ও শিশু হত্যার প্রবণতা এখনও রয়ে গেছে। যদিও এসব অপরাধ কমে আসছে বলে বিভিন্ন সূচকে দেখা গেছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে ইউএসএআইডি। লিঙ্গ অসমতা ও নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনে তিনটি মূল ক্ষেত্রে কাজ করছে সংস্থাটি। প্রথমত. পরিবার-পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পারিবারিক ইস্যুতে নারী-পুরুষের সংলাপ আয়োজন এবং নারী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রচারণায় অর্থায়ন করছে ইউএসএআইডি; দ্বিতীয়ত. সর্বশেষ প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে কৃষি খাতে নারীর ভূমিকা বাড়ানো হচ্ছে। এতে করে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সরাসরি গৃহস্থালি আয়ে অবদান রাখছেন নারীরা এবং তৃতীয়ত. ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বিল পুরোপুরি বাস্তবায়নে সরকারকে সহায়তা করা হচ্ছে, একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য মানবাধিকার কর্মীদের দেয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ।
ডব্লিউইএফের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, নারীদের কল্যাণের জন্য নেয়া পদক্ষেপগুলো ঊর্ধ্বমুখী গতিতে এগোচ্ছে। বলা যেতে পারে, সরকার নারীদের সত্যিকারের লিঙ্গ সমতার অধিকার বাস্তবায়ন করতে চাইলে অনেকগুলো অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা সরাতে হবে আগে।
পাকিস্তানের ডেইলি টাইমস থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম
এস মুবাশির নূর : ইসলামাবাদভিত্তিক শব্দ প্রকৌশলী ও ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট