পাহাড়ে বাড়ছে কমলা ও মাল্টা চাষ

পাহাড়ে বাড়ছে কমলা আর মাল্টা চাষ। জুম চাষের পরিবর্তে বান্দরবানে মিশ্র ফল চাষের দিকে ঝুঁকছে পাহাড়িরা। কমলা আর মাল্টা চাষ করে বান্দরবানের সাত উপজেলায় স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মানুষ। এখানকার সু-স্বাদু কমলা আর মাল্টা এখন বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে তিন পার্বত্য জেলায় ৬শ কৃষক পরিবারকে পুনর্বাসনের প্রকল্প হাতে নেয়ার মাধ্যমে পাহাড়ে কমলাসহ মিশ্র ফল চাষের প্রক্রিয়া আরম্ভ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পটি ছিল পার্বত্যাঞ্চলে ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষিদের কমলা ও মিশ্র ফল চাষ। প্রকল্পে তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানে ৬শ পরিবারের মাঝে ৬শটি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়। পুনর্বাসিত পরিবারদের মাঝে ৪৫০ কমলা, ৯০০ কফি গাছের চারা, ৪৫০ পেঁপে, ১৫০০ কলা এবং ৩ হাজার আনারস চারা দেওয়া হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলায় পরিকল্পিতভাবে কমলা চাষ শুরু হয়। লাভজনক হওয়ায় স্থানীয় পাহাড়িরা এখন জুমচাষের পরিবর্তে কমলা, মাল্টাসহ মিশ্র ফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

কৃষি বিভাগের মতে, বান্দরবানের রুমা উপজেলার ইডেন পাড়া, মুন্নম পাড়া, বেথেল পাড়া, এথেল পাড়া, বগালেক পাড়া, কৈক্ষ্যংঝিড়ি, পাইন্দু, রনিন পাড়া মুরংগ পাড়া, শঙ্খমনি পাড়া, থানচি উপজেলার অ্যাম্পু পাড়া, কুনাং পাড়া, জিনিংঅং পাড়া, মঙ্গী পাড়া, রোয়াংছড়ি উপজেলার বেতছড়া, গালেঙ্গ্যা, ঘেরাও, দোলিয়াম পাড়া, পোড়া পাড়া এবং জেলা সদরের স্যারন পাড়া ও লাইলুনপি পাড়া এলাকায় গড়ে উঠেছে সাড়ে তিন শতাধিকেরও বেশি কমলা আর মাল্টা বাগান। চলতি বছর জেলায় প্রায় ৩৭০ হেক্টর জমিতে কমলা উত্পাদিত হয়েছে।

কমলা চাষি রনিন পাড়ার যায়াল বম ও গ্যালেঙ্গা পাড়ার মেনরুং ম্রো বলেন, জুম চাষের পরিবর্তে পাহাড়ে কমলা আর মাল্টা চাষ বাড়ছে। কমলা চাষ করে তারা লাভবান হয়েছে। তাদের দেখাদেখি কমলা চাষ করে আরো অনেকে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। অন্যান্য বারের তুলনায় এবার কমলা আর মাল্টা ফল ভালো ধরেছে; কিন্তু সাইজ একটু ছোট হয়েছে। যে কারণে ফল ভালো হলেও আশানুরূপ দাম পাচ্ছে না চাষিরা। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় বাজারে নিয়ে কমলা বিক্রি করতে পারছে না। কম দামে বাগান বিক্রি করে দিতে হচ্ছে।

আমতলী পাড়ার নিমথুই মারমা ও বটতলী পাড়ার মেলাং মারমা বলেন, ছোট ছোট গাছগুলোতে ঝুলছে কমলা আর মাল্টা। গাঢ় সবুজ রঙের কমলা, মাল্টাগুলোর কোনো কোনোটি হলুদাভ হয়েছে। প্রতিটি গাছে ৪০ থেকে ৫০টি ফল ধরেছে। কোনো কোনো গাছে তারও বেশি। ষাট হাজার করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় দুইটি কমলা বাগান বিক্রি করেছি।

বান্দরবান বাজারের ফল ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, রুমা এবং থানচি উপজেলা থেকে কমলা কিনে এনে বাজারে বিক্রি করি। কমলা ছোটগুলো জোড়া ২০ টাকা এবং বড় সাইজগুলো জোড়া ৩০ টাকা। এখানকার উত্পাদিত কমলা আর মাল্টা খেতে সু-স্বাদু হওয়ায় চাহিদাও রয়েছে। বাজার ছেয়ে গেছে এখানকার কমলা আর মাল্টায়। কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ভবতোষ পাল বলেন, কমলার ভালো ফলন হয়েছে এবার জেলায়। মাল্টাও খারাপ হয়নি। এ অঞ্চলের মাটি এবং আবহাওয়া কমলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। পরিকল্পিতভাবে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কমলা আর মাল্টা চাষ সম্প্রসারণ হচ্ছে বান্দরবানে। লাভজনক হওয়ায় জুম চাষের পরিবর্তে কমলা চাষে আগ্রহী হচ্ছে পাহাড়িরা। থানচি সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মাংসার ম্রয় বলেন, এখানে উত্পাদিত কমলাগুলো খুবই সু-স্বাদু এবং সাইজে বড়। বাগানের কয়েকশ কমলা গাছে ৫০ হাজারেরও বেশি কমলা ধরেছে; কিন্তু ব্যবসায়ীরা চাষিদের অগ্রিম টাকা দিয়ে পাইকারি দামে কমলা বাগান কিনে নিচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সুবিধা না থাকায় ফড়িয়াদের কাছে নামমাত্র মূল্যে কমলা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে চাষিরা। বর্তমান বাজারে প্রতিটি কমলা ১০/১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ফড়িয়া-ব্যবসায়ীরা দুর্গম রুমা ও থানছি থেকে একশ কমলা কিনছে মাত্র চারশ থেকে পাঁচশ টাকায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আলতাফ হোসেন জানান, পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়ি মাটি কমলা, মাল্টা চাষের উপযোগী। বাম্পার ফলনের পরও অগ্রিম বাগান কিনে নেয়ায় ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীরা রং আসার আগেই থোকায় থোকায় ছোট কমলা ছিড়ে বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। ফলে উত্পাদিত কমলার স্বাদ অনেক কমে যাচ্ছে এবং খেতে একটু টক লাগছে। কমলাগুলো বড় হওয়ার সুযোগ দিলে এবং সঠিক পরিচর্যায় কমলা বাগান সংরক্ষণ করা গেলে বান্দরবান একদিন কমলা চাষের জন্য বিখ্যাত হবে।