ধামের গানে কৃষক জাগে

সব ধর্মের মানুষের বিনোদনের খোরাক। ধাম শব্দের অর্থ আশ্রয়স্থল। হেমন্তে এই গানের আসর বসে চলে শীতের শুরু পর্যন্ত। এই অঞ্চলে নতুন ফসল ঘরে তোলার পর কৃষকের আনন্দ উদ্যাপনের অন্যতম মাধ্যম ধামের গান। এই গানের আরো কয়েকটি নাম রয়েছে। তা হলো—মারাঘুরা গান, পালাটিয়া গান, হুলিগান, দেবীর ধামের গান, লক্ষ্মীর ধামের গান ইত্যাদি। স্থানীয়রা এই গানকে ‘ধামের গাউন’ বলে থাকে।
ধামের গান মূলত শাস্ত্রীয় রংপাঁচালি, পাঁচমিশালি ও যাত্রাপালার ঢংয়ে উপস্থাপন করা হয়। শীতের শুরুতে সাধারণত লক্ষ্মীপূজার পর থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন গ্রামে শুরু হয় শত বছরের প্রাচীন ধামের গানের আসর। চলে কালীপূজার পরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। গ্রামে গ্রামে রং-বেরঙের কাপড় টাঙিয়ে ও মাটির উঁচু ঢিবির চারপাশে বাঁশের ঘের দিয়ে সেখানে রাতভর এ গান অভিনয় সহকারে গাওয়া হয়।

এ গানের সংলাপ হয় সংক্ষিপ্ত আর ভাষা সম্পূর্ণ আঞ্চলিক। সংলাপ গদ্যেও হয় আবার গানেও হয়। গানের আধিক্যের কারণেই এর নামের শেষে গান যুক্ত করা হয়েছে। দৈনন্দিন জীবন যাপনের নানা বিষয় নিয়ে তৈরি হয় নাটকের গল্প ও গান। এই গল্পে যেমন থাকে প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষের আনন্দ উপাখ্যান, তেমনি থাকে নানা দুঃখ বেদনার উপস্থাপন। প্রেম-পরকীয়া, মহাজনের শোষণ, সাংসারিক নানা টানাপড়েন অত্যন্ত সরল সহজভাবে উঠে আসে প্রতিটি গল্পে। জটিল বিষয়গুলোকেও হাস্যরসের মাধ্যমে চিত্তাকর্ষক করে তোলা হয় অভিনয়ের মাধ্যমে। গল্পগুলো মূলত নায়িকাকেন্দ্রিক। একেকটি গল্পে তৈরি লোকনাট্যকে আলাদাভাবে পালা হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। আর একরাতে তিন-চারটি পালা অনুষ্ঠিত হয়। পালাগুলোর ব্যাপ্তি গল্পভেদে এক ঘণ্টা থেকে দেড়-দুই ঘণ্টা পর্যন্ত হয়ে থাকে। একেকটি দল এসে একেক পালা পরিবেশন করে। পালার দলগুলোর নাম হয় তাদের গ্রাম বা পাড়ার নামে। যেমন কচুবাড়ী পালাটিয়া দল, চুচুলি বটতলী পালাটিয়া দল, বালাভীর গোয়ালপাড়া পালাটিয়া দল। কখনো কখনো ধামের গানের আসর একটানা সাত দিন পর্যন্ত চলে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঢোলারহাট এলাকার বুড়িরধাম গ্রামের ডা. শচিন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘কবে, কিভাবে এই ধামের গান শুরু সেটা বলা মুশকিল। আমি ধামের গানে এক সময় অভিনয় করতাম। এখন আমার ছেলে ও ভাতিজারা এই গান করে। আমি গানের পরিচালক হিসেবে তাদের সঙ্গে রয়েছি। আমার পূর্বপুরুষরাও এই গানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ’

গানের শিল্পী সুবাস চন্দ্র রায় বলেন, ‘খুব ছোটবেলা থেকে তিনি দেখেছেন শীতের সময় তাঁর বাবা ও দাদারা গ্রামে গ্রামে এই গান করে বেড়াতেন। তাঁদেরই হাত ধরে আমিও এই ধামের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মূলত এটা কোনো পেশা নয়, নেশার টানেই আমরা গান করি। ’

জানা যায়, ঠাকুরগাঁও জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্রায় ছয় শতাধিক ধাম বসে। বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার চাড়োল খোকোপাড়া, পতিলাভাষা, ভাণ্ডার রানী দেবধাম, ফুটানি বাজার, বগাদিঘী, বড়পুল, ডাক্তারপাড়া, হরিভিটা, লাহিড়ীধাম, পীরগঞ্জ উপজেলার মিত্রবাটি, বাঁশগাড়া, দস্তমপুর, মাটিয়ানি, আগ্রা গড়িনাবাড়ী, দানাজপুর, শীতলপুর, বিশ্বাসপুর সদর উপজেলার আকচা, রায়পুর, রহিমানপুরসহ অন্যান্য ইউনিয়নে রয়েছে চার শতাধিক ধাম। এ ছাড়া পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় রয়েছে বেশ কিছু ধামের গানের দল। গানে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র যেমন ঢোল, খঞ্জনি, একতারা, খোল, বাঁশি, হারমোনিয়াম এসবই ব্যবহার করা হয়। মঞ্চের মাঝখানে যন্ত্রীরা বৃত্তাকারে বসে থাকেন। কুশীলবরা দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে অভিনয় করেন। মাঝে মাঝে যন্ত্রীরাই তাৎক্ষণিক নতুন সংলাপের সূচনা করেন।

খনগাঁও গ্রামের ধামের গানের শিল্পী বাবুল খান বলেন, “হিন্দু-মুসলিম সবাই একসঙ্গে গানে অভিনয় করে থাকে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে ধামের শিল্পীরা দর্শকদের বিনোদন দেন। প্রতি বছর ধামের পালায় আমি অভিনয় করি। এ বছর পালার নাম ‘ভাগ্যের পরিহাস’। এই কাহিনীটি আমরা নিজেরাই সবাই মিলে বসে রচনা করেছি। ”

শিল্পী জ্যোতিষ বলেন, তিনি কৃষিকাজ করেন। ধান উঠতে এখনো কয়েক সপ্তাহ দেরি রয়েছে। তাই এই সময় তাঁদের হাতে তেমন কোনো কাজ থাকে না। বসে না থেকে গ্রামের বিভিন্ন বয়সের পনেরো থেকে বিশজন মিলে পালার টিম গঠন করেছি। এক-দুই সপ্তাহজুড়ে আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ধামের আসরে তাঁরা পালা করবেন। এ থেকে তাঁদের বাড়তি সামান্য কিছু টাকাও উপার্জন হয়।

স্থানীয় লোকনাট্যই এ অঞ্চলে ‘ধামের গান’ নামে পরিচিত। ১২ থেকে ২৫ সদস্যের পুরুষকেন্দ্রিক এ ধামের গানের দলে গ্রাম্য যুবকরাই মেয়ে সেজে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে একটি কাহিনী ফুটিয়ে তোলে। আসরে বসেই আঞ্চলিক ভাষায় তাৎক্ষণিকভাবে এ পালা রচনা করে পরিবেশন করেন শিল্পীরা। ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে গ্রামাঞ্চলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের একমাত্র বিনোদন এই ধামের গান, যা রাতভর জেগে উপভোগ করে সবাই। যেখানে রাষ্ট্রের নেই কোনো পৃষ্ঠপোষকতা, নেই বাড়তি নিরাপত্তার কোনো বিষয়।

খনগাঁও ধাম পরিচালক ক্ষুদিরাম রায় জানান, পালার বাজনা, শিল্পীদের ড্রেস, মেকআপ, যাতায়াতের ভাড়া ও চা-নাশতার খরচ দিয়ে পালা করে এখন তেমন কিছু থাকে না। তবু তাঁরা মনের টানে ও নেশায় এই ধামের গানের দল ধরে রেখেছেন। এখানে টাকা-পয়সা বড় ব্যাপার নয় বলে তিনি জানান।

ঠাকুরগাঁওয়ের ধামের গানের গবেষক অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচ উপজেলায় দুই শতাধিক ধামের গানের দল রয়েছে। এ গান সাধারণত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আয়োজন করে। স্থানীয় গ্রামবাসীর কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে এ গানের আয়োজন করা হয়। এটি অতি প্রাচীনতম গান। বর্তমানে এ গানে যাত্রাপালার গল্প উপস্থাপন করে অতি আধুনিকায়ন করায় এখন ধামের গান বিকৃত হচ্ছে। তাই সরকারিভাবে এই ধামের গানের পৃষ্ঠপোষকতা ও এর নিজস্বতা ধরে রাখতে স্বীকৃতির প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জেলা প্রশাসক আবদুল আওয়াল আশ্বাস দিয়ে বলেন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ গানকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি এ অঞ্চলের ধামের গানের স্বীকৃতি ও প্রসারের জন্য চেষ্টা করা হবে।