বিনিয়োগকারী বাড়াতে হবে পুঁজিবাজারে

চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে যোগ দেন ইফতিখার-উজ-জামান। ১৯৮৩ সালে আইসিবিতে সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

পরবর্তী সময়ে জনতা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদেও কাজ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ওই কর্মকর্তা। আইসিবির এমডির দায়িত্ব নেওয়ার আগে কাজ করেন প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে। পুঁজিবাজার উন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগ ও আইসিবির বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে কথা বলেন কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদক শেখ শাফায়াত হোসেন ও রফিকুল ইসলাম

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ১৯৭৬ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় আইসিবি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি শিল্পায়নে ঋণ দিয়ে পুঁজিবাজারে শেয়ারের জোগান ও চাহিদা সৃষ্টিতে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে এনেছে। আইসিবির ঋণ নিয়ে নিজেদের উন্নতির মাধ্যমে বাজারে শেয়ারের জোগান দিয়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনার মাধ্যমে কম্পানির অংশীদার হয়েছে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে ১৯৯৬ ও ২০১০-এ বড় ধসকে বিদায় জানিয়ে বাজারকে স্থিতিশীল ও বড় ধরনের উত্থান-পতন ঠেকানোই আইসিবির বর্তমান চ্যালেঞ্জ। আইসিবির সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বর্তমান স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের লেনদেনকে এক হাজার কোটিতে উন্নীত করবেন—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতিখার-উজ-জামান।

আইসিবির বর্তমান কার্যক্রম প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের এমডি বলেন, আইসিবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই ছিল পুঁজিবাজারের উন্নয়ন। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাজারে জোগান ও চাহিদা—দুই দিককেই ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হয়েছে আইসিবি। অন্যদিকে শেয়ারের চাহিদা বাড়াতে আইসিবি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়সংক্রান্ত যাবতীয় সেবা দিচ্ছে। বর্তমানে আইসিবি ৩০ লাখ বিনিয়োগকারীকে সেবা প্রদান করছে। প্রথম দিকে শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে পুঁজিবাজারে শেয়ারের জোগান বাড়াতে কম্পানিকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এতে বাজারে সিকিউরিটিজের সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে ইস্যু ম্যানেজমেন্ট, আন্ডাররাইটিং ও বিনিয়োগকারী হিসেবে সব কিছুতেই সাহায্য করেছে। আইসিবির সহায়তাপুষ্ট শতাধিক কম্পানি বাজারে রয়েছে। এখনো আন্ডাররাইটিংয়ের কাজ করা হয়, কিন্তু খুব কম।

পুঁজিবাজারে নেতৃত্বদানকারী বড় বড় কম্পানি আইসিবির ঋণ সহায়তায় উন্নতি করেছে। একসময় বাজারের ৬০-৭০ শতাংশ কম্পানিই ছিল আইসিবির সহায়তাপুষ্ট। এপেক্স, বেক্সিমকো গ্রুপের উন্নয়নেও আইসিবির প্রাথমিক ভূমিকা ছিল। এতে বাজারে জোগানের দিক নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্প উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরও পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির এমডি আরো বলেন, অটোমেশনের প্রক্রিয়ার আগে কাগুজে শেয়ারে লেনদেন অনেক কষ্টসাধ্য ছিল। আইসিবিই সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রথম অটোমেশনে পা দিয়েছে। এখন ইলেকট্রনিকস মাধ্যমে অর্ডার দিলেই সিডিবিএল আছে শেয়ার লেনদেন হয়ে যায়। এভাবে আইসিবি পুঁজিবাজার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

নব্বইয়ের দশকের পর থেকে পুঁজিবাজারের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইসিবির সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে আসে। বর্তমানে ৪০০ কিংবা ৫০০ কোটির দৈনিক লেনদেনে আইসিবির লেনদেন মাত্র ২০ থেকে ৩০ কোটি। কিন্তু একসময় ৮০-৯০ শতাংশ শেয়ার লেনদেন হতো আইসিবির মাধ্যমে। তবে বাজারের উন্নয়নের প্রথম দিকের কাজটা করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানান ইফতিখার-উজ-জামান। তিনি বলেন, পুঁজিবাজার উন্নয়নে ও স্থিতিশীল রাখতে আইসিবি এখনো কাজ করে যাচ্ছে। কোনো কম্পানির শেয়ারের দাম বেশি বেড়ে গেলে সেটি বিক্রি করে আবার কোনো ভালো কম্পানির শেয়ার দাম একেবারেই কমে গেলে সেটি কিনে বাজারকে সাপোর্ট দেওয়া হয়। বর্তমানে আইসিবির ৯০ শতাংশ বিনিয়োগই পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক। বাকি ১০ শতাংশের কিছু অংশ ব্যাংক ও শিল্পায়নে অর্থায়ন করা হয়।

পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন আইসিবির এমডি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের পরিমাণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। আইসিবি পুঁজিবাজারে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে গত এক বছরেই দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের দুঃসময়েও পাশে থেকেছে আইসিবি। ২০১০ সালে পতনের পর যেসব গ্রাহক শেয়ার বিক্রি করতে পারেনি, শেয়ার পোর্টফোলিওতে রয়ে গেছে, এতে দিনের পর দিন অর্জিত সুদ মওকুফ করা হয়েছে বলে জানান ইফতিখার-উজ-জামান। তিনি বলেন, ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি জুন পর্যন্ত সুদ মওকুফ হয়ে গেছে। এই সুদ মওকুফের ফলে ৬০-৭০ শতাংশ বিনিয়োগকারী মুক্ত হবে। নতুন করে বাজারে আসবে। সুদ মওকুফ করায় আইসিবির হয়তো কিছু ক্ষতি হবে, তবে সেটি অন্যভাবে পুষিয়ে নেওয়া যাবে। বিনিয়োগকারী বাজারে সক্রিয় হলে চাঞ্চল্য ফিরে আসবে। ট্রানজেকশনে ব্রোকারেজ হাউসে আয় বাড়বে। মার্কেট ভালো হলে পোর্টফোলিও শেয়ারের দামও বাড়বে। সব কিছু মিলিয়ে আইসিবির ক্ষতি পুষিয়ে মুনাফা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সহজ শর্তে ঋণদানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৯০০ কোটি টাকার স্কিম সম্পর্কে ইফতিখার-উজ-জামান বলেন, ‘স্কিমটা খুব জনপ্রিয় হয়েছে এটা বলব না। এখনো আমাদের কিছু টাকা বণ্টন বাকি রয়েছে। প্রায় ৬০০ কোটি কিংবা ৭০০ কোটি টাকা বণ্টিত হয়েছে। এখনো ২০০ কোটি টাকা বণ্টন করতে পারিনি। এখানে যে শর্ত আছে অনেকেই সেই শর্তাবলিতে নিতে পারছে না। ’

সমমূলধন তহবিলের (ইক্যুইটি অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ ফান্ড-ইইএফ) কার্যক্রম নিয়ে আইসিবির এমডি বলেন, ‘এটি খুবই ভালো একটি উদ্যোগ। সরকার অর্থায়ন করছে। মূল এজেন্ট বাংলাদেশ ব্যাংক। তাদেরই পরিচালনা করার কথা। কিন্তু ক্রেডিট লেন্ডিং ব্যাংকের কাজ না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবএজেন্ট হিসেবে আইসিবিকে লেন্ডিংসহ কিছু কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিছু কাজ আমরা করেছি। এটির সফলতা প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে কিছু প্রকল্পে সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও টাকা দিচ্ছে না। যেহেতু আমরা ইক্যুইটি ফিন্যান্স করেছি ঋণ দেয়নি, মালিকানা নিয়েছি। যার কারণে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। আইনি ব্যবস্থা নিতে পারছি না। আইনি ব্যবস্থা নিতে নীতিমালায় সামান্য পরিবর্তন হবে। তখন ব্যবস্থা নিতে পারব। আপাতত এ প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘এটি আবার যেন চালু করা হয় তার আবেদন জানাচ্ছি আমি। এতে একদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সুফল আসছে, বেকারত্ব হ্রাস পাচ্ছে ও গ্রামীণ অবকাঠামোতে উন্নয়নে প্রভাব পড়ছে। সেখানে উৎপাদন বাড়ছে। যেখানে কোনো দিন দুধ পাওয়া যেত না, সেখানে এখন দুধ পাওয়া যাচ্ছে। গরু মোটাতাজা করার সুযোগ পাচ্ছে। ডেইরি ফার্ম থেকে এঁড়ে বাছুরকে কোরবানির উপযোগী করা হচ্ছে। বকনা বাছুরকে গাভিতে পরিণত করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে চাহিদার ৫০ শতাংশ দুধ উৎপাদিত হয় না। সেই দুধের চাহিদা আগামী পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে পূরণ করা হবে। ’

তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ইইএফ ফান্ডের অর্থায়নে তেমন সাড়া পাচ্ছে না আইসিবি। এর কারণ সম্পর্কে এমডি বলেন, ‘ইক্যুয়িটি শেয়ারের নীতিমালায় যেসব শর্ত দেওয়া আছে সেগুলো পূরণ করে খুব কম প্রতিষ্ঠান আসতে পারছে। অর্থাৎ যেমনটা আশা করেছিলাম, সেভাবে পাচ্ছি না। ’

আইসিবির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে ইফতিখার-উজ-জামান বলেন, ‘আমি মূল লক্ষ্য থেকে সরতে চাই না। পুঁজিবাজার উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আইসিবির মূল দায়িত্ব। আমার প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে, ডিসেম্বরের মধ্যে এক হাজার কোটি বা তার বেশি লেনদেনে উন্নীত করা। সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে। সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলে এটি করা হচ্ছে। তিন লাখ কোটির মার্কেটে বর্তমান লেনদেন খুবই কম হচ্ছে। আমরা চাই কমপক্ষে ডিসেম্বরের মধ্যে এক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হোক। সূচক বাড়ল না কমল, সেটি বিষয় নয়। আমার কাছে মাথাব্যথা ৩০০ কোটি কিংবা ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এক হাজার কোটি লেনদেনে যেতে পারলে অনেক ব্রোকারেজ হাউসে ব্যবসা বাড়বে। ব্যক্তি বিনিয়োগ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছি। ’

আইসিবির এমডি বলেন, ‘আমরা চাই সহযোগী সংগঠনগুলো নতুন নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে নিয়ে আসুক। মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো এ কাজটি করতে পারে। এদের কাছেই নতুন বিনিয়োগকারী আসে। কিছু বিনিয়োগকারীর সুদ মওকুফ করে মুক্ত করে দিচ্ছি, তবে সবাইকে পারছি না। কাজেই নতুন বিনিয়োগকারী বাড়াতে হবে। সেই লক্ষ্যেই সহযোগী সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে আইসিবি। ’

Views: 22