ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছে বাংলাদেশ

পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে কাঙ্ক্ষিত গতিতে। ২০১৮ সালে পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলাচলের লক্ষ্য নিয়ে দ্রুতগতিতে চলছে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ। মূল সেতু, নদীশাসন, সংযোগ সড়কসহ প্রকল্পের সার্বিক কাজের ৩৯ শতাংশ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। মূল সেতুর মাটি পরীক্ষা এবং সার্ভের কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। ঠিকাদারের নিজস্ব স্থাপনা, অফিস ল্যাবরেটরি, ওয়ার্কশেড, শ্রমিকদের থাকার স্থান এবং জেটি নির্মাণের কাজও চলছে সমানগতিতে। টেস্ট পাইলিংয়ের স্টিল ফেব্রিকেশনের কাজ চলছে চীনের একটি ওয়ার্কশপে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের জাজিরা অংশে সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ চলছে দ্রুততার সঙ্গে। ২০১৬ সালের মধ্যেই সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে, এমনটিই আশা করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। জাজিরা অংশে সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয়েছে ৩০ শতাংশ। একইভাবে মাওয়া অংশের সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে, যা শেষ করার কথা ২০১৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যে। মাওয়া অংশের কাজ এ পর্যন্ত প্রায় ২২ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এগিয়ে চলছে নদীশাসনের কাজ, যা ২০১৮ সালের নভেম্বরের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর ভূমি অধিগ্রহণ প্রায় শেষ হওয়ার পথে। প্রকল্পের জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজও চলছে সমানতালে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সার্বিক যোগাযোগের জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ছাড়া এই সেতুর সঙ্গে ওই অঞ্চলের মানুষের আবেগ, আকাঙ্ক্ষার গভীর যোগসূত্র রয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সরকারের কাছে তাদের প্রাণের দাবিও। এটা সত্য যে সরকারও বিভিন্ন সময়ে এই সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ‘পদ্মা সেতু’র মতো বৃহত্তম প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য সত্যিকার অর্থেই চ্যালেঞ্জের কিন্তু বাংলাদেশ সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একাগ্রতা ও সদিচ্ছার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা অসংগত নয়। কেননা নির্মাণাধীন এই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ‘বিশ্বব্যাংক’ তাদের অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি ফিরিয়ে নিলে শেখ হাসিনাই বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেছিলেন, এখানে কোনো দুর্নীতি নেই। প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়টিও সামনে আনার চেষ্টা করেছে বিশ্বব্যাংক কিন্তু সব ক্ষেত্রেই তারা ব্যর্থ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই জয় হয়েছে, যার চূড়ান্ত পর্বে নিজেদের অর্থেই নির্মিত হচ্ছে বহু আকাঙ্ক্ষিত এই সেতু।

পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলায় বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যোগাযোগব্যবস্থার জন্যই পদ্মা সেতু গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটা বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রশ্নেও গুরুত্ববহ। নিজের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছে। পদ্মা সেতুর মতো বড় একটা অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এ ধরনের আরো বড় অবকাঠামো নির্মাণে অনুপ্রেরণা হিসেবেই কাজ করবে।

সর্বোপরি বলতে চাই, পদ্মা সেতু নির্মাণ যেমন বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম সাফল্য হিসেবে পরিগণিত হবে, তেমনি যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি এসব এলাকার কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ জীবনমানেরও পরিবর্তন ঘটবে।

পদ্মা সেতু হলে দক্ষিণাঞ্চলের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিপ্লব সাধিত হবে। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের কারণে কেটে যাবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার সব দৈন্যদশা। দৈর্ঘ্যের বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এবং নদীর প্রশস্ততা ও পানি প্রবাহের তীব্রতার বিচারে বিশ্বের তৃতীয় এই সেতুই হবে ২০১৮ সালে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের মাইলফলক। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পর পাল্টে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের চেহারা। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ২১টি জেলা যুক্ত হবে সরাসরি সড়ক নেটওয়ার্কে। ঢাকা সঙ্গে খুলনা যাতায়াতের সময় বাঁচবে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা।

পদ্মা সেতুর সুফলের আওতা বাড়াতে এর ওপর দিয়ে স্থাপন করা হচ্ছে রেললাইন। এর অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকা থেকে পদ্মা বহুমুখী সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায়ই এটি সম্ভব হচ্ছে। পদ্মা সেতু হয়ে রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলগুলোয় অর্থনৈতিক জোন তৈরি করা হবে। এ ক্ষেত্রে রেলওয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে।

আমরা অবহিত যে অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিতব্য সেতুটি দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প হিসেবে গণ্য। এ সেতু বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুধু যুগান্তকারী অগ্রগতিই সাধিত হবে না, অধিকন্তু অর্জিত হবে জাতীয় আস্থা ও সক্ষমতা। এটা সুবিদিত যে অর্থনৈতিক উন্নতির অন্যতম মূল ভিত্তি হলো যোগাযোগব্যবস্থা। সেই সঙ্গে কার্যকর পরিকল্পনা অনুযায়ী বিনিয়োগ, অর্থাৎ উন্নয়ন পরস্পর সম্পর্কিত কতগুলো বিষয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়।

পরিশেষে বলছি, জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন বিধায়ই স্বপ্নের পদ্মা বহুমুখী সেতু বাস্তবে রূপ লাভ করতে যাচ্ছে। পদ্মা বহুমুখী সেতু চালু হলে দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি পদ্মা বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের উন্নয়নে আমূল পরিবর্তন আনবে এবং দেশের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে রচিত হবে এক নতুন ইতিহাস। নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সাহসী পদক্ষেপ বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে এবং আগামী দিনগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাবে।

লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়