বিশ্ববাজারে আস্থা ফিরে পাচ্ছে চিংড়ি

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ি আবারও আস্থা ফিরে পেতে শুরু করেছে। স্বাদে ও মানে ভালো এই বাগদা চিংড়ির দাম বেশি হওয়ায় বাজার থেকে ছিটকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

বাজার দখল করছিল তুলনামূলকভাবে কম দামের হাইব্রিড ‘ভেনামি’ চিংড়ি। কিন্তু আবারও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশি চিংড়ি। এ জন্য তারা দামও বেশি দিচ্ছে। ক্রিসমাসকে সামনে রেখে এ বছর রপ্তানিও ভালো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো খবর বাংলাদেশের চিংড়ির বড় ক্রেতা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চিংড়ির মান নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট। বছর পাঁচেক আগে আরোপিত গুণগত মানসংক্রান্ত নানা বিধিনিষেধ তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
নোনা পানিতে উৎপাদিত বাগদা চিংড়ি আন্তর্জাতিক বাজারে টাইগার শ্রিম্প নামে পরিচিত। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট এবং দক্ষিণ-পূর্বের কক্সবাজার জেলায় এর ব্যাপক চাষ হয়। বিদেশে এর চাহিদা কমে যাওয়ায় চাষের প্রবণতাও কমে গিয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক চিংড়ি বাজারে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। উৎপাদনকারী ও কারখানার মালিক তথা রপ্তানিকারকদের মধ্যে আবারও আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।

পরিবর্তিত এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) পরিচালক এস হুমায়ুন কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের টাইগার শ্রিম্পের দাম ছিল প্রতি পাউন্ড ১০ থেকে ১১ ডলার, যা কমে এসে দাঁড়িয়েছিল পাঁচ থেকে ছয় ডলারে। এই অবস্থার পরিবর্তন হয়ে আবারও তা আট থেকে ১০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এই দামেই ২৫ ডিসেম্বরকে সামনে রেখে অর্ডার এসেছে এবং রপ্তানিও হচ্ছে ভালো। ’

হুমায়ুন কবির আরো বলেন, ‘আমাদের চিংড়ির বড় বাজার ইইউভুক্ত দেশগুলো। রপ্তানি হওয়া মোট চিংড়ির ৮৫ শতাংশ চিংড়িই যায় ইইউ দেশগুলোয়। নাইট্রোফুরান বিতর্কে তারা চিংড়ির গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য অনেক শর্ত দেয়। এর মধ্যে একটি ছিল তাদের দেশে কনটেইনারে যাওয়া চিংড়ির অন্তত ২০ শতাংশ পরীক্ষা করা। পরীক্ষায় সন্তুষ্ট হলেই তারা আমদানিকারক দেশে তা প্রবেশ করার অনুমতি দিচ্ছিল। এই কড়াকড়ি তুলে নিয়েছে। এমনকি আমরাও যে পরীক্ষা করে চিংড়ি রপ্তানি করি, সেই পরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। বাধ্যতামূলকের সেই শর্তও প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ল্যাবে পরীক্ষা হবে, তবে পরীক্ষার রিপোর্ট তাদের কাছে না পাঠালেও চলবে। ’

উৎপাদক, আড়তদার ও ছোট ব্যবসায়ীরা জানায়, প্রক্রিয়াজাত কারখানার মালিকরা চিংড়ির মূল ক্রেতা। উৎপাদিত চিংড়ি একাধিক হাত বদল হয়ে রপ্তানিকারকদের হাতে পৌঁছায়। তবে রপ্তানিকারকরা এখনো স্বাভাবিক মাত্রায় চিংড়ি কিনছে না। ফলে উৎপাদিত চিংড়ির একটি অংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে। দেশের সাধারণ ক্রেতারা তা কিনে খাচ্ছে। ডুমুরিয়া সদরের আনোয়ারা মত্স্য আড়তের সাধারণ সম্পাদক গাজী মেহেদী হাসান বলেন, প্রতিদিন এই আড়তে কমপক্ষে দুই টন চিংড়ি কেনাবেচা হয়। সাধারণত চিংড়ি ডিপো মালিকরাই চিংড়ি কিনে থাকে।

জানা যায়, চিংড়ি উৎপাদনকারী অন্য দেশগুলো যেমন ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ায় ভেনামি নামের এক কৃত্রিম প্রজাতির চিংড়ি উৎপাদিত হচ্ছে। আমাদের টাইগার শ্রিম্প যেখানে একরপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি উৎপাদিত হয়, সেখানে ভেনামি চিংড়ি উৎপাদিত হয় দুই হাজার কেজি বা তারও বেশি। এ কারণে ভেনামি চিংড়ির উৎপাদন খরচ কম পড়ে, তারা তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করছিল। কিন্তু টাইগার শ্রিম্প উৎপাদনে খরচ বেশি পড়ায় কম দামে বিক্রি করার সুযোগ ছিল না, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছিল।

খুলনা জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. শামীম হায়দার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘রপ্তানি পণ্য হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে চিংড়ির দাম ওঠানামা করে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি চিংড়ির দাম কমে গিয়েছিল, এখন আবার বেড়েছে, যে কারণে আমাদের চিংড়ির বাজারেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ’ তাঁর মতে, ‘আমাদের চিংড়ি স্বাদে উন্নত বলে ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা আছে। সমস্যাটি হলো, ইউরোপে মন্দার কারণে সাধারণ ক্রেতাদের হাতে অর্থ কমে যাওয়ায় তারা কম দামের পণ্যের প্রতি ঝুঁকেছিল। এখন অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে, তারা আবারও আমাদের চিংড়ি খোঁজ করছে। ’

এদিকে রপ্তানির জন্য হিমায়িত মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ৭৮টি কারখানার মধ্যে ইতিমধ্যে ৫০টি বন্ধ হয়ে গেছে। চালু আছে মাত্র ২৮টি কারখানা। এর মধ্যে খুলনাঞ্চলের ৫৮টির মধ্যে ২৪টি এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২০টির মধ্যে মাত্র চারটি কারখানা চালু আছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০০১ সাল থেকে মাছ রপ্তানি বাড়তে থাকে। ধাক্কা খায় ২০০৮-০৯ অর্থবছরে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধিসহ বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা কিছুটা কাটিয়ে ওঠায় ২০১০-১১ অর্থবছরে ঘুরে দাঁড়ায় দেশের চিংড়ি শিল্প। এই সময়ে দেশের চিংড়িতে নানা অপদ্রব্য প্রবেশের কথা ওঠে। আলোচনায় আসে পুশ প্রথা। খুলনা মহানগরীর পশ্চিম রূপসার নতুন বাজার এবং পূর্ব রূপসা এলাকার কিছু চিংড়ি ব্যবসায়ী পানি ও জেলি পুশ করে চিংড়ির ওজন বাড়িয়ে তা কম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করায় বিশ্ববাজারে চিংড়ির মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর সঙ্গে যোগ হয় ভেনামি চিংড়ির দাপট।

বিএফএফইএর পরিচালক এস হুমায়ুন কবির বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী মাত্র ১৫-২০ বছরের মধ্যে চিংড়ি শিল্প লাভজনক খাত হিসেবে পরিচিতি পায়। এ কারণে ওই সময়ে অনেক প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে ওঠে। এর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৮টিতে। কিন্তু ধীরে ধীরে অবস্থা পাল্টে যেতে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও চিংড়ি তার হারানো জায়গা ফিরে পেতে শুরু করেছে। ফলে চিংড়ি কারখানাগুলোও চাঙ্গা হবে; বন্ধ হওয়া অনেক কারখানা আবারও চালু হতে পারবে।