প্রতিবন্ধিতা জয়ের অনন্য পাঠশালা প্রয়াস সুনাম ছড়িয়েছে দেশের বাইরেও

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোরদের জন্য প্রয়োজন বিশেষ শিক্ষা আর প্রশিক্ষণ। উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেলে তারাও হয়ে উঠতে পারে সমাজের আর দশজন মানুষের মতোই সৃষ্টিশীল ও কর্মক্ষম। প্রয়াস বিশেষায়িত শিশু-কিশোরদের প্রতিবন্ধিতার বাধা জয়ের অনন্য একটি পাঠশালায় পরিণত হয়েছে। আস্থা আর নির্ভরতায় বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে গড়ে তুলছে এই প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটিকে এখন বিশেষ শিশুদের জন্য শেষ আশ্রয়স্থলই বলা চলে। ‘বিশেষ শিশু, বিশেষ অধিকার’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত ‘প্রয়াস’- এর কার্যক্রম বিশেষ শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনছে।

২০০৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় অটিস্টিক বা প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে ‘সেনাসহায়ক স্কুল’ নামে এর যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০০৮ সালে নিজস্ব ভবন তৈরির জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০১০ সালে ‘সেনাসহায়ক স্কুলের’ নতুন নামকরণ করা হয় ‘প্রয়াস’। সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে প্রয়াস অটিস্টিক শিশুদের চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। শুধু ঢাকা সেনানিবাসে নয়, দেশব্যাপী এর বিস্তার ঘটছে। রংপুর, চট্টগ্রাম, যশোর, কুমিল্লা, সাভার, ঘাটাইল, সিলেট, রাজশাহী, রামু ও বগুড়া সেনানিবাসে প্রয়াসের শাখা সমপ্রসারিত হয়েছে।

প্রয়াসের বিশেষায়িত শিক্ষা কার্যক্রম সাধারণ স্কুল থেকে কিছুটা ভিন্ন। রয়েছে ৫টি বিশেষায়িত কার্যক্রম। এসব কার্যক্রমের প্রথমটি হলো- বিশেষায়িত ইন্টারভেনশন ক্লিনিক। এই কার্যক্রমের অধীনে রয়েছে মেডিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড কেয়ার, নিউরোলজি অ্যাসেসমেন্ট, অডিওলজি পরীক্ষা, মনোবৈজ্ঞানিক টেস্ট। দ্বিতীয়টি হলো সহায়ক থেরাপি সেবা। এর অধীনে রয়েছে- স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, সেনসরি ইন্ট্রিগেশন থেরাপি, ফিজিও থেরাপি, সুইমিং ও হাইড্রোথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, আউটডোর, কাউন্সেলিং, বিহেভিয়ার থেরাপি ও ইয়োগা।

প্রয়াসের মূল কার্যক্রমের অধীনে রয়েছে- প্রাক-শৈশবকালীন বিকাশমূলক কার্যক্রম, বয়স্ক শিক্ষা ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম, অটিজম বিদ্যালয়, বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা বিদ্যালয়, শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা বিদ্যালয় এবং শারীরিক ও বহুবিধ প্রতিবন্ধিতা বিদ্যালয়। এছাড়া রয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের নিয়মিত বিদ্যালয় (বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম) প্রত্যয় ইনক্লুশিভ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল (প্লে গ্রুপ থেকে ‘ও’ লেভেল পর্যন্ত) এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়।

প্রয়াসের নির্বাহী পরিচালক ও অধ্যক্ষ কর্নেল মোঃ শহীদুল আলম বলেন, ছোট্ট একটা ঘর থেকে আমাদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এখন এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রয়াস শুধু একক একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি বিশেষায়িত সেবা, চিকিত্সা, থেরাপি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক প্রতিষ্ঠান যেখানে সমন্বিত সেবা দেয়া হয়। সরেজমিনে গতকাল এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে একাধিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। জানা গেল, নিজের সন্তানের উন্নতি দেখে অভিভাবকরা বেশ খুশি। একই সঙ্গে সন্তুষ্ট বিশেষ শিশুদের শিক্ষকরাও।

জানা যায়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলায় প্রয়াসের শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ যাবত্ স্পেশাল অলিম্পিকসে অংশ নিয়ে প্রয়াসের শিক্ষার্থীরা ২৬টি স্বর্ণ, ১৫টি রৌপ্য ও ৪টি ব্রোঞ্জপদক অর্জন করে বিশ্ব প্রাঙ্গণে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। জাতীয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও নিয়মিত অংশ নিয়ে থাকে প্রয়াসের শিক্ষার্থীরা। প্রয়াসের ছাত্র-ছাত্রীরা তথ্য-প্রযুক্তিতেও অনেক এগিয়ে। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কম্পিউটার প্রতিযোগিতায় প্রয়াস সর্বাধিক সাফল্য অর্জন করেছে।

অজি রাউসিফ রায়াতের বাসা মিরপুরে। এক বছর ধরে প্রয়াসে পড়ছে সে। বাবা রেজানুল হক সিরাজী জানান, আগে খুব অস্থির ছিল। কারও কথা শুনতো না। সেই অমনোযোগী ছেলে স্কুলে ভর্তির পর সবাইকে চিনতে পারে, কথা বলে এবং গান গায়। অজির মা মনোয়ারা বিলকিস দীপা বলেন, অনেকে আমার ছেলেকে আমার পরিবারকে অবহেলা করতো। এখন আমার ছেলে কথা বলছে- কাউকে দেখলে সালাম দিচ্ছে। আমি অনেক খুশি। সামিরা জাহিদের বয়স ১১ বছর। সে কথা বলতে পারতো না। শ্রবণ প্রতিবন্ধী ছিল। তার মা ফারহানা ইসলাম বলেন, আমার বাচ্চাটা এখন কথা বলতে পারে। আমাকে মা বলে ডাকে। এর চাইতে আনন্দের আর কী আছে!

সাদাত কাইয়ুমের বাবা মরহুম আব্দুল কাইয়ুম। ছেলেটার বয়স ১৫ বছর। বাসা রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে। সে ছিল অমনোযোগী, চঞ্চল। তাকে নিয়ে মা-বাবার টেনশনের শেষ ছিল না। ভালো ছবি আঁকে সে। ঘরে মানুষ প্রবেশ করছে এমন ছবি এঁকেছে। এছাড়া গান এবং নাচ পছন্দ করে সাদাত। আরিফ মোহাম্মদ নাঈমের বাবার নাম নজরুল ইসলাম। বাসা রাজধানীর মানিকদিতে। এই অটিস্টিক শিশু কথা বলতে পারতো না। মন যা চাইতো তাই করতো। এখন প্রয়াসের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র সে। শিক্ষক রুমানা সাঈদ তাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সে এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।

সাজিয়া খানের অবস্থাও একই ছিল। সে এখন আইটি শিখছে। তাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন। কাজী আদনান মাহমুদের বাবা কাজী আহসান মাহমুদ। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা এই লোক ব্যবসা করেন। তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড় আদনান। এখন সেই ছেলে লেখাপড়া করছে। কথা বলছে। ছেলের হাতের লেখা খুব সুন্দর বলে জানালেন এই বাবা। রাফিদ আহসান আইটি বিশেষজ্ঞ। প্রোগ্রাম বানাতে পারে। সম্প্রতি চিনে গিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে এসেছে।