ভূমি অধিগ্রহণে তিন গুণ ক্ষতিপূরণ

নিজের পাতা ফাঁদ থেকে ভূমির মালিককে বের করে এনে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৬’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

নানা ধাপ পেরিয়ে এই আইন কার্যকর হলে ভূমি অধিগ্রহণে ব্যাপক সংস্কার হবে বলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে সরকারি সংস্থার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হলে বাজারদরের চেয়ে দুই গুণ বেশি ক্ষতিপূরণ ভূমির মালিককে দেওয়া হবে। ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো লাভজনক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হলে ক্ষতিপূরণের হার হবে তিন গুণ বেশি। অধিগ্রহণকৃত স্থানের গাছপালা বা অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণের হার হবে বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ। বাস্তুচ্যুত পরিবারকে পুনর্বাসান করা হবে। এ জন্য বিধি প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে আইনে। বর্তমানে দেড় থেকে দুই গুণ বেশি ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে।

যে উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে সে কাজে জমি ব্যবহার না হলে বা পতিত থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে খসড়া আইনে। ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার জন্য অপেক্ষাকৃত কম সময়ের বিধান রাখা হয়েছে। অন্যান্য প্রকল্প বা স্থাপনার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ আপিল নিষ্পত্তির চেয়ে ফাস্ট ট্র্যাক বা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের আপিল নিষ্পত্তির সময় অর্ধেক নির্ধারণ করা হয়েছে।

মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে একজন সিনিয়র মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশের জমির মালিকরা কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য জমির বিক্রি দলিলে কম দাম দেখায়। এতে তারা নিজের ফাঁদে নিজে ধরা পড়ে। কখনো যদি ওই জমি অধিগ্রহণ করা হয় তখন বাজারদরের চেয়ে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এতে সংশ্লিষ্ট জমির মালিক ক্ষতিপূরণের টাকা কম পায়। তাদের এই ক্ষতি যাতে পুষিয়ে দেওয়া যায় সে কারণে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে জমির মালিকের ক্ষতি হবে না আর সরকারের রাজস্বও বাড়বে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এই আইনের ফলে সরকারি সম্পত্তির অপচয় হ্রাস পাবে। কারণ আমাদের দেশের অনেক মানুষ যখন জানতে পারে কোনো জমি অধিগ্রহণ হবে তখন তারা সেই জমির বেশি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার লোভে অস্থায়ী স্থাপনা, ঘরবাড়ি বা অবকাঠামো তৈরি করে। অনেকে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে। এতে সরকারের অর্থের অপচয় হয়। জমির দাম নির্ধারিত হবে একই মৌজার একই শ্রেণির জমির বিগত বছরের ১২ মাসের জমি কেনাবেচার গড় দামের ভিত্তিতে। এই আইন হলে সাধারণ ভূমি মালিকরাও উপকৃত হবে। কারণ অনেক মৌজা আছে যেখানে দশকের পর দশক জমি হাতবদল হয় না। সেসব জমিও যদি কোনো কারণে অধিগ্রহণ করা হয়, তারাও অতিরিক্ত দাম পাবে। ’

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্টদের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা প্রতিরোধ করার জন্য নোটিশ জারির সাত কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসক ও প্রত্যাশী সংস্থা অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত সম্পত্তির অবস্থা ও উপরিস্থিত অবকাঠামো, গাছপালা এসবের ভিডিওচিত্র ও স্থিরচিত্র প্রণয়ন করবে। জেলা প্রশাসক যুক্তিসংগত কারণে এসব বিবরণী প্রণয়নের সময় সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত বাড়াতে পারবেন। বাস্তবে ভূমির রেকর্ডীয় শ্রেণি পরিবর্তন হলে জেলা প্রশাসক তা চূড়ান্ত করবেন। জেলা প্রশাসকের অদেশে কেউ ক্ষুব্ধ হলে তিনি নোটিশ জারির সাত দিনের মধ্যে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করতে পারবেন। বিভাগীয় কমিশনার সংশ্লিষ্ট ভূমি মালিকের আপিল শুনানি গ্রহণ করবেন এবং পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাবেন। ফাস্ট ট্র্যাক বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে বিভাগীয় কমিশনারকে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। আপিল নিষ্পত্তি হলে বা অপিল না করলে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মালিক অধিগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি হতে সব অবৈধ স্থাপনা, বাড়ি বা অবকাঠামো নিজ খরচে অপসারণ করবেন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের স্থান নির্বাচনের পর জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট এলাকার জমি কেনাবেচা ও অবকঠামো নির্মাণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবেন।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ১৯৮২ সালের অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। আর বড় বড় প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সংসদে আলাদা আইন পাস করা হয়। পদ্মা বহুমুখী সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও পায়রা বন্দরের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সংসদে আলাদা আইন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনটি অনুমোদিত হলে ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য আলাদা কোনো আইন প্রণয়ন করতে হবে না। যমুনা বহুমুখী সেতুর জন্যও ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। ওই প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির একটি বড় অংশ এখনো অব্যহৃত পড়ে আছে। এ কারণে খসড়া আইনে অধিগ্রহণকৃত জমি অব্যহৃত থাকলে তা সংশ্লিষ্ট মালিককে ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, আইনটি ভূমিসংক্রান্ত একটি জটিল আইন। এ জন্য এটাকে আরো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার জন্য আইনমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভূমিসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব হবেন এ কমিটির সদস্য, কমিটি মনে করলে আরো সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। কমিটি ভেটিংসহ (আইন মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা) আইনটি চূড়ান্ত করবে। খসড়া আইনে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ‘পাবলিক পারপাস’ ও ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’ বলে দুটি শব্দ আছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘দুটি শব্দ সত্যিকার অর্থে কী বোঝায় এটা বিশ্লেষণ করে আইনে সংযোজন করার জন্য কমিটিকে বলা হয়েছে। ’

মন্ত্রিপরিষদসচিব আরো জানিয়েছেন, ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০১৬’ আইন আকারে জারির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এর আগে গত ৭ নভেম্বর পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০১৬ অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সংসদ না থাকায় ২১ নভেম্বর এ অধ্যাদেশের গেজেট জারি করা হয়।

এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জনস আইন, ২০১৬’ অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন অর্ডারকে বাংলায় অনুবাদ করে গুছিয়ে নতুন আইন করা হয়েছে।

গতকালের মন্ত্রিসভা বৈঠকে কিউবার মহান বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়েছে।