আমে বিপ্লব আনতে পারে কাল্টার

বাংলাদেশেও আম চাষে বিপ্লব আনতে পারে কাল্টারের ব্যবহার। ভারতের মালদহের আম বাগান মালিকরা কাল্টার ব্যবহার করে প্রতিবছরই আমের বিপুল ফলন পাচ্ছে। প্রতিবছর গাছ ভরে আম আসায় লাভবান হচ্ছে তারা। এটি ব্যবহারে গাছের সব আম একসঙ্গে পরিপক্ব হয় বিধায় বাগান মালিকরা একই সময়ে পুরো বাগানের আম পাড়ছে। বাংলাদেশে কাল্টার বাজারজাতকরণে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চেয়েছে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি কম্পানি। সরকারের তরফ থেকে দুই বছর ধরে এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, পরীক্ষায় পাওয়া ফলাফল পর্যালোচনা শেষে সরকারের তরফ থেকে কাল্টার ব্যবহারে অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বে সবচেয়ে বড় আম রপ্তানিকারক দেশ থাইল্যান্ডের ৪০ শতাংশ গাছে কাল্টার ব্যবহূত হচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, আর্জেন্টিনা, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, চিলি, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, বুলগেরিয়া, ইতালি, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন বিভিন্ন রকম ফল চাষে ১৫ বছর ধরে কাল্টার ব্যবহার করছে। ভারত সরকারের অনুমোদনের পর দেশটির আমচাষিরাও কাল্টার ব্যবহার করে সুফল পাচ্ছে।

কাল্টার হলো এক ধরনের রাসায়নিক, যা গাছ থেকে আম পাড়ার পর এবং আম গাছে মুকুল আসার দেড়-দুই মাস আগে ব্যবহার করা হয়। একটি আম গাছের ছায়া যত দূর পর্যন্ত ছড়ায়, গোড়া থেকে তত দূর দিয়ে গাছের চারপাশে ছয়-সাত ইঞ্চি গভীর করে চক্রাকার একটি গর্ত করতে হয়। এরপর প্রতি ডায়ামিটারে চার মিলিলিটার কাল্টার পানির সঙ্গে মিশিয়ে ঢেলে দিতে হয়, যাতে কাল্টার মিশ্রিত পানি পুরো গর্তের বৃত্তটি ভিজিয়ে দেয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহের চাষিরা ২০০৫ সাল থেকে কাল্টার ব্যবহার করছে।

সেখানকার আমচাষিরা কালের কণ্ঠকে জানায়, সাধারণত এক বছর গাছে বেশি আম আসে, পরের বছর খুবই কম আম আসে। এটিই আম গাছের স্বাভাবিক নিয়ম। কাল্টার ব্যবহার করলে প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ আম আসছে। তবে কাল্টার ব্যবহার করলে আম গাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ জৈব ও রাসায়নিক সার দিতে হয়। কাল্টার ব্যবহারের পাশাপাশি দক্ষ সার ব্যবস্থাপনা মেনে চললে যুগের পর যুগ ধরে প্রতিটি গাছে বিপুল পরিমাণ আম পাওয়া যাবে। তবে কেউ কাল্টার ব্যবহারের পর পরিমাণ মতো জৈব ও রাসায়নিক সার না দিলে তিন-চার বছর পর পাতা ছোট হয়ে গাছ মারা যাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আম চাষে থাইল্যান্ড, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে কাল্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ওই সব দেশে আমের উৎপাদন অনেক বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে এখনো এ জাতীয় রাসায়নিক ব্যবহারের অনুমোদন সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের কৃষিসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকটি কম্পানি এটি বাজারজাত করতে অনুমোদন চেয়েছে। আমরা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি। পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনা শেষে সরকার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।’

অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ভারতের মালদহ থেকে অবৈধভাবে কাল্টার বা সমজাতীয় রাসায়নিক বাংলাদেশে ঢুকছে, যা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর আমচাষিরা ব্যবহার করছে। তাতে আমের উৎপাদন বাড়ছে। তবে সঠিকভাবে এর ব্যবহার না করায় কোনো কোনো বাগানে গাছ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সরকার বৈধভাবে কাল্টার ব্যবহারের অনুমোদন দিলে অবৈধভাবে পাচার হয়ে আসা বন্ধ হবে বলে আশা করেন তিনি।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একজন কৃষি কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, আমচাষিরা কাল্টার ব্যবহার করে প্রতিবছরই আমের ভালো ফলন পাচ্ছে। একই বোঁটায় অনেক আম আসায় আমের আকার একটু ছোট হয়। তবে পরিমাণের দিক দিয়ে অনেক বেশি আম হচ্ছে। পরামর্শ দিয়ে তিনি আরো বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক গাছেই কেবল কাল্টার ব্যবহার করা উচিত। চারা গাছে কাল্টার দিলে প্রচুর আম আসবে। কিন্তু ছয় থেকে সাত বছরের কম বয়সী গাছে কাল্টার ব্যবহার করলে কয়েক বছর আম দেওয়ার পর গাছটির মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক গাছে কাল্টারের সঙ্গে পরিমাণমতো জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে গাছের কোনো সমস্যা হয় না। প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ আম পাওয়া যায়। মালদহের মধুঘাটে তিন একর জমিতে আমের বাগান রয়েছে দেবাশীষ রায়ের। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০০৬ সাল থেকে বাগানে কাল্টার দিচ্ছেন তিনি। কাল্টার দিলে প্রতিবছরই গাছে অনেক বেশি মুকুল আসে, গুটি ধরে। কাল্টার ব্যবহার করায় গাছপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ মণ আম পাচ্ছেন তিনি। ফলে আমের দাম কম হলেও লাভবান হচ্ছেন তিনি। তাঁর বাগানে ৪০টি গাছ রয়েছে, তাতে সোয়া লিটার কাল্টার ব্যবহার করেন তিনি। এবার সব খরচ বাদে তাঁর দেড় লাখ রুপি লাভ হয়েছে।

কাল্টারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে চাইলে দেবাশীষ আরো বলেন, কাল্টার দিলে গাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ জৈব ও রাসায়নিক সার দিতে হয়। যেসব বাগানের মালিক নিজেরা আম চাষ করে, তারা গাছে কাল্টারের সঙ্গে জৈব ও রাসায়নিক সারও দেয়। ফলে তাদের গাছের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে যেসব মালিক তার বাগান অন্যদের লিজ দেয় দুই-তিন বছরের জন্য, লিজগ্রহীতারা গাছের ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে অন্য কোনো সার ব্যবহার বাদ দিয়ে শুধু কাল্টার ব্যবহার করে। ফলে প্রথম তিন-চার বছর প্রচুর আম আসায় লিজগ্রহীতারা লাভবান হয়। কিন্তু পরে গাছের পাতা ছোট হয়ে যায়, গাছ ঝিমিয়ে পড়ে। আমও কম আসে। দেবাশীষের পরামর্শ, যে গাছের যত্ন করতে পারবে, শুধু সে-ই যেন কাল্টার দেয়।

কাল্টার ব্যবহারকারীদের জন্য সতর্কবাতা দিয়ে এক কর্মকর্তা জানান, যত দিন কাল্টার ব্যবহার করা হবে, তত দিন ভালো ফলন পাওয়া যাবে। তবে হঠাৎ করে কোনো বছর কাল্টার ব্যবহার বন্ধ করে দিলে তখন কয়েক বছর আর মুকুল বা আম ধরবে না। কাল্টার দেওয়ার পর তার ব্যবহার বন্ধ করলে গাছটিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে দুই-তিন বছর লেগে যাবে।