নদী বাংলাদেশের প্রাণ

জানবে যদি জাগবে নদী’ স্লোগানে রিভারাইন পিপল এবং সমকাল সুহৃদ সমাবেশের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় নদী অলিম্পিয়াড ২০১৬ এর রাজশাহী বিভাগীয় অলিম্পিয়াড ১২ নভেম্বর শনিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীদের শতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দিনব্যাপী এ আয়োজনের সহ-আয়োজক ছিল বারসিক

‘নদী সম্পর্কে আগে তেমন কোনো জানাশোনা ছিল না। নদী অলিম্পিয়াডের কথা শুনে পড়াশোনা শুরু করি। কিন্তু পড়তে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল আমাদের কারণেই নদীগুলোর এই দশা। একদিকে মরুভূমি হচ্ছে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলো আবার অন্যদিকে সৌন্দর্য হারাচ্ছে দেশ। তাই মনে হয়েছে আমরা তরুণরা যদি সোচ্চার না হই, তবে কয়েক বছর পর নদীগুলো একেবারেই মরে যাবে। তাই আমি আমার জায়গা থেকে সচেতন হচ্ছি।’

শনিবার জাতীয় নদী অলিম্পিয়াডের রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলাম মোস্তফা এভাবেই ব্যক্ত করেন তার অভিব্যক্তি। রিভারাইন পিপল ও সমকাল সুহৃদ সমাবেশের আয়োজনে এবং বারসিকের সহ-আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের ১৫০ নম্বর গ্যালারি কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিভাগীয় নদী অলিম্পিয়াড।

সকালে বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে অলিম্পিয়াডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নদী বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সরাসরি আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে শনিবার সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনে ছিল উৎসবের আমেজ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত হন। তারা সবাই এসেছিলেন নদী সম্পর্কে জানতে এবং জানাতে।

রিভারাইন পিপলের চেয়ারপারসন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাসুদ পারভেজ রানার সভাপতিত্বে এবং সমকালের রাজশাহী ব্যুরোপ্রধান সৌরভ হাবিবের সঞ্চালনায় জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ যেসব জলাশয়, নদী ও খালগুলো আছে, সেগুলো যেন আমাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমরা যেন নিজেদের এই নদীগুলোকে মেরে ফেলে আত্মাহুতির পথ বেছে না নিই। এটিই হবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক নদীর সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। অথচ আমরা স্বাধীনতার ৪৫ বছরে মাত্র একটি আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। এভাবে প্রতি ৪৫ বছরে যদি একটি নদীর পানি চুক্তি করি তাহলে শত শত বছরেও শেষ হবে না। তাই আমরা একটি আইডিয়া দাঁড় করিয়েছি, ‘বেসিন ওয়ায়িজ রিভার ম্যানেজমেন্ট’। অর্থাৎ একটি নদীর উৎপত্তি যেখানে, সেখানে থেকে একাধিক নদীর উৎপত্তি হয়েছে। ম্যানেজমেন্টটা যদি আমরা সেখানে শুরু করি তাহলে সেখান থেকে উৎপত্তি হওয়া পাঁচটি নদীর ব্যাপারে একসঙ্গে আমরা আলোচনায় এসে সমাধানের পথে পেঁৗছাতে পারি। নীতিগতভাবে ভারত ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে সম্মতিও দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। গঙ্গা ব্যারাজ সম্পর্কে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রায় মৃত কোনো নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা অনেক ব্যয়বহুল। গঙ্গা ব্যারাজ নামে সরকার যে প্রকল্প গ্রহণ করেছে, সেটার খরচ পদ্মা সেতুর চেয়েও চার গুণ বেশি। এর মাধ্যমে নদীকে শাসন করা, নতুনভাবে পুনরুজ্জীবিত করা, পানি পরিষ্কার করা সম্ভব হবে। শুধু নদী নয়, আশপাশে যত খাল-বিল, জলাশয় আছে সেগুলোকে এই গঙ্গা ব্যারাজের আওতায় আনা হয়েছে।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, ‘তরুণদের নদী সম্পর্কে সচেতন করতে আমরা নানাভাবে কাজ করছি। নদী নিয়ে যেন শুধু বাংলাদেশ নয় বরং দক্ষিণ এশিয়ার সবাই সচেতন হতে পারে সেই পরিকল্পনাকে সামনে রেখে আগামী বছর দক্ষিণ এশিয়ান নদী অলিম্পিয়াড আয়োজনের পরিকল্পনা করেছি।’

অনুষ্ঠানে সমকালের সহকারী সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ বলেন, ‘সমকাল শুধু প্রতিদিনের খবর পরিবেশনই করে না, সমকাল সামাজিক, সাংস্কৃতিক দায়িত্ব থেকে দেশব্যাপী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। আর উপমহাদেশের অধিকাংশ সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। সেই নদী বর্তমানে শুকিয়ে যাচ্ছে। নানা রাজনৈতিক-আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কারণে নদী নিয়ে সমস্যা বাড়ছেই। তরুণ প্রজন্ম যদি জেগে ওঠে এবং সচেতন হয় তাহলে নদী নিয়ে যত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হচ্ছে তা রুখে দেওয়া সম্ভব।’

প্রতিযোগিতার পর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। প্রশ্নোত্তর পর্বে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু হানিফ শেখ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম, নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এসএম মিজানুর রহমান, প্রাণবৈচিত্র্য গবেষক পাভেল পার্থ, নোঙর চেয়ারম্যান সুমন শামস এবং রিভারাইন পিপলের পরিচালক নূসরাত খান। সমকাল সুহৃদ সমাবেশের সহসম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান এর সঞ্চালনায় প্রশ্নোত্তর পর্বের সভাপতিত্ত্ব করেন শিক্ষাবিদ ও কবি অধ্যাপক জুলফিকার মতিন। প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর এবং নদী সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন প্যানেলের সদস্যরা।

প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে পুরস্কার বিতরন ও সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বাধিক নম্বরের ভিত্তিতে প্রথম ২০ জনকে জাতীয় নদী অলিম্পিয়াডের চূড়ান্ত আসরে অংশগ্রহণ করার জন্য নির্বাচিত করা হয়। পুরস্কার বিতরন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান, কবি জুলফিকার মতিন, অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম, রিভারাইন পিপলের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক ড. মো. মোশাররফ হোসেন, সদস্য সচিব রেবেকা সুলতানা, রিভারাইন পিপলের চেয়ারপারসন মো. মাসুদ পারভেজ রানা, পরিচালক তরিকুল ইসলাম এবং সমকালের রাজশাহী ব্যুরোপ্রধান সৌরভ হাবিব।

পুরস্কার বিতরন অনুষ্ঠানে কবি জুলফিকার মতিন বলেন, ‘আমরা বেঁচে থাকতে চাই। যদি প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তবেই বেঁচে থাকব। আমাদের পরিবেশের অন্যতম উপাদান হচ্ছে নদী। নদীতীরেই অধিকাংশ সভ্যতা গড়ে উঠেছে। তাই নদীকে বাঁচানো আমাদের দায়িত্ব।’

অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক সমকাল সুহৃদ সমাবেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড

বায়োটেকনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অপূর্ব কুমার রায় জানান, তরুণ প্রজন্মকে নদী সম্পর্কে সচেতন করে তোলাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। দেশের নদ-নদী যেভাবে পানিশূন্য হয়ে মরুভূমির রূপ ধারণ করছে, সে সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম সচেতন হোক এবং দেশবাসীকে সচেতন করে তুলুক এটাই প্রত্যাশা।

নদী অলিম্পিয়াডে ৫০-এর মধ্যে সর্বাধিক ৩৭ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মো. আবু সাইদ, দ্বিতীয় হয়েছেন একই নম্বর পেয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী স্মিতা সরকার, তৃতীয় হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. মুস্তাফিজুর রহমান, চতুর্থ হয়েছেন রাজশাহী কলেজের আবু তাহের, পঞ্চম হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাফি হাসান, ষষ্ঠ হয়েছেন নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিহাব উদ্দিন, সপ্তম হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সোয়েব সালেহীন, অষ্টম হয়েছেন নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির আসিফ আলী; নবম, দশম ও ১১তম হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওবায়দুর রহমান, জান্নাতুন নাঈম ও গোলাম মোস্তফা; ১২তম হয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৌহিদুল ইসলাম, ১৩ ও ১৪তম হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদ্দাম হোসেন এবং আল আমিন; ১৫ ও ১৬তম হয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের কাদেরী কিবরিয়া ও আহসান হাবীব; ১৭তম হয়েছেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবি্বর আহমেদ; ১৮ ও ১৯তম হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপন কুমার রায় ও ওলিউল্লাহ এবং ২০তম হয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের তানজিমা আক্তার জিনাত।

বিজয়ী ২০ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চূড়ান্ত আসরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নদী অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করবেন। আট বিভাগ থেকে সেরা ২০০ শিক্ষার্থী নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নদী অলিম্পিয়াড-২০১৬।

যেসব সুহৃদদের সহযোগিতায় সফল হয় আয়োজন, তারা হলেন_ অয়ন, সামিউল, সজীব, রুশতি, মৌ, সাজু, রত্না, সানজিদা, মিজান, রিংকু ও শাহীন; রাজশাহী কলেজ সুহৃদ মুবাসসির, ফজলে রাবি্ব ও নাফিজা এবং রিভারাইন পিপলের মতিন, তুষার, শাহরিয়ার, আফসানা, সোহাগ, মার্দিয়া, তাসকিন, তুলি ও শামিরুল।