বিস্ময়কর অর্জন

’৭২-৭৩ অর্থবছরের মাত্র ৩৪ কোটি মার্কিন ডলারের রফতানি আয় গত অর্থবছরে ৩ হাজার ৪শ’ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে
সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থান করছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ায় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতাও কমছে
রহিম শেখ ॥ চাঙ্গা হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। বিজয়ের ৪৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির এমন অর্জনকে বিস্ময়কর বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের মাত্র ৩৪ কোটি মার্কিন ডলারের রফতানি আয় গত অর্থবছরে ৩ হাজার ৪শ’ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এরমধ্যে গত পাঁচ মাসেই পণ্য রফতানি করে ১ হাজার ৩৬৯ কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। আগের বছরের চেয়ে ২২ শতাংশ বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে গত ৪ মাসে। এই সময়ে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে। মেশিনারিজ আমদানির তথ্যই বলছে, দেশে এখন বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ বিরাজ করছে। একই সময়ে বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ শতাংশেরও বেশি। আগের যে কোন সময়ের চেয়ে সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে মূল্যস্ফীতি। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থান করছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, রেমিটেন্স প্রবাহ, বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্যসহ সব সূচকেই এখন উর্ধমুখী ধারায় অবস্থান করছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ায় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতাও কমে আসছে। জানা গেছে, ১৯৭১ সালে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তানী শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল বাঙালী জাতি। স্বাধীনতার চার দশক পর সে স্বপ্ন অর্জনের পথে অনেকটাই এগিয়েছে দেশ। আর এ স্বপ্ন পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে রফতানি খাত। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের রফতানি খাত কাঁচা চামড়া ও পাট নির্ভর হলেও সময়ের আবর্তনে সে তালিকায় যুক্ত হয়েছে তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণসহ হাল্কা ও মাঝারি শিল্পের নানা পণ্য। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের মাত্র ৩৪ কোটি মার্কিন ডলারের রফতানি আয় গত অর্থবছরে পৌঁছেছে প্রায় ৩ হাজার ৪শ’ কোটি ডলারে। অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ মনে করেন, মাাথাপিছু কম জমি নিয়ে আর কোন দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে এমন ইতিহাস করেনি। আমাদের বিশ্ব অর্থনীতির সাথে ক্রমাগতভাবে বেশি করে সংযুক্ত হতে হবে। যে শিল্প পণ্যগুলো বহুমুখী করে রফতানি করব, সেগুলোর কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমাদের আমদানি করতে হবে, এটাই এখন চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার দৌড়ে নতুন বাজার বাড়ানোর পাশাপাশি আগামী দিনের রফতানি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

সাম্প্রতিকালে পোশাক শিল্পে বড় বড় দুর্ঘটনার পরও এ খাতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। মুখ ফিরিয়ে নেয়া বিদেশী ক্রেতারা আবারও ফিরছেন বাংলাদেশে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-নবেম্বর মেয়াদে অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে রফতানি খাতে আয় হয়েছে ১ হাজার ৩৬৯ কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার, যা গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের একই সময়ের রফতানি আয়ের তুলনায় ৮১ কোটি ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বা ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে তৈরি পোশাক খাতের পণ্য রফতানিতে আয় হয়েছে ১ হাজার ১১৩ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নবেম্বর মেয়াদে নিটওয়্যার খাতের পণ্য রফতানিতে ৫৬৩ কোটি ২৭ লাখ ৪০ হাজার এবং ওভেন গার্মেন্টস পণ্য রফতানিতে ৫৪৯ কোটি ৮৬ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আয় হয়েছে ১৮ কোটি ৬১ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে পাঁচ মাসে রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। রফতানি আয় এসেছে ৩৮ কোটি ৭২ লাখ ডলার। এ ছাড়া পাঁচ মাসে প্লাস্টিক পণ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৫৫ দশমিক ১৮ শতাংশ। এই সময়ে আয় এসেছে ১ কোটি ২৬ লাখ ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার ৭০০ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) দেশে মোট রফতানি আয় হয় তিন হাজার ৪২৫ কোটি ডলার। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মাফরুহা সুলতানা জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ কিছুদিন ধরে স্থিতিশীল থাকায় রফতানি বাণিজ্যে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অর্থবছরের বাকি মাসগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পদ্মা সেতুসহ সরকারের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নকে ঘিরে দেশে বিনিয়োগের ধারা আবারও শুরু হয়েছে। উদ্যোক্তারা এ সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছেন বলেই শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতির (ক্যাপিটাল মেশিনারিজ) আমদানি বাড়ছে বলে তারা মনে করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর এই ৪ মাসে ১১৯ কোটি ৫৯ লাখ ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পণ্যটির আমদানি হয়েছিল ৯৭ কোটি ৫৫ লাখ ডলার বা ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকার। ফলে পণ্যটির আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা হয়েছে ১৫১ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে পণ্যটির এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ১২০ কোটি ১৩ লাখ ডলার। অন্যদিকে, এ সময়ে এই পণ্যটির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে রেকর্ড ২০৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলার, যা গেল অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৮২ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। গেল অর্থবছরের একই সময়ে পণ্যটির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল ১১৪ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল বলেন, ধীরে ধীরে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে। ফলে বেসরকারী খাতে ঋণের চাহিদা আগের চেয়ে বেড়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দেশে পুরনো বিনিয়োগের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগও হচ্ছে। মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বৃদ্ধি সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত বলেন, পদ্মা সেতু, মগবাজার-মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল এবং কয়েকটি বড় বিদ্যুত কেন্দ্রের কাজ শুরু হয়েছে। এ সব ‘মেগা প্রকল্পের’ কাজ শেষ হলে দেশে শিল্প খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। এ সব বিবেচনায় নিয়েই আমাদের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা বিদ্যমান শিল্প প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্পের জন্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি করছেন। ভবিষ্যত ব্যবসা মাথায় রেখেই তারা এটা করছেন। আর দেশে ‘স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে’ বিরাজ করায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সেই আস্থা ফিরতে শুরু করেছে বলে মনে করেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ॥ ১৯৭২ সালে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ। বিদেশী মুদ্রার সঞ্চয়ন ১০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে এলে ভাবমূর্তি নষ্ট হবে বলে ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো আকুর আমদানি বিল বকেয়া রাখতে বাধ্য হয়েছিল বাংলাদেশ। ১৬ বছরের মাথায় সেই রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। এই হিসাবে গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের রিজার্ভ বেড়েছে ৩২ গুণ। যদিও বছরের শুরুতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চুরির ঘটনায় কিছুটা কমে আসে রিজার্ভের পরিমাণ। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশী মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। বাংলাদেশকে দুই মাস পরপর পরিশোধ করতে হয় আকুর বিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স কমেছে ১৫ শতাংশের বেশি। এরপরেও রিজার্ভ বাড়ার কারণ হিসেবে আমদানি কম হওয়ার কথা বলছেন অর্থনীতিবিদ জায়েদ বখত। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, আমদানিও কমেছে। সে কারণেই রিজার্ভের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া এরজন্য ফরেন এইড (বিদেশি সাহায্য) বেশি ছাড় এবং রফতানি আয়ের ইতিবাচক ধারার কথাও বলছেন তিনি।

রেমিটেন্স ॥ সম্প্রতি অবৈধ উপায়ে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আসার কারণে রেমিটেন্সের প্রবাহ কিছুটা কমেছে। পরিসংখ্যান মতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নবেম্বর এই পাঁচ মাসে প্রবাসীরা দেশে রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন ৬১৬ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। একক মাস হিসেবে নভেম্বর মাসে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১১৩ কোটি ৭৫ লাখ ডলার, আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বা ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত অর্থবছরের পুরো সময়ে দেশে রেমিটেন্স আসে ১ হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের চেয়ে ১০৮ কোটি ৮৬ লাখ ডলার বা ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছরের বাকি মাসগুলোতে রেমিটেন্স আসার পরিমাণ বাড়বে।

জাতীয় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ॥ চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ এসেছে ১৫ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, যা সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৮১.৩৮ শতাংশ। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পুরো সময় জুড়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, সুদের হার কমানোর পরও গত অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৫৩ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ এবং মেয়াদ পূর্তির পর আসল শোধ করা হয়েছে ১৯ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। এ হিসাবে নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকার। এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জনকণ্ঠকে বলেন, সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমলেও ব্যাংকের আমানতে সুদহারের তুলনায় অনেক বেশি। এজন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে। এই গবেষকের মতে, শেয়ার বাজারে দীর্ঘদিনের মন্দা এবং ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার কমানোয় নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকেছেন সবাই।

সরকারের ব্যাংক ঋণ কমছে ॥ আশার তুলনায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেশি হওয়ায় গত অর্থবছর জুড়েই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার চাহিদা ছিল কম। জানা গেছে, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ব্যাংক-ব্যবস্থা থেকে সরকার ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ নেয়া হবে ২৮ হাজার কোটি টাকা, আর স্বল্পমেয়াদী ঋণ ১৫ হাজার কোটি টাকা। আশার তুলনায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেশি হওয়ায় গত অর্থবছর জুড়েই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার চাহিদা ছিল কম। চলতি অর্থবছরেও একই ধারা অব্যাহত ছিল। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ৩১ জুলাই পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছর জুন শেষে ছিল ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ কমেছে ৩ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার ৭ হাজার ৮৯০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। এ সময় তফসিলি খাতের ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কোনো ঋণ নেয়নি সরকার। বরং এসময় সরকার আগের ঋণ পরিশোধ করেছে। আলোচ্য সময়ে সরকার তফসিলী ব্যাংকের ১০ হাজার ৩২০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে বিনিয়োগ মন্দা পরিস্থিতিতে সরকারের সিকিউরিটিজ এ্যান্ড ট্রেজারি বিল বা বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ করে অনেক ব্যাংক ন্যূনতম সুদহারে কিছু মুনাফা করার চেষ্টা করছে। তবে সঞ্চয়পত্র বিক্রির হার বেড়ে যাওয়ায় কমে গেছে সরকারে ঋণের চাহিদা।

বিদেশী বিনিয়োগ ॥ দেশী বিনিয়োগের নিবন্ধন কমলেও বিদেশী বিনিয়োগ আগের তুলনায় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক জুলাই-সেপ্টেম্বরে দেশী বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে ১০ হাজার কোটি টাকা, শতকরা হিসেবে ৩৩ শতাংশ। তবে ওই সময়ে বিদেশী বিনিয়োগের নিবন্ধন বেড়েছে ১৭৬ শতাংশ। এদিকে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শিল্প ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর (তৃতীয় প্রান্তিক) সময়ে মোট ৩০৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০ হাজার ২৫১ কোটি ৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা। আলোচ্য সময়ে স্থানীয় ও বিদেশী উভয় ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে প্রকৌশল শিল্প খাত থেকে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিআইডিএ) সদস্য নাভাস চন্দ্র ম-ল বলেন, সম্প্রতি বিনিয়োগ পরিবেশ আগের চেয়ে অনেক ভাল হয়েছে। দেশী ও বিদেশী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আগ্রহও বেড়েছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পরিসংখ্যানে। সংস্থা হিসেবে আমরাও নিবন্ধন প্রক্রিয়াগুলোকে অনেক সহজ ও আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি।

বেসরকারী খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ছে ॥ দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরে আসায় বেসরকারী খাতের ঋণপ্রবাহেও গতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর শেষে বেসরকারী খাতে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৮০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি। ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত এ খাতে ঋণ বেড়েছিল ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। এছাড়া গেল অর্থবছরের পুরো সময়ে এ খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ সময়ে শিল্প স্থাপনের মেয়াদী ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর এই ৩ মাসে শিল্পের মেয়াদী ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪৪ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে শিল্পের মেয়াদী ঋণ বিতরণ হয়েছিল ১ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। এদিকে, চলতি বছরের অক্টোবর মাস শেষে ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কের ঘরে নেমে এসেছে। এ সময়ে ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আগের মাস সেপ্টেম্বরে যা ছিল ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১১ শতাংশের ওপরে ছিল।

সিঙ্গেল ডিজিটের পথে ব্যাংক ঋণের সুদহার ॥ বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। সেই বাধা ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদহার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনার দাবি এবং বিদেশী ঋণ সহজলভ্য হওয়ায় ব্যাংকগুলো সুদহার কমাতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অক্টোবর শেষে ঋণ ও আমানত উভয় ক্ষেত্রেই সুদহার কমিয়েছে ব্যাংকগুলো। তবে আমানতের চেয়ে ঋণের সুদ তুলনামূলক কম কমেছে। এ সময়ে দেশের ৫৬টি ব্যাংকের ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। যা আগের মাসে ছিল ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ। এ সময়ে আমানতের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। যা আগের মাসে ছিল ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আমানতের পাশাপাশি ঋণের সুদ কমায় অক্টোবরে গড় স্প্রেড কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। যা আগস্টে ছিল ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে এ সময়ে ব্যাংকিং খাতে গড় স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করলেও বিদেশী খাতের ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড এখনও ৬ শতাংশীয় পয়েন্টের ওপরে রয়েছে।