জীববৈচিত্র্য, অপরূপ দৃশ্য- জাবি লেকে লাল শাপলা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ সৌন্দর্য, চমৎকার সব জীববৈচিত্র্য আর অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য সব সময়ই প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। জীববৈচিত্র্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অধিকারী এ ক্যাম্পাসটি বাংলাদেশের প্রায় সমগ্র উদ্ভিদকূল আর প্রাণিকূলের পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্বকারী স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাবির লেকে ফুটে থাকা রক্তবর্ণের শাপলা ফুল আর শীতের অতিথি পাখি, বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ গাছগাছালির সমারোহ, প্রজাপতির মেলা, লাল ইটের অবকাঠামো ও বর্ণিল ফুলের সমারোহ। আর তাইতো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা সুযোগ পেলেই জাবিতে ঘুরতে আসেন এসব সৌন্দর্য উপভোগ করে মনের খোরাক জোগাতে। এর মধ্যে দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে জাবির শীতের অতিথি পাখি।

শীত আর অতিথি পাখি এই শব্দ দুটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিবছর উত্তরের শীত প্রধান দেশ সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, সিনচিয়াং ও ভারত থেকে হাজার হাজার অতিথি পাখি বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশের যে কয়েকটি স্থানে অতিথি পাখি অবস্থান নেয় তার মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। বাংলাদেশে আসা পাখির এক-চতুর্থাংশ অবস্থান নেয় জাহাঙ্গীরনগরে। অতিথি পাখিরা নবেম্বর মাসের শুরুর দিকে ক্যাম্পাসে আসতে শুরু করে, এরা সাধারণত নবেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ক্যাম্পাসের লেকগুলোমুখর করে রাখে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এসব পরিব্রাজক পাখিদের মধ্যে রয়েছে ফ্লাইপেচার, গার্গেনি, সরালি, পচার্ড, ছোট জিড়িয়া, লালমুড়ি, বামুনিয়া হাঁস, মুরহেন, খঞ্জনা, পিনটেইল, নাকতা, জলপিপি, চিতাটুপি, পাতারি, ছোট নগ, লাল গুরগুটি, কোম্বডাক, বেলেহাঁস ও পানকৌরিসহ ভিনদেশী বক।

শীত আসতে না আসতেই প্রতিবছরের মতো এবারও শীতের শুরুতে অতিথি পাখির আগমন ঘটেছে জাহাঙ্গীরনগরে। শীতের বার্তা নিয়ে আসা অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠতে শুরু করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ নৈসর্গিক-ক্যাম্পাসে কুয়াশায় ঘেরা জগতের মাঝে শিক্ষার্থীদের পদচারণার সঙ্গে তাল রেখে মুখর হয়ে ওঠে অতিথি পাখিরাও। সগৌরবে জানান দেয়, অতিথি হলেও চিরচেনা এই সবুজের বুকে আমরা বুনো ছন্দ জাগাতে ফিরে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয় লেক আর জঙ্গলগুলোতে চলে তাদের অহর্নিশি খুনসুটি। ক্যাম্পাসবাসীর ঘুম ভাঙানির দায়িত্ব এখন যেন তাদের কাঁধে বর্তেছে। এ দৃশ্য দেখতে হাজার হাজার দর্শনার্থী ভিড় জমাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগরে।

অতিথি পাখির আগমনে শীতের এই সময়টায় দেশী-বিদেশী অসংখ্য পাখিপ্রেমী পর্যটক ভিড় জমায় ক্যাম্পাসে। বাংলাদেশের মধ্যে জাবি ক্যাম্পাসে তুলনামূলক বেশি শীত হলেও তা উপেক্ষা করেই দেশের দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিনই অতিথি পাখি দেখতে দর্শনার্থী ও পর্যটক আসছে। এ বছরও অতিথি পাখির উচ্ছ্বাস দেখতে ক্যাম্পাসে পর্যটকদের ভিড় বেড়ে গেছে। বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনাও চোখে পড়ার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোতে রীতিমত হাসছে ফুটফুটে লাল শাপলা। আর সেই শাপলাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে অতিথি পাখিরা। পাখিদের সারাদিন অবিরাম ক্যাম্পাসজুড়ে উড়ে বেড়ানো আর লেকের পানিতে খুনসুটি খুবই উপভোগ্য হয়ে উঠেছে পর্যটকদের কাছে। অবিরত ডুবসাঁতার পাখিপ্রেমীদের আরও পুলকিত করে বার বার। অতিথি পাখির মোহে পড়ে তাদের খুনসুটি আর ডুবসাঁতার দেখতে দেখতে কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে তা পাখিপ্রেমিকরা বুঝতেই পারে না। পাখি দেখার পাশাপাশি পাখিদের ক্যামেরাবন্দী করতে ভোলেন না পর্যটকেরা। তবে ছুটির দিনগুলোতে বিশেষ করে শুক্রবার দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা যায়। লেকে ফুটে থাকা লাল শাপলা আর পাখির সৌন্দর্য তাদের মন ভরিয়ে দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭টি লেক থাকলেও পাখিরা সাধারণত রেজিস্ট্রার ভবনের সামনের লেক, পরিবহন চত্বরের পাশের লেক এবং ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের লেকে অবস্থান নেয়। এ বছর শীতের শুরুতেই বিশ্ব^বিদ্যালয় প্রশাসনের নজরদারিতে লেকগুলো পরিষ্কার করার ফলে কচুরিপানার বদলে শাপলায় ভরে উঠেছে। পাখির আনাগোনাও বেড়েছে।