ওবায়দুল কাদেরের কাছে প্রত্যাশা

উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুই দিনব্যাপী কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনা পুনরায় সভাপতি এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। শেখ হাসিনা নিশ্চিতভাবেই অষ্টমবারের মতো সভাপতি হবেন, এটা সবাই জানতেন। এ নিয়ে কারো মধ্যেই তেমন কোন কৌতূহল-উৎসুক্য বা আলোচনা-সমালোচনা ছিল না। ১৯৮১ সাল থেকেই তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা তার নেতৃত্ব গুণে বর্তমানে এমন এক অবস্থানে রয়েছেন, দলের প্রায় শতভাগ নেতাকর্মীই তার বিকল্প হিসেবে অন্য কাউকে ভাবতে পারছেন না। দেশের জনগণ ও দলের নেতাকর্মীদের মাঝে মূল আলোচনার বিষয় ছিল সাধারণ সম্পাদক কে হচ্ছেন। তবে সত্যিকার অর্থে যারা নির্ভেজালভাবে দল ও দেশকে ভালোবাসেন, তারা সবাই চেয়েছিলেন সাধারণ সম্পাদক পদে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন নেতা আসুক। জনগণের নেতা শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের মনের কথা বুঝেই গণমুখী, কর্মঠ, তৃণমূল থেকে ওঠে আসা, ত্যাগ-তিতিক্ষায় ভরপুর, ত্যাগী ও একজন সুযোগ্য নেতাকে তার রানিংমেট করেছেন। এটা ঠিক, আওয়ামী লীগে এই মুহূর্তে সাধারণ সম্পাদক হওয়ার মতো নবীন ও প্রবীণ অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। তাদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নেয়া খুবই কঠিন কাজ। তবে নেত্রী যে বেশিরভাগ নেতাকর্মীর ‘বেস্ট চয়েজ’কেই বেছে নিয়েছেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইতিমধ্যে ৮১ জনের কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে সভাপতিম-লীর ৩ জন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক এবং একজন সদস্য অর্থাৎ ৫টি পদ এখনো খালি রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে মন্ত্রিত্ব থেকে অপসারিত একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে নেয়া হচ্ছে বলে পত্রিকায় খবর বের হয়েছে। সম্মেলনের অব্যবহিত পূর্বে ১৮ অক্টোবর দেশের সবচেয়ে প্রাচীন দৈনিক সংবাদে আমার কলামে লিখেছিলাম, ‘সাধারণ সম্পাদক পদে অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে, উপ-কমিটির কোন প্রয়োজন নেই, যদ্দূর সম্ভব একই নেতাকে এমপি মন্ত্রিত্ব ও দলীয় পদ না দেয়া, দলীয় মনোনয়নে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রত্যেক ইউনিয়নে একজনকে মনোনয়ন দেয়া হলেও মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রায় সকলের কাছ থেকে ‘উপরি’ নিয়ে একদিকে তৃণমূল পর্যায়ে কোন্দল ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বের প্রতি কর্মীদের ঘৃণা সৃষ্টি হয়েছে। আর এ জন্য নতুন নেতা সৃষ্টি, দলে ভারসাম্য রক্ষা ও তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের প্রতি যে অনাস্থা ও ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনের জন্য সৎ, যোগ্য, পরীক্ষিত, ত্যাগী ও নির্লোভ ব্যক্তিদের নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের অনুরোধ করেছিলাম।’ সবাইকে খুশি রেখে সৎ ও যোগ্য লোকদের নিয়ে দলীয় কমিটি গঠন করা যে কোন নেতার জন্যই খুবই কঠিন কাজ। সেই কঠিন কাজটিই বঙ্গবন্ধুকন্যাকে করতে হয়েছে এবং অনেকটা ভালোভাবেই করেছেন। তবে দলে একজন সভাপতিম-লীর সদস্যের ব্যাপারে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে।
আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের রাজনৈতিক জীবন খুবই বর্ণাঢ্য। তিনি এবং আমি সমসাময়িক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি ফজলুল হক হল ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে ছাত্রলীগের নেতা ওবায়দুল কাদেরকে অনেকটা কাছ থেকেই দেখেছি। তিনি একবার ডাকসু নির্বাচনও করেছিলেন। তাছাড়া বাংলারবাণীতে প্রায় অর্ধযুগ আমরা একত্রে কাজ করেছি। তিনি সহকারী সম্পাদক হিসেবে কলাম লিখতেন। আমি ছিলাম সহ-সম্পাদক। দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে তাকে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রামে প্রথম কাতারেই দেখেছি। দলের দুর্দিনে-সুদিনে তিনি হচ্ছেন সার্বক্ষণিক নেতা। দলের দুঃসময়ে আত্মগোপন যেমন করেননি, তেমনি সামনের সারি থেকে পেছনের সারিতেও আসেননি। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংকটময় সময় বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এবং ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের পর এই দুই পর্বেই তিনি কারাবরণ করেছেন। যদ্দূর মনে পড়ে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জেলে থাকাকালে প্রতিভাবান ও দুঃসাহসী এই ছাত্রনেতা একটি বই লিখেছিলেন। বইয়ের নাম সম্ভবত ‘এ রিভোলিউশন বিট্রেইড’। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে তার লেখা কলাম নিয়েও বই প্রকাশিত হয়েছে। এ পর্যন্ত তিনি ৯টি বই লিখেছেন। ছাত্রলীগের সভাপতি, আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতি ও শিক্ষা সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, তিনবার সংসদ সদস্য, তিনবার মন্ত্রী এবং সর্বশেষ ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য।
ছাত্রলীগের ৬৮ বছরের ইতিহাসে মাত্র দু’জন নেতা দু’বার করে সভাপতি ছিলেন। এদের মধ্যে একজন হলেন ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী আর অপরজন হচ্ছেন ওবায়দুল কাদের। প্রথমবার ১৯৭৬ সালে জেলে থেকেই তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৮ সালে পুনরায় সভাপতি হন। এখন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার জন্য বহুলোক লাইনে থাকলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পরিস্থিতি ছিল ঠিক তার উল্টোটা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি কোম্পানীগঞ্জ থানা মুজিব বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস_ ছাত্রলীগের ইতিহাস। ছাত্রলীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদকরা পরবর্তীকালে অনেকেই আওয়ামী লীগের বড় নেতা ও মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু এই আওয়ামী লীগের ৬৭ বছরের ইতিহাসে ছাত্রলীগের মাত্র একজন সভাপতি ও ১ জন সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। ছাত্রলীগের পর পর দু’বারের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালে পর পর দু’বার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আর পর পর দু’বারের সভাপতি ওবায়দুল কাদের ২০১৬ সালের কাউন্সিলে হলেন সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রনেতাদের মধ্যে সম্ভবত মযহারুল হক বাকি ছাত্রলীদের দু’বার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পদ্মা সেতু নির্মাণেও মন্ত্রী হিসেবে প্রশংসনীয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক।
আসলে বিচক্ষণ ও দূরদর্শী বঙ্গবন্ধুকন্যার সদিচ্ছার কারণেই জনগণের নেতা ওবায়দুল কাদের এবার সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। দলে আসা হাইব্রিড গং কাদেরকে ঠেকাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। সম্মেলনের আগেই নেত্রী বলেছিলেন, দলে নতুন নেতৃত্ব আসবে। সম্মেলনের দুদিন পূর্বে ২০ অক্টোবর সাধারণ সম্পাদক পরিবর্তনের বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়। একটি জাতীয় দৈনিকে (প্রথম আলো) সম্মেলনের আগের দিন ২১ অক্টোবর লিড নিউজের হেডিং ছিল ‘সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আসছে?’ ওই রিপোর্টে বলা হয়, ১৯ অক্টোবর বুধবার আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় ৫ ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ বৈঠক হয়। বৈঠকের আগে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দলের নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের পর থেকে সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন শুরু হয়। পরদিন ২০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে গেলে উপস্থিত নেতাকর্মীরা তাকে অগ্রিম শুভেচ্ছা জানান। পত্রিকাটির (প্রথম আলো) পক্ষ থেকে ঐদিন (২০/১০/১৬) সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের জানান, ‘নেত্রী আমাকে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। কাউন্সিলরদের অনুমোদন সাপেক্ষে সম্মেলনে বাকিটা ঠিক হবে। চাঁদ উঠলে সবাই দেখবে।’ এই কথা পত্রিকায় পড়ার পর সবাই নিশ্চিত হয়ে যান, ওবায়দুল কাদেরই সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন।
সৈয়দ আশরাফ মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন, তিনিই তৃতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক হবেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার খবরাখবরও এ রকম ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে পরিবর্তনের বিষয়টি সৈয়দ আশরাফ ও তার সমর্থকরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। যে জন্য সম্মেলন নিয়ে জল্পনা-কল্পনা সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ২১ অক্টোবর সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘সব জল্পনা ভুয়ায় পরিণত হবে।’ সম্মেলনের প্রথম দিন সৈয়দ আশরাফ আবেগময় ভাষায় বক্তব্য দানকালে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের সন্তান। আওয়ামী লীগের ঘরেই আমার জন্ম। আওয়ামী লীগ ব্যথা পেলে আমার হৃদয়ে ব্যথা লাগে। আপনাদের রক্ত আমার রক্ত। এই রক্তে কোন পার্থক্য নেই। আমার সময়ে আওয়ামী লীগে কোন ‘ইজম’ হয়নি।’
তবে হাজারো নেতাকর্মী সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদেরকে চাইলেও যে কোন কারণেই হোক, বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক শেষ পর্যন্ত এর বিপক্ষে অবস্থান নেন। ২৪ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে (বাংলাদেশ প্রতিদিন) প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ‘আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে শেষ মুহূর্তে নাটকের পর নাটক জমে ওঠে। সৈয়দ আশরাফ যখন বুঝতে পারেন, তিনি ওই পদে আর থাকতে পারছেন না, তখন বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে দলীয় নেত্রীর কাছে যান। তার প্রস্তাবিত নামগুলো ছিল সোহেল তাজ, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ বা আবু সাঈদ আল স্বপন। এসব নাম শুনে বিস্মিত হন প্রধানমন্ত্রী। দলের হাইব্রিড নেতাদের একটি গ্রুপ ‘কাদের ঠেকাও’ তৎপরতা শুরু করেন। সৈয়দ আশরাফকে স্বপদে রাখতে সারা দেশের কাউন্সিলদের কাছে তারা বার্তাও প্রেরণ করেন। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক পরিবর্তনে দৃঢ় অবস্থানে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’ শুধু এবার নয়, দেশের স্বার্থে ও দলের স্বার্থে বঙ্গবন্ধুকন্যা অতীতেও কোন শক্তির কাছে নতি স্বীকার করেননি এবং তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি।
সৈয়দ আশরাফকে দলের ও দেশের মানুষ একজন নিপাট ভদ্রলোক, সজ্জন, সৎ মানুষ ও দেশপ্রেমিক হিসেবেই জানে। তবে পত্রিকার খবরটি যদি সত্য হয়, বিদায় মুহূর্তে সৈয়দ আশরাফ যদি ‘কাদের ঠেকাও’ অভিযানে নাম লিখিয়ে থাকেন, তাহলে কাজটি একেবারেই মানানসই হয়নি। সৈয়দ আশরাফ দু’বারের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ৭ বছর ৪ মাস দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের শুরুতে সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল গ্রেফতার হলে যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন। প্রায় দেড় বছর কারা-নির্যাতন শেষে মুক্তির পর জলিল ভাই আর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ফিরে পাননি। সেই হিসাবে প্রায় নয় বছর ধরেই সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ আশরাফ।
ওয়ান-ইলেভেনের সময় দলের বেশ কিছু নেতার অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকা-ের কারণে ২০০৯-এর কাউন্সিলে সৈয়দ আশরাফকেই সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন নেত্রী। সে সময় অনেক নেতাকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না বঙ্গবন্ধুকন্যা। আগেই বলেছি, সৈয়দ আশরাফ অনেক গুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের সুযোগ্য পুত্র। ২০১২ সালের কাউন্সিলে পুনরায় সৈয়দ আশরাফকে দায়িত্বে রাখেন নেত্রী। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা যে বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে সৈয়দ আশরাফকে এতটা দীর্ঘ সময় দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য তিনি সেই আস্থা ও বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেননি। মন্ত্রণালয় ও বাসভবন কোথাও দলীয় নেতাকর্মীরা তার সাক্ষাৎ পেতেন না। তিনি যোগ্য ও গুণী হলেও তার এই যোগ্যতা ও গুণাবলি দলের স্বার্থে কতটুকু কাজে লেগেছে? কথায় আছে, ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না।’ আমাদের বিদায়ী সাধারণ সম্পাদকও দীর্ঘ সময়ে দায়িত্ব থাকাকালে পদের মর্যাদা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করেননি। ৮/৯ বছর দায়িত্ব পালন শেষে যখন বুঝলেন, তখন তার আর করার কিছু ছিল না। এতো কিছুর পরেও জাতির জনকের কন্যা বিদায়ী সাধারণ সম্পাদককে দলের সভাপতিম-লীর সদস্য করেছেন।
নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তার ওপর আস্থা রেখে যে বিশাল দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন, তা প্রতিপালনে তার শ্রম, সামর্থ্য ও মেধা উজাড় করে দেবেন। আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে যে বিশাল কর্ম-পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন, তা বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালনে দলকেও সরকারের মতো শক্তিশালী করা হবে। জনস্বার্থবিরোধী কর্মকা-ে সম্পৃক্ত নেতাকর্মীদের ছাড় দেয়া হবে না। দলের হাইব্রিড নেতাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকা হবে। তৃণমূল নেতাদের জন্য তার দরজা সব সময় খোলা থাকবে।’ তিনি জোরের সঙ্গে বলেন, ‘দলে অনৈক্য ও বিভেদ প্রশ্রয় দেয়া হবে না। অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেয়া হবে। অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। বসন্তের কোকিল ও মৌসুমি পাখির স্থান আওয়ামী লীগে নেই। দল করলে দলের শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে।’
আসলে সবার আগে দলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। কোন্দল নিরসন করতে হবে। বাংলাদেশে এমন কোন জেলা নেই, যে জেলায় আওয়ামী লীগে এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে কোন্দল নেই। কোন্দলের কারণে ১০ থেকে ১৫/২০ বছর পরে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়েছে। সারা দেশে অধিকাংশ জেলায় কাউন্সিলার বা নেতাকর্মীরা মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কমিটি গঠন করতে পারেনি। বহু জেলায় দলীয় সভানেত্রীর নাম ভাঙিয়ে জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারা সম্মেলনে গিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ঠিক করে দিয়েছেন। কোন্দল কি অবস্থায় গেলে এই পরিস্থিতি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারকে পরিচালনা করে দল। ১৯৯৬ সালেও দেখেছি আবার ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে দেখছি সরকারের পেটে ঢুকে পড়েছে আওয়ামী লীগ। ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে গত ৯ বছর দলের সাংগঠনিক কাজ তেমন একটা হয়নি বললেই চলে। বিশেষ দিবসগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে জনসভা ও আলোচনা সভা হয় মাত্র। একই ব্যক্তি দল ও সরকারে নেতৃত্বে থাকলে এমনটি হওয়াই স্বাভাবিক। আর এ জন্যই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলকে পুরো সময় দেয়ার জন্য মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু দলীয় সভাপতির পদ ছেড়ে দেন। মন্ত্রিত্ব ছেড়ে এএইচএম কামরুজ্জামান সভাপতির দায়িত্ব নেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বঙ্গবন্ধুকে কেউ অনুরোধ করেননি। ১৯৭৪ সালে স্বেচ্ছায় আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু ছেড়ে দিবেন, এটা কি কল্পনা করা যায়? ১৯৭২ সালে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক পদ ছেড়ে দিলে জিল্লুর রহমান সেই পদে আসীন হন।
দলীয় মনোনয়নে উপজেলা, মেয়র ও ইউপি নির্বাচন দলের জন্য কতটুকু মঙ্গল হয়েছে, সেই বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। এসব নির্বাচনে অনেক ক্ষেত্রেই সত্যিকারভাবে উপযুক্ত লোককে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। এমন অভিযোগও রয়েছে, নগদ নারায়ণের বিনিময়ে অনুপ্রবেশকারী জামায়াত-বিএনপির লোকদেরও মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় প্রভাবশালীরা দলের ত্যাগী ও যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের মনোনয়ন দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের মূল শক্তি হচ্ছে তৃণমূল। দলের ৬৭ বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে এবং ১৯৬৬ সালসহ বিভিন্ন সময়ে শীর্ষ নেতারা দল ও দলীয় নেতার সঙ্গে বেঈমানী করেছেন। আর তৃণমূলের কারণে আওয়ামী লীগ আবার সংগঠিত হয়েছে। এই তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কারণেই আওয়ামী লীগকে ‘ফিনিঙ্ পাখি’র সঙ্গে তুলনা করা হয়। ফিনিঙ্ পাখি নাকি ধ্বংস হয় না। আওয়ামী লীগের ফিনিঙ্ পাখি হচ্ছেন গ্রাম-বাংলার তৃণমূলের নেতাকর্মী। ইউপি নির্বাচনে সেই তৃণমূলকেই অনেকটা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
ইউপি নির্বাচনে প্রতি ইউনিয়ন থেকে ৫ থেকে ১০ জন পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন চেয়েছেন। কিন্তু দল মনোনয়ন দিয়েছেন একজনকে। এতে স্বাভাবিকভাবেই মনোনয়ন বঞ্চিতরা দল ও দলীয় নেতৃত্বের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। কোন কোন স্থানে যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন না দিয়ে দলের প্রভাবশালীদের আত্মীয়-স্বজনদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে অন্যায় ও দলের জন্য চরমভাবে ক্ষতিকর কাজটি হচ্ছে, অনেক ইউনিয়নে মনোনয়ন বঞ্চিতদের কাছ থেকে গণহারে ‘উপরি’ নেয়া হয়েছে। উপজেলা ও জেলার দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনরাই টাকা নিয়েছেন। আওয়ামী লীগে নিশ্চয়ই অনেক সৎ নেতা আছেন, যারা কর্মীদের কাছ থেকে উপরি নেয়াকে ঘৃণার কাজ মনে করেন। কিন্তু ঘুষ গ্রহণকারী এবং প্রত্যাখ্যানকারী নেতাদের মধ্যে কোন সংখ্যা যে বেশি তা বিগত ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীরাই ভালো বলতে পারবেন। কোন কোন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতাদের নাম করেও এই অপকর্মটি করা হয়েছে। নয়া সাধারণ সম্পাদক যদি দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে অন্তত ১০/২০টি উপজেলায় জরিপ চালাতেন, তাহলে কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারতেন বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের শতকরা কতভাগ নেতার চরিত্র ‘ফুলের মতো পবিত্র’।
ক্ষমতাসীন দলের কিছু মন্ত্রী, নেতা ও সংসদ সদস্য এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনরা দেশের অনেক স্থানে রামরাজত্ব কায়েম করেছে। এসব ব্যক্তিবর্গ স্থানীয় জনগণ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুরনো আমলের জমিদারদের মতো আচরণ করে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু পরিবারের শহীদ সদস্যদের নামে গত কয়েক বছর ধরে বেশ কিছু হাইব্রিড সংগঠনের জন্ম হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে সরে গেলে এসব সংগঠনের নেতাদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সর্বোপরি আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য সকল পর্যায়ের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে। রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজ অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশের কোথাও কোথাও সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা কি কল্পনা করা যায়?
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে দেশ অবিশ্বাস্য অগ্রগতি সাধন করেছে। সদ্য সমাপ্ত সম্মেলনে নেত্রী ঘোষণা করেছেন, দেশে একজনও দরিদ্র থাকবে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান বিশ্বের প্রথমসারির গুটিকয়েক নেতাদের অন্যতম। তিনি বাঙালি জাতির আশীর্বাদ। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার ছিনতাই করা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে নেত্রী ফিরিয়ে দিয়েছেন। সম্প্রতি প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তার এক কলামে যথার্থই লিখেছেন, ‘এটা সত্য, শেখ হাসিনা এখন শুধু একজন পলিটিশিয়ান নন, তিনি একজন স্টেটসম্যানও। দেশের রাজনীতিতে বহু আকাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আনয়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্ব স্বীকৃত সাফল্য অর্জন করে তার নেতৃত্ব আজ একটি ইনস্টিটিউশনে পরিণত হয়েছে। এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে তার নেতৃত্বের প্রভাব স্পষ্ট। এখন তিনি নিজের আলোকেই আলোকিত।’ জাতির জনকের কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা অনেক আশা করে ওবায়দুল কাদেরকে তার সহযাত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আশা করি তিনি আমাদের নিরাশ করবেন না। পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জননেত্রীকে হেফাজত করুন। আমীন।
[১৩ নভেম্বর, ২০১৬]
[লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাবার্তা]