ওষুধ শিল্পে বিপুল সম্ভাবনা

স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশি বাজারে সুনামের সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের ওষুধ। স্বল্প মূলধন ও ওষুধের গুণগত মান বজায় রাখায় বিদেশি বাজারে বাড়ছে দেশীয় ওষুধের চাহিদা। এর অন্যতম আরেকটি কারণ হচ্ছে, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ওষুধের দাম অনেক কম। এতে বিদেশে রপ্তানি পণ্যের তালিকায় ওষুধ শিল্প বড় ভূমিকা পালন করছে। বাড়ছে রপ্তানি আয়। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে ওষুধ রপ্তানি ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে নতুন করে আশা সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প। বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ পৃথিবীর প্রায় ১২৬টি দেশে বাংলাদেশের ৫৪টি কোম্পানির ৩০৩টি গ্রুপের ৮৩৬ কোটি ৮৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮০৭ টাকার ওষুধ রপ্তানি করছে। এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখা গেলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের ওষুধ খাত তৈরি পোশাকশিল্পের মতো বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের বড় একটি খাত হয়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধ খাতে এসব অর্জনের পেছনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। দেশের অনেক কোম্পানিই এখন আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি করছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সার্টিফিকেশন সনদও পেয়েছে বেশকিছু কোম্পানি। এ কারণে ওইসব দেশসহ অন্য দেশে ওষুধ রপ্তানি পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও ওষুধ শিল্প বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা পাওয়া গেলে এর বিকাশ সামনে আরো বাড়বে বলে মনে করেন তারা।
ওষুধ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, পাবনা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১ হাজার ৩৩৮টি ছোট বড় ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোর মধ্যে বেশকিছু কারখানা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে বেক্সিমকো, স্কয়ার, গøাক্সো, রেনেটা, ইনসেপটা, হেলথ কেয়ার, এসকেএফ, সেনডোজসহ বেশকিছু কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদিত হয়। দেশের উন্নতমানের ৫৪টি কোম্পানি ৩০৩টি গ্রুপের ওষুধ রপ্তানি করে থাকে। ২০১৫ জুলাই থেকে ২০১৬ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিশ্বমানের ৫৪টি ওষুধ কোম্পানির কারখানাতে উৎপাদিত ৮৩৬ কোটি ৮৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮০৭ টাকার ওষুধ আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, জাপান, ইতালি, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বিশ্বের ১২৫টি দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। গত অর্থবছরে প্রায় ৬০৪ কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি হয়েছিল।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. রুহুল আমিন ভোরের কাগজকে জানান, বিশ্বে ওষুধ উৎপাদনকারী অনুন্নত ৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প দ্রুত বিকাশমান একটি শিল্প খাত; সময়ের সঙ্গে এর চাহিদা বাড়ছে। দেশের উৎপাদিত ওষুধ দিয়ে স্থানীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশ মেটানো সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের ১২৫টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। তিনি আরো বলেন, কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে এরই মধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টকে (এপিআই) পার্ক স্থাপনের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ পার্কের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। ২০১৮ সাল নাগাদ সেখানে এপিআই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কারখানা গড়ার কাজ শুরু করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, দেশের ২৭৮টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করে। এ ছাড়া দেশের ২৬৬টি ইউনানী, ২০৫টি আয়ূর্বেদিক, ৭৯টি হোমিওপ্যাথিক ও ৩২টি হারবাল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন করে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশ খুবই আশাব্যঞ্জক। বছর কয়েক আগেও জীবনরক্ষাকারী পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। কোটি কোটি টাকার ওষুধ আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটানো হতো। ওই সময় বিদেশি কোম্পানির হাতে দেশের ওষুধের বাজার জিম্মি হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটত। দেশে একই রোগের একই ওষুধ বিভিন্ন নামে বিভিন্ন কোম্পানি উৎপাদন এবং বাজারজাত করছে। বর্তমানে দেশের প্রয়োজনীয় প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধই দেশের কারখানাগুলোতে উৎপাদিত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আমি আশা করি ওষুধ শিল্পের হাত ধরে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দিকে যাবে। আর সব ঠিক থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ আমরা গার্মেন্টস শিল্পকে ছাড়িয়ে এক নম্বর রপ্তানি পণ্য হিসেবে জায়গা করে নিতে পারব। আর যদি এক নম্বরে আসতে হয় তাহলে অবশ্যই বিদেশের ওপর আমাদের ওষুধের কাঁচামাল নির্ভরতা কমাতে হবে। অন্যদিকে যত দ্রুত সম্ভব ওষুধ শিল্প পার্ক চালু করা গেলে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য বড় দুয়ার উন্মুক্ত হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়, ওষুধ শিল্পের জন্য মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন বাউশিয়া ও লক্ষীপুর মৌজায়, ২০০ একর জায়গাজুড়ে একটি অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) গড়ে তোলার প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এই পার্কটির প্রধান উদ্দেশ্য ওষুধের ব্যবসায়িক প্রসার, বৈচিত্র্য সৃষ্টি, মান উন্নয়নে গবেষণা করা। এ ছাড়াও ওষুধ উৎপাদনে যেসব কাঁচামাল প্রয়োজন ও যেসব কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশেই তা উৎপাদন করা ও কাঁচামাল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো বা বন্ধ করা। ফলে বছরে সাশ্রয় হবে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০১০ সালের ডিসেম্বরে, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতা ও প্রতিক‚লতার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের শেষেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
রপ্তানিতে শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে বেক্সিমকো ফার্মা লিমিটেড, ইনসেপ্টা ফার্মা লিমিটেড, স্কয়ার ফার্মা লিমিটেড, নোভারটিস (বিডি) লিমিটেড, টেকনো ড্রাগস লিমিটেড। এ ছাড়াও পর্যাক্রমে রয়েছে, দ্য একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, এরিস্টো ফার্মা লিমিটেড, রেনেটা লিমিটেড, এসকেএফ ফার্মা বাংলাদেশ লিমিটেড, এসিআই লিমিটেড, পপুলার ফার্মা, পপুলার ইনফিউসন, বায়ো ফার্মা, অপসোনিন, গ্লোব ফার্মা, বীকন ফার্মা, ড্রাগস ইন্টারন্যাশনাল, হেলথকেয়ার ফার্মা, ওরিয়ন ফার্মা, জেসন, নাভানা, জেনারেল, ডেলটা, গøাস্কো, ইবনেসিনা, রেডিয়ান্ট, নভো হেলথকেয়ার ফার্মাসহ আরো কয়েকটি কোম্পানি।
দেশের রপ্তানির শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মার আন্তর্জাতিক মার্কেটিং ম্যানেজার ওয়াসিম হায়দার ভোরের কাগজকে বলেন, বেক্সিমকো ফার্মা এখন বিভিন্ন সম্ভাবনাময় এবং উন্নত দেশের বাজারে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের ওষুধের মান ও প্রাইস কম থাকায় খুব দ্রুত বিশ্বের বাজার দখল করছি আমরা। বেক্সিমকো ফার্মা ৫০টির বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে থাকে। এখন ওষুধ রপ্তানি করার জন্য সম্ভাবনাময় দেশগুলোর দিকে নজর দেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত আমাদের ৬০০’র বেশি পণ্যের রপ্তানি করার রেজিস্ট্রেশন আছে। তা আরো বাড়ানোর জন্য ওষুধ রেজিস্ট্রেশনের ওপর বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। কারণ রেজিস্টেশন পেতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। এর পরে ওষুধ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমরা প্রথম ওষুধ রপ্তানি করছি। হাইপারটেনশনের ওষুধ কার্ভোডিল দিয়ে রপ্তানি শুরু করা হয়েছে চলতি বছরে। সামনের বছর আর একটি ওষুধ রপ্তানি করা হবে বলে জানান তিনি। দেশে ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করা গেলে বিশ্বের আমাদের অবস্থান আরো শক্ত করা যাবে। বর্তমানে ভারত আমাদের চেয়ে কম দামে ওষুধ রপ্তানি করছে। তারা নিজেদের দেশেই ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করে বলেই বিশ্বে ওষুধের বাজার দখল করে রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসের (জুলাই-অক্টোবর) পর্যন্ত ২ কোটি ৬৭ লাখ মার্কিন ডলার রপ্তানি করা হয়। যা চলতি বছর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার রপ্তানি করা হয়। যা এর আগের বছরের তুলনায় ২.৭৭ শতাংশ বেশি।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) গত নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে ছাড় দেয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এর ফলে বাংলাদেশ আরো ১৭ বছর মেধাস্বত্বের জন্য কোনো ব্যয় না করেই ওষুধ তৈরি ও কেনাবেচা করতে পারবে। ক্যান্সার, আর্থ্রাইটিস, অ্যাজমাসহ অনেক জটিল রোগের ওষুধও দেশের মানুষ কম মূল্যে পাবে বলে আশা করছেন তারা।