দক্ষিণ এশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য

সমপ্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদেশ সফরের সময় তার বিমানে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছিল। এর আগেও একবার ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের সময় রানওয়েতে পড়ে থাকা কিছু মেটাল অপসারণ না করায়, দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। দু-দু’বারই তিনি প্রাণে বেঁচে যান, এ দুটি নিছক দুর্ঘটনা না এর পিছনে বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা কাজ করেছে সেটি তদন্তের আওতায় যথাযথভাবে আনা উচিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিমান অবতরণের সময় রানওয়ে যদি বিপজ্জনক অবস্থায় থাকে অথবা উড়ন্ত বিমানে যদি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়, সেটি কর্তব্যে অবহেলার কারণে হয়েছে কিনা তা তদন্ত করে দেখা উচিত। না হলে মানুষের মনে এই সন্দেহই থাকবে এটা কোনো চক্রান্ত কিনা? কারণ ইতোপূর্বে তার উপর ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাসহ অসংখ্য হামলা হয়েছে। তিনি প্রতিবারই অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। কিউবার সদ্য প্রয়াত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্র প্রায় ছয়’শ ত্রিশবার হামলার শিকার হন এবং প্রতিবারই তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। এক্ষেত্রে তাদের দু’জনের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।

বাংলাদেশে আরও বহু নেতা রয়েছেন, এমনকি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও আছেন, তাদের প্রাণনাশের চেষ্টা তো দূরের কথা, এমনকি গায়ে একটি ফুলের টোকাও পড়েনি। শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে তেমনি তার কন্যা শেখ হাসিনাকেও বার বার নির্মমভাবে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। একটু ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, যারাই জনগণের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় লড়াই করেন, দেশ ও বিদেশের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, গণশত্রুর দল তাদেরকে বার বার হত্যার চেষ্টা চালায়। গান্ধী, লিংকন, শেখ মুজিবুর রহমান এরা তাই গণশত্রুদের ক্রোধের শিকার। শেখ হাসিনা বর্তমানে শুধু বাংলাদেশ বা উপমহাদেশে নয়, সারা দক্ষিণ এশিয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে এসেছেন। এই অবস্থানে আসার জন্য তাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তিশালী চক্রের সাথে লড়াই করতে হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ভূমিকা নিতে হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। এদিক থেকে একজন নারী হয়েও দক্ষিণ এশিয়ায় তার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সাফল্য এখন বহুল আলোচিত।

দক্ষিণ এশিয়ায় এর আগেও নারী নেতৃত্ব বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। শ্রীলঙ্কায়, প্রধানমন্ত্রী বন্দরনায়েককে হত্যা করার পর তার গৃহবধূ শ্রীমাভো বন্দরনায়েক রাজনীতিতে যোগ দেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি স্বামীর হত্যাকারীদের বিচারের ব্যবস্থা করেন কিন্তু শ্রীলঙ্কার অশান্ত পরিস্থিতি ও তামিল বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর পিতা জুলফিকার আলি ভুট্টোকেও বিচার প্রহসনে হত্যা করা হয়। বেনজির পিতার হত্যাকারীদের সঙ্গে আপস করে তার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বটে কিন্তু নিজেকে যেমন রক্ষা করতে পারেননি, তেমনি পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ভিত্তিও শক্ত করে যেতে পারেননি। পাকিস্তানে নামে গণতন্ত্র থাকলেও আসলে এখনও চলছে Invisible military rule বা অদৃশ্য সামরিক শাসন।

এশিয়ায় নারী নেতৃত্বের আরও উদাহরণ রয়েছে। যেমন মিয়ানমারের প্রয়াত নেতা অং সানের কন্যা সু চি। তার পিতাকে গণশত্রুরা হত্যা করে। আটষট্টি বছর জেল জুলুম খাটার পর তিনি এখন মুক্ত এবং মিয়ানমারের সামরিক শাসন শিথিল হয়েছে কিন্তু গণতন্ত্র এখনও পূর্ণ মুক্তি পায়নি। অনুরূপভাবে ফিলিপাইনে স্বৈরাচারী শাসক মারকোসের হাতে নিহত হন দেশটির জনপ্রিয় নেতা আকিনু। তার স্ত্রী মিসেস আকিনু গৃহবধূর বেশ ছেড়ে দিয়ে মারকোসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন। তিনি বিশাল গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। নির্বাচনে বিপুল জয়ের অধিকারী হয়ে ক্ষমতায় বসেন, মারকোসের পতন হয় কিন্তু তার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার করতে পারেননি তিনি। সামরিক বাহিনীর যে নেতারা মারকোসের নির্দেশে আকিনুকে হত্যা করেছিল তাদের সঙ্গেই তিনি পরে আপস করে ক্ষমতায় থাকেন। ফিলিপাইন থেকে সামরিক ঘাঁটি অপসারণের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন তা রক্ষা করতে পারেননি এবং ওই সামরিক নেতাদের একজনের হাতেই তার মেয়াদ শেষে শাসনভার হস্তান্তর করেন।

শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, সারা বিশ্বে নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি বড় ব্যতিক্রম ভারতের মিসেস ইন্দিরা গান্ধী। তিনি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। ভারতের মর্যাদাকে আধিপত্যবাদীদের কাছে বিকিয়ে দেননি। পরাশক্তির ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য সহযোগিতা দেন এবং ভারতে গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করেন। সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তে তাকে নির্মম মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে কিন্তু তিনি তার পিতা নেহেরুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভারতে আধুনিক গণতন্ত্রের যে ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন, তা এখনও কেউ ধ্বংস করতে পারেনি। বিজেপি ক্ষমতায় আসা সত্ত্বেও পারেনি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কিছুদিন ইন্দিরা গান্ধীর সাহচর্যে কাটিয়েছেন এবং তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে বেশ কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন। ভারতীয় রাজনীতির অসামপ্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি মিল রয়েছে। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রের সামপ্রদায়িক কাঠামো ভেঙে গণতান্ত্রিক সমাজবাদের কাঠামো গড়তে চেয়েছিলেন। শেখ হাসিনা পরবর্তীকালে সেই কাঠামোই আবার পুনঃনির্মাণের চেষ্টা করছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যান্য নারী নেত্রীরা যা পারেননি বাংলাদেশে শেখ হাসিনা তা পেরেছেন। তিনি পিতার ঘাতকদের বিচার এবং দণ্ড নিশ্চিত করেছেন। যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে প্রায় বিরল। যে কাজটি ছিল সবচেয়ে কষ্টসাধ্য, একটি সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনকে গণতান্ত্রিক পন্থায় উচ্ছেদ করে, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যা তিনি করেছেন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের (জামায়াতসহ) বিচার করা এবং দণ্ড দেওয়া ছিল অকল্পনীয়। তারা বিএনপির রাজনীতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে, রাষ্ট্র ক্ষমতাতেও আসীন হয়েছিল। তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তিশালী চক্র। তিনি সেই দুস্তর বাধা অতিক্রম করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। দেশে বিএনপি জামায়াত নির্বাচন বানচালের জন্য যে ভয়াবহ সন্ত্রাসের পথ গ্রহণ করেছিল, তাকে তিনি প্রতিহত করেছেন। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিপদ ঘনিয়েছিল আইএস-এর মুখোশ ধারণ করে একদল ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীর বাংলাদেশে সন্ত্রাস সৃষ্টি। ব্লগার হত্যা থেকে শুরু করে, রেস্টুরেন্টে, ঈদগাহে হামলা, সংখ্যালঘু হত্যা ইত্যাদি দ্বারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করার ভয়াবহ চেষ্টা হয়েছিল। হাসিনা সরকার তা দমন করেছেন।

সারা দক্ষিণ এশিয়া যখন তথাকথিত ইসলামি সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত; পাকিস্তানে, আফগানিস্তানে, এমনকি ভারতেও কোনো কোনো স্থানে চলছে সন্ত্রাসী হামলা, তখন বাংলাদেশে এই সন্ত্রাস দমনে হাসিনা সরকার যে সাফল্য দেখিয়েছেন তার প্রশংসা করেছেন আমেরিকার বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে রক্ষা করার জন্য শেখ হাসিনার ভূমিকা ও নেতৃত্ব আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার সাফল্যের জন্য তিনি শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য তিনি পেয়েছেন ‘চ্যাম্পিয়ন অফ দা আর্থ’ পদক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভারতী থেকে পেয়েছেন ‘দেশিকত্তম’ পদক। অর্থাত্ বিশ্বের অত্যন্ত প্রভাবশালী নারীদের মধ্যে আজ শেখ হাসিনা যেমন গণ্য, তেমনি দক্ষিণ এশিয়ায়ও তার নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য এখন আলোচিত এবং স্বীকৃত। দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও হাসিনা সরকারের সাফল্য অভাবনীয়। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন ‘এই উন্নয়ন তুলনাহীন।’ দেশ থেকে দারিদ্র্য ও মঙ্গা দূর করা, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা প্রবর্তন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রদান, পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তুতি গ্রহণ, ভারতের সঙ্গে স্থল চুক্তি এবং ছিটমহল চুক্তি সম্পাদন, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন। শেখ হাসিনার শাসনকালকে ইতিহাসে “An era of prosperity” বা সমৃদ্ধির যুগ বলে অবশ্যই গণ্য করা হবে।

বাংলাদেশের এই উন্নয়ন এবং শেখ হাসিনার এই রাজনৈতিক সাফল্যকে ব্যর্থ করতে না পেরে তাকে হত্যা করার আরও চেষ্টা হতে পারে। বাংলাদেশের শত্রুরা এখনও নির্মূল হয়নি। তারা ওত পেতে আছে, সেজন্যই শেখ হাসিনার সামপ্রতিক সফরকালে বিমানে যে যান্ত্রিক গোলযোগ হয়েছে, তা হতে পারে সামান্য যান্ত্রিক গোলযোগই কিন্তু তার পিছনে কর্তব্যে অবহেলা অথবা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির কোনো হাত রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা উচিত। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, শেখ হাসিনার শুভাশুভের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সারা দক্ষিণ এশিয়ার শুভাশুভ।

Views: 26