কালো সোনা ‘কয়লা’

বাংলাদেশের প্রধান খনিজ সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাস, যা বিদ্যুত ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দ্বিতীয় প্রধান খনিজ সম্পদ কয়লা, যা এখন পর্যন্ত অব্যবহৃত। কিন্তু জ্বালানি তেল ও গ্যাস মহার্ঘ্য হয়ে ওঠায় কয়লাই এখন রীতিমতো কালো সোনা। কয়লা একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। কয়লার সঠিক ব্যবহার দেশের সমৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন- বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু কয়লার ব্যবহার ১৯০ কেজির মতো। মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে এটা ৫০০ কেজি হতে হবে। তবে ২০২১ সালের আগেই আমরা মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হব। সাম্প্রতিক সময়ে সে কালো সোনা দেশব্যাপী আলোচনায় উঠে এসেছে। কার্বন মৌলের অবিশুদ্ধ রূপ কয়লা। ক্রান্তীয় অঞ্চলের জলমগ্ন পরিবেশে উদ্ভিদরাজির সুদীর্ঘকাল ধরে চাপা পড়ে থাকার ফলে উৎপন্ন কালো অথবা গাঢ় বাদামী বর্ণের খনিজ পদার্থই কয়লা। এর প্রধান ব্যবহার জ্বালানি হিসেবে। রাসায়নিক শিল্পেও এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে এ যাবতকাল পর্যন্ত সাতটি প্রধান অন্তর্ভূপৃষ্ঠীয় কয়লাক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৮৫৬ সালে পারিপার্শ্বিক ভূতাত্ত্বিক গঠন বিবেচনা করে অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ মেলেট বাংলাদেশের শ্যামল মাটির নিচে কয়লার অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পোষণ করেন। প্রায় ১০০ বছর তার এ ধ্যান-ধারণা কল্পনার বিষয়বস্তু ছিল। ১৯৫৯ সালে বর্তমান বগুড়া জেলার কুচমায় তেল না পেয়ে কূপ পরিত্যক্ত করার পর খননকাজ চালাতে গিয়ে ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৩৮১ মিটার গভীরতায় গন্ডোয়ানা কয়লার সন্ধান লাভ করে। এখানে মোট ৫টি কয়লার স্তর রয়েছে যার একীভূত পুরুত্ব ৫১.৮২ মিটার, যা ভূপৃষ্ঠের ২৮৭৬ মিটার গভীরতা পর্যন্ত অবস্থিত। এ আবিষ্কার বাংলাদেশের পলিমাটি আবৃত ভূগর্ভে ‘কালো সোনা’ কয়লার অবস্থান সম্পর্কে এক নয়া দিগন্তের উন্মোচন করে।

১৯৬১ সালে পাকিস্তান ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর জাতিসংঘের সহযোগিতায় বৃহত্তর বগুড়া ও রাজশাহী জেলার জামালগঞ্জ পাহাড়পুরে ১০৫০ মিলিয়ন টনসমৃদ্ধ কয়লা খনি আবিষ্কার করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর (জিএসবি) ১৯৮৫ সালে দিনাজপুর জেলার বড়পুকুরিয়াতে, ১৯৮৯ সালে রংপুর জেলার খালাশপীর নামক স্থানে এবং ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরের দীঘিপাড়াতে পার্মিয়ান যুগের গন্ডোয়ানা কয়লাক্ষেত্র আবিষ্কার করে। অস্ট্রেলিয়ার ব্রোকেন হিল প্রোপাইটর ১৯৯৭ সালে দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়িতে ভূপৃষ্ঠের ১৫০ মিটার গভীরে গন্ডোয়ানা কয়লা আবিষ্কার করে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত পার্মিয়ান গন্ডোয়ানা কয়লাক্ষেত্রসমূহ ছাড়াও জিএসপি ১৯৬০-৬২ সালে বাংলাদেশ মেঘালয় সীমান্ত বরাবর সুনামগঞ্জ জেলার টাকেরঘাট বাগলিবাজর এলাকায় ভূপৃষ্ঠের নিচে ৪৫ মিটার থেকে ৯৭ মিটার গভীরতায় টারশিয়ারি কয়লাক্ষেত্রের দুটি স্তর আবিষ্কার করে। দেশে এখন পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুসারে কয়লার মজুদের পরিমাণ ৩ হাজার ৭২০ মিলিয়ন মেট্রিক টন।

আবিষ্কৃত ৭টি কয়লাখনির মধ্যে অন্যতম বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি উন্নয়নের কাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। এর উন্নয়নে ১৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ খনিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় এবং খনিটি থেকে দৈনিক প্রায় ১৫০০ টন কয়লা উত্তোলিত হচ্ছে। সরকার একটি ব্যবস্থাপনা চুক্তির মাধ্যমে চীনে সিএমসি সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে কয়লা উৎপাদন করছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রচলিত খনি ও খনিজসম্পদ বিধিমালায় রয়্যালিটির পরিমাণ বৃদ্ধি করা না হলে ভূগর্ভস্থ মূল্যবান কয়লা লুটে নেয়ার সুযোগ পাবে বিদেশী প্রতিষ্ঠান। এতে কয়লাক্ষেত্র খননের পরও রাষ্ট্র এ থেকে ন্যায্য সুফল থেকে বঞ্চিত হবে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়বে নামমাত্র অর্থ। প্রচলিত খনি ও খনিজ সম্পদ বিধির সংস্কার না হলে উন্মুক্ত পদ্ধতির হিসাবে দিনাজপুরের ফুলবাড়ি কয়লাক্ষেত্রে মজুদ ৫০ কোটি টন কয়লার মধ্যে মাত্র ৩ কোটি টন কয়লা রয়্যালটি হিসেবে পাবে সরকার। একইভাবে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে ৩৯ কোটি টন কয়লার মধ্যে মাত্র ২ কোটি ৩৪ লাখ টন রয়্যালিটি পাবে।

দীঘিপাড়া কয়লা খনি

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির পর এবার নবাবগঞ্জের দীঘিপাড়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। হিসাব অনুযায়ী, সম্ভাবনাময় দীঘিপাড়া কয়লা খনিতে প্রায় ৮৬৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা মজুদ আছে। যা উত্তোলন করা গেলে ১ হাজার ৫শ’ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব হবে। জানা গেছে, ভূগর্ভস্থ (আন্ডারগ্রাউন্ড) পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলে খনির পুরো কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হয় না। তবে দীঘিপাড়া কয়লা খনিতে যে পরিমাণ কয়লা মজুদ রয়েছে তার অর্ধেক পরিমাণ কয়লা উত্তোলন করা গেলে তা দিয়ে দেশের জ্বালানি চাহিদা পুরণে বড় ভূমিকা রাখা যাবে।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত ৫টি কয়লা খনিতে মোট ৩ হাজার ৫৬৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা মজুদ রয়েছে। যার মধ্যে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় ৩৯০ মিলিয়ন মেট্রিক টন ও ফুলবাড়ীয়া ৫৭২ মিলিয়ন মেট্রিক টন, নবাবগঞ্জের দীঘিপাড়ায় ৮৬৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন, রংপুরের খালাসপীরে ৬৮৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে ১ হাজার ৫৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা মজুদ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২০০৫ সালে দিনাজপুরের বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন শুরু হয়। বাকি ৪টি খনির মধ্যে জামালগঞ্জ কয়লা খনি থেকে গ্যাস ও দীঘিপাড়া খনি থেকে কয়লা উত্তেলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আশার খবর- ভূতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে ড্রিলিং করে নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার তাজপুরে চুনাপাথরের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার পরিমাণ প্রায় দুই হাজার মিলিয়ন মেট্রিকটনের বেশি।

সেখানে কয়লা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যদি কয়লার খনিও পাওয়া যায়, তাহলে এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে। এলাকায় ভারি শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। লোকজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হবে।