সশস্ত্র বাহিনী দিবসে প্রত্যাশা

অন্যান্য বছরের মতো এবারও জাঁকজমকপূর্ণ ও সাড়ম্বরে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে ৪৫তম সশস্ত্র বাহিনী দিবস। সশস্ত্র বাহিনী প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রতীক। আমরা উন্নয়নশীল ছোট দেশ। কিন্তু আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর কর্মদক্ষতা ও পেশাদারি আজ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে প্রশংসিত। এটা বিশাল অর্জন। কোনো আগ্রাসী ভূমিকায় জয়লাভের জন্য নয়, বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অসামান্য পেশাদারির জন্য বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আজ বিশ্ব অঙ্গনে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। এই মর্যাদা ও সম্মান বাংলাদেশের—এ মর্যাদা এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের। শুধু বিদেশে নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বিধানে সেনাবাহিনীর ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষও সমানভাবে গর্বিত। তবে আজকে সেনাবাহিনী যেখানে এসেছে, তা অব্যাহত রেখে উত্তরোত্তর আরো মর্যাদা বৃদ্ধি ও জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণে শিকড়ের সন্ধান এবং তার সঙ্গে অব্যাহত বন্ধন ও সংযোগ রক্ষা করা আবশ্যক। তা করা হলেই সশস্ত্র বাহিনী দিবসের তাত্পর্য ও গুরুত্বের যথার্থ মূল্যায়ন হবে।

আজকে যাঁরা সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন এবং লক্ষাধিক সদস্য আছেন, তাঁরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্মের সন্তান। তাঁদের জন্য শিকড়ের সন্ধান করতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের কথা জানতে, শুনতে ও বুঝতে হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর থেকে অনেকটাই ভিন্ন। আমাদের সেনাবাহিনীর জন্ম হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে, মুক্তিযুদ্ধের সময়, যে যুদ্ধটি ছিল জনযুদ্ধ। সে যুদ্ধের মহানায়ক ও সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সশস্ত্র বাহিনীর আজকের প্রজন্মকে জানতে হবে, সে যুদ্ধে কৃষক-শ্রমিকের সন্তান, কুলি-মজুরসহ সাধারণ মানুষ সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। জনযুদ্ধের ভেতরে জন্ম বলেই এ দেশের সাধারণ মানুষের আবেগ, অনুভূতি, চেতনা—সব কিছুর সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটা আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের অন্য রকম প্রত্যাশা রয়েছে। এই প্রত্যাশার কথা জাতির জনক তাঁর নিজের মুখে বলে গেছেন। শত প্রতিকূলতা, অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ—এর পরও বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের আকাঙ্ক্ষা, সেনাবাহিনীর মর্যাদার প্রতীক বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম ব্যাচের অফিসারদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে বঙ্গবন্ধু স্বয়ং হাজির হয়ে তাঁর মনের কথা ক্যাডেটদের কাছে জাতির পিতার অবস্থান থেকে ব্যক্ত করেন। ক্যাডেটদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধুর সেই অমূল্য ভাষণের কয়েকটি উদ্ধৃতি এখানে তুলে ধরছি। বঙ্গবন্ধু ভাষণের একেবারে শুরুতে আবেগের সঙ্গে বলেন, ‘আজ সত্যিই গর্বে আমার বুক ভরে যায়। বাংলাদেশের মালিক আজ বাংলাদেশের জনসাধারণ। সে জন্যই সম্ভব হয়েছে আজ আমার নিজের মাটিতে একাডেমি করা। আমি আশা করি, ইনশা আল্লাহ এমন দিন আসবে, এই একাডেমির নাম শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়, সমস্ত দুনিয়াতে সম্মান অর্জন করবে।’ এ কথার মাধ্যমে বোঝা যায়, সেনাবাহিনী নিয়ে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ পরিকল্পনা ছিল এবং ভবিষ্যতে তিনি একটা মর্যাদাপূর্ণ সেনাবাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু একটু আবেগের সঙ্গে গর্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘পাকিস্তানিরা মনে করত বাঙালিরা কাপুরুষ, বাঙালিরা যুদ্ধ করতে জানে না। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশের মাটিতে দেখে গেছে কেমন করে বাঙালিরা যুদ্ধ করতে পারে।’ ভাষণের শেষাংশে বঙ্গবন্ধু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন, যা আজ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্যাডেটদের উদ্দেশে বলেন, ‘মনে রেখো, তোমাদের মধ্যে যেন পাকিস্তানের মেন্টালিটি না আসে। তোমরা পাকিস্তানের সৈনিক নও, তোমরা বাংলাদেশের সৈনিক।’ আরেক জায়গায় বলেন এভাবে—‘মনে রেখো, জনগণ কারা। তোমার বাপ, তোমার ভাই। তোমরা তাদের মালিক নও, তোমরা তাদের সেবক। তাদের অর্থে তোমাদের সংসার চলবে, তাদের শ্রদ্ধা করতে শেখো, তাদের ভালোবাসতে শেখো।’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে এত উদ্ধৃতি দিলাম এই কারণে যে এগুলো সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক। তিনি জানতেন, একটা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শুধু সশস্ত্র বাহিনী নয়, বৃহত্তর জনগণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে একাত্মতা অপরিহার্য। সে জন্যই বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আমার সেনাবাহিনী হবে জনগণের সেনাবাহিনী। দুয়ের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকবে না।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনীর একাংশের জড়িত থাকা এবং পর পর দুজন সেনাপ্রধান দীর্ঘ ১৫ বছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেনা শাসন চালিয়ে জনগণ থেকে সেনাবাহিনীকে অনেক দূরে সরিয়ে নেন, দুয়ের মধ্যে বিশাল দূরত্ব সৃষ্টি করেন, যা দেশ ও জাতির জন্য মহাক্ষতির কারণ হয়েছে। সে ক্ষয়ক্ষতির পরিণতি থেকে দেশ এখনো মুক্ত হতে পারেনি। তবে ২০১৬ সালে এসে পেছনের অনেক পঙ্কিলতাকে মুছে ফেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আবার জনপ্রত্যাশার সমান্তরালে এসে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। অনেক চরাই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এখন পেশাগত উত্কর্ষে বিশ্বের যেকোনো সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে তুলনীয়। মিসাইল, আধুনিক ট্যাংক ও গোলন্দাজ বাহিনীর সব শাখাসহ সেনাবাহিনী এমন সব উপাদান সহকারে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ২০৩০ সালের জন্য নির্ধারিত ফোর্সেস গোলকে সামনে রেখে সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য রয়েছে নিজস্ব বিদ্যাপীঠ ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে কাজ করার পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য ঢাকার অদূরে রাজেন্দ্রপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (বিপসট)। এই প্রতিষ্ঠানটি এখন সারা বিশ্বে সেন্টার অব এক্সিলেন্স নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশের সেনা সদস্যরা নিয়মিত এখানে আসছেন প্রশিক্ষণের জন্য। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তি মিশনে এখন প্রথম কাতারের দেশের মধ্যে আছে, কয়েক বছর এক নম্বর দেশের মর্যাদায় ছিল। বিশ্বের অন্যান্য দেশ এখন বাংলাদেশকে শান্তি রক্ষা মিশনের জন্য একটি মডেল হিসেবে গণ্য করে।

নৌবাহিনী এরই মধ্যে ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। রয়েছে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ ও নিজস্ব এভিয়েশন শাখা। যুক্তরাষ্ট্রের নেভিসিলের আদলে গড়ে তোলা হচ্ছে নৌ কমান্ডো বাহিনী। এ বছরই নৌবাহিনীতে যুক্ত হতে যাচ্ছে মর্যাদার প্রতীক সাবমেরিন। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র সীমানার শান্তিপূর্ণ সমাধানের মধ্য দিয়ে যে বিশাল সমুদ্রসম্পদের নিরঙ্কুশ অধিকার আমরা পেয়েছি, তার প্রতিরক্ষায় নৌবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিমানবাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে আধুনিক জেনারেশনের যুদ্ধবিমান। আকাশসীমা প্রতিরক্ষায় বিমানবাহিনী এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। আজকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় নিজেদের পেশাগত উন্নয়নের অগ্রযাত্রার সঙ্গে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুর নিরাপত্তা বিধান ও হাতিরঝিলের মেগা প্রকল্প সময়মতো সম্পন্ন করে ঢাকাবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে সেনাবাহিনী। বহুল আকাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু নির্মাণে সেনাবাহিনী এখন সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সশস্ত্র বাহিনী আজ দেশে ও বিদেশে সমানভাবে প্রশংসিত।

একাত্তরের ২৬ মার্চ শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় পর্যায়ক্রমে আলাদা আলাদাভাবে তিন বাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে ২১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর আত্মপ্রকাশ ছিল চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের অন্যতম একটি মাইলফলক, যাকে সামরিক ভাষায় বলা হয় স্প্রিং বোর্ড টু ভিক্টরি বা দ্রুত বিজয় অর্জনের জাম্পিং প্যাড। যার ফলে ২১ নভেম্বরের পর মাত্র ২৬ দিনের মাথায় ১৬ ডিসেম্বর প্রায় ৯৩ হাজার দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। সুতরাং ২১ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট ও তাত্পর্য সশস্ত্র বাহিনী এবং বাঙালি জাতির ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল একটি অধ্যায়। মাত্র ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। তাই প্রায় অসম্ভব এই অর্জনে একাত্তরের ২১ নভেম্বর বা সশস্ত্র বাহিনী দিবসের গুরুত্ব ও তাত্পর্য অনাগতকাল ধরে আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে, উৎসাহিত করবে।

একাত্তরে যাত্রার শুরু থেকে এ পর্যন্ত আসতে মাঝপথে যে বিচ্যুতি ঘটেছে, সত্য ও ঐতিহ্যের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সেগুলোকে শুধু কেবল ইতিহাসের আস্তাবলে রেখে নিশ্চিত করতে হবে, তার ভাইরাস যেন নতুন প্রজন্মের সেনা সদস্যদের মধ্যে না ছড়ায়। সশস্ত্র বাহিনী দিবস পালন তখনই যথার্থতা পাবে ও সার্থক হবে, যখন বাহিনীর প্রত্যেক সদস্য তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস জানবেন, বুকে ধারণ করবেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ভেতরে তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করবেন। কথায় আছে, ঐতিহ্যের মৃত্যু নেই। এই উপলব্ধির মাত্রা যত বৃদ্ধি পাবে, ততই সশস্ত্র বাহিনী ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যের সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে। মানুষের প্রত্যাশা, সশস্ত্র বাহিনী তাদের মননে ও চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের দর্শন ও আদর্শকে ধারণ করে যেকোনো জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় সদা সর্বত্র প্রস্তুত থাকবে। ৪৫তম বার্ষিকীতে সশস্ত্র বাহিনীর সব সদস্যকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক