বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্ব বাড়ছে বাংলাদেশের

বিশ্ব অর্থনীতিতে দিন দিন গুরুত্ব বাড়ছে বাংলাদেশের। সুষম উন্নয়ন পরিকল্পনায় দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের পর অর্থনীতি ও শিল্পায়নে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এসব শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। সর্বশেষ চীন বাংলাদেশে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেছে। সরকারও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের তালিকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে।

গত সাত বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৮ থেকে নেমে ৪৪তম অবস্থানে এসেছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বিশ্ব অর্থনৈতিক সূচকে বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশ। সংস্থা ২টির মতে, ১৪ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৪৪তম। এ সময় বাংলাদেশের জিডিপির পরিমাণ বেড়ে ২০৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। সরকারের পূর্ব ও বর্তমান মেয়াদকালে দেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এ সময় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝেও অর্জিত অর্থনৈতিক-সামাজিক অগ্রগতি প্রশংসার দাবি রাখে। সরকারের দক্ষ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার ফলে রাজস্ব আহরণে ঊর্ধ্বগতি এবং ঋণ গ্রহণে স্থিতিশীলতা রজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

এক গবেষণার ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপারস (পিডব্লিউপি) বলেছে, ২০৫০ সালে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। সংস্থাটির মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি চীনের প্রবৃদ্ধি ২০২০ সালের পর কমবে। এর ফলে বহুজাতিক পশ্চিমা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে তাদের পণ্য উৎপাদনের জন্য বেছে নেবে। এতে রপ্তানিনির্ভর অনেক শিল্প এ দেশগুলোতে চলে আসবে এবং উচ্চ বেতনের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

এ পরিস্থিতিতে দেশে ১০০টি শিল্পাঞ্চল স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলছে সরকার। এ ক্ষেত্রে সরকার ধারাবাহিকভাবে সাফল্যও লাভ করছে। বিশেষ করে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ চুক্তির ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের কথায় চীনের এ বিশাল বিনিয়োগ চুক্তির ফলে বিশ্বনেতারা বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন করে ভাববেন। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অন্য দেশও বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় নামবে। শুধু চীনের প্রেসিডেন্টের সফরই নয় সম্প্রতি সময়গুলোতে বাংলাদেশে এসেছিলেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। আবার কয়েক দিন আগেই ‘ব্রিকস-বিমসটেক নেতাদের সম্প্রসারিত শীর্ষ সম্মেলনে’ যোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আগে জাপানে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের পার্শ্ব বৈঠকেও অংশ নেন তিনি। সবকিছু ধরে নিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের নাম ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশ মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছার সুবাতাস পাচ্ছে তেমনি বাংলাদেশের সুনাম বাড়ছে।

বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেয়ার পেছনে বেশকিছু কারণের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আগে বাংলাদেশ ছিল বিশ্ব অর্থনীতিতে নিছক গ্রহীতা, দেয়ার মতো তার কিছু ছিল না। এ দেশ ছিল প্রান্তিক পুঁজিবাদের সর্বশেষ প্রান্তের দরিদ্রতম দেশ।

হালে ধারণা পাল্টে গেছে। সেই সঙ্গে বিশাল শ্রমজীবী মানবসম্পদ, যাকে অর্থনীতিবিদরা ‘জনমিতি বোনাস’ নামে অভিহিত করছেন। বর্তমান অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স ও পোশাকশিল্পের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে বিপুল সাফল্য এবং উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিপুল অভ্যন্তরীণ বহুমুখী বাজার চাহিদা ইত্যাদি অনুক‚ল উপাদানগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির পুরনো ‘দরিদ্র’ অভিধাকে বদলে দিয়েছে। এসব কিছু দেখে বিশ্ব অর্থনীতির চালকরা বাংলাদেশকে বর্তমানে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির একটি উদাহরণ হিসেবে গণ্য করছে।

অপরপক্ষে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেকটা অ¤øø-মধুর। চীনের ওপর অনেক দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেমন অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল তেমন অনেক ক্ষেত্রে চীন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অন্যতম প্রতিযোগী দেশ। মার্কিন বাজারের বিরাট অংশ দখল করে রেখেছে চীন। আবার মধ্য এশিয়ার তেল-গ্যাস-কয়লা এবং আফ্রিকার বিপুল খনিজসম্পদ ভাণ্ডারের ওপর আমেরিকা-ব্রিটিশ পুঁজির যে একাধিপত্য বিদ্যমান ছিল তা এখন চীনের আক্রমণাত্মক বিনিয়োগের কারণে ক্রমেই পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। এ ছাড়া ল্যাটিন আমেরিকাও আমেরিকার কব্জা থেকে বেরিয়ে চীন ও এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে। তাই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশকে নিজেদের বলয়ে রাখার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব মোড়ল বলে পরিচিত রাষ্ট্রগুলোর নেতাদের বাংলাদেশ সফর আর বিভিন্ন চুক্তির ফলে আশা জাগানিয়া উন্নয়ন বলয়ে প্রবেশের অপেক্ষায় বাংলাদেশ। এর মূলে যে সূচকগুলো কাজ করছে তার মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে ক‚টনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অভূতপূর্ব সাফল্য।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যারোমিটার শুধুই ওপরের দিকেই উঠছে। সম্প্রতি ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের শীর্ষ পাঁচ নেতা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট মিশেল টেমের ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার সঙ্গে আমন্ত্রিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর পাশে বাংলাদেশের অবস্থান যেন নতুন বাংলাদেশেরই জানান দেয়।

এ ছাড়া বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের ব্যাপক ক‚টনৈতিক প্রচেষ্টার কারণে বিদেশিদের কাছে গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর যেসব দেশ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করে সহযোগিতা সংকুচিত করেছিল তারাই সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করছে। যার ফলে জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতের শীর্ষ নেতাদের এবং বিশ্বব্যাংক প্রধানের চলমান সফর বাংলাদেশ সরকারের ক‚টনৈতিক সফলতার প্রমাণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় অন্য দেশও বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় নামবে। এতে পাল্টে যাবে দেশের অর্থনীতির গতিপথ। বদলে যাবে মানুষের জীবনধারা।

চীনের এমন বিনিয়োগের চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হুসেন ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির যে আকার দাঁড়িয়েছে, তাতে চীন মনে করছে এখানে বিনিয়োগ করলে তারা লাভবান হবে। বাংলাদেশ তো বটেই। তিনি আরো বলেন, শুধু চীন নয় বাংলাদেশের সরকারের নেতৃত্বে দৃঢ়তার কারণে সব বড় শক্তিগুলো ভালো সম্পর্ক রেখে চলছে। তবে এ সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদ ও লাভজনক করতে গেলে নেতৃত্বের দৃঢ়তা খুবই প্রয়োজন। কারণ, চীনের বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ চুক্তির ফলে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের অবস্থান আরো বেড়ে গেছে। এখন বাংলাদেশ যে কোনো বিষয়ে যে কোনো দেশের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারবে।

এদিকে উন্নয়নশীল দেশে বাংলাদেশের সরব উপস্থিতি আছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী ও জয়লবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিষয়গুলো ইতিবাচক ভূমিকা বিদ্যমান উল্লেখ করে অধ্যাপক দেলোয়ার বলেন, আঞ্চলিক ও বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, বিশ্বয়ানের যুগে ‘কানেকটিভিটি’ মূল বিষয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ চীনাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ জন্যই তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে।

এখানে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, গত ২৯ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বাংলাদেশে এসেছিলেন। গত চার বছরে এটা ছিল কোনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিতীয় ঢাকা সফর। ২০১২ সালের মে মাসে সে সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকা সফর করেন। কেরির সঙ্গে এসেছিলেন নিশা দেশাই বিসওয়াল, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া-সংক্রান্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মূলত, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাপক অগ্রগতিরও প্রশংসা করেছেন কেরি। তার আসার আগে ঢাকা ঘুরে গেছেন ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী রোরি স্টুয়ার্ট। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং বাংলাদেশে ব্রিটেনের সহযোগিতার ধরন নিয়ে আলোচনা করতেই বাংলাদেশে এসেছিলেন। তার আগে গত বছরের মাঝামাঝিতে ঢাকা সফর করে গেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে দুই দেশের কর্মকর্তারা স্থলসীমান্ত চুক্তি বিনিময় করেন। এ ছাড়াও সে সফরে ২ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সস্তা শ্রমশক্তি অবাধ বিনিয়োগের সুযোগ আর সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এসব মিলে বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে চলছে তাতে মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানো সময়ের ব্যাপার মাত্র।