দেশপ্রেম ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয় ‘অক্ষর’

‘মহান ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধসহ সব শহীদের নামে শপথ গ্রহণ করছি যে, শহীদরা যে স্বপ্নে তাঁদের জীবন দিয়ে গেছেন সেই সুখী সমৃদ্ধিশালী হাসি-গানে মুখরিত এক সোনার বাংলা গড়তে আমরা আমাদের মেধা-শ্রম, সর্বোপরি জীবন উৎসর্গ করব।’—প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সামনে হাত বাড়িয়ে এই শপথ গ্রহণ আর জাতীয় সংগীতের পর শুরু হয় ‘অক্ষর শিশু শিক্ষালয়’-এর পাঠদান। ক্লাসে ঢুকেই খুদে শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে সুরে সুরে উচ্চারণ করে ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি।’

যশোর উদীচী পরিচালিত দেশের একমাত্র এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে নাচ, গান, কবিতা, চিত্রাঙ্কন শেখানো হয়। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলে এই সাংস্কৃতিক চর্চার নম্বর যোগ হয়। পাশাপাশি স্বতন্ত্রভাবে ‘দেশ’ নিয়ে একটি ক্লাস নেওয়া হয়। সেই ক্লাসে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধুসহ দেশের সোনার মানুষদের সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা জানতে পারে। টিফিন পিরিয়ডে ‘সমাজতান্ত্রিক টিফিন’ সব শিক্ষার্থী মিলেমিশে খায়। শনিবার নুডলস, রবিবার সেমাই, সোমবার ডিম-পরোটা, মঙ্গলবার পাউরুটি, বুধবার রুটি-ডিম-ফল, বৃহস্পতিবার পরোটা-মিষ্টি—এই হচ্ছে সব শিক্ষার্থীর টিফিন। কোল্ড ড্রিংকস, চিপস নট অ্যালাউ। আপারা বলে যান আর শিক্ষার্থীরা তা শুনে শুনে লেখে, ‘আমার দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে আমি ভালোবাসি। রাম, রহিম দুই বন্ধু। হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই।’ এমনই নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া হয় এই শিক্ষায়তনে।

ব্যতিক্রমী এই বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু ১৯৯৪ সালে। সে সময় যশোর উদীচীর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সোহরাব উদ্দিন। তাঁরই চিন্তার ফসল এটি। বর্তমান সভাপতি ডি এম শাহিদুজ্জামান বলেন, ‘শহরের বাদশা ফয়সল স্কুলে জাতীয় সংগীত হয় না। জাতীয় পতাকাও উত্তোলন করা হয় না। শিক্ষার্থীদের ভুল শেখানো হয়। বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ বিধর্মী, বঙ্গবন্ধু গাদ্দার, একাত্তরের যুদ্ধ ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই। আশির দশকের শেষে এমন বাস্তবতায় সোহরাব ভাইয়ের আগ্রহে ১০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এই স্কুলের প্লে গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়।’ বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলটির শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাত শ। পাঠদান করছেন ১৭ জন শিক্ষক। প্রতিদিনই কবিতা ও গানের ক্লাস হয়। বোর্ডের বই ছাড়াও নিজস্ব ভাবনাচিন্তার ওপর ভিত্তি করে সাধারণ জ্ঞানের বই পড়ানো হয়।

নার্সারি ক্লাসের শিক্ষার্থী প্রশ্ন কবিতায় বরাবরই ফার্স্ব। সে বলল, ‘আমার স্কুল খুব মজার। কবিতা পড়তে খুব ভালো লাগে।’ প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহনা বলল, ‘স্কুলের কবিতা, গান আমাদের খুবই আনন্দ দেয়।’ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ চামেলি মুখার্জি বললেন, ‘আমাদের স্কুলের শ্রেণির নাম পাখি, ফুল, বাংলা মাস আর নদীর নামে। আমরা ছোট থেকেই তাদের দেশপ্রেম ও নৈতিকতার শিক্ষা দিই। শিকড়ের শিক্ষা দিই। বেশির ভাগ শিশুই দাদার নাম বলতে পারে না। আমরা সাধারণ জ্ঞানের ক্লাসে দাদার নাম কী, দোয়েল পাখির রং কেমন, কাঁঠাল খেতে কেমন, মালতিলতা কী, ভৈরব কেন নদ?—এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শিখাই।’

সভাপতি ডি এম শাহিদুজ্জামান বললেন, ‘আমরা যেসব ঘরে নাচ-গানের চর্চা করি সেসব ঘরেই ক্লাস হয়। শিক্ষার্থীর চাপে এখন আর জায়গা হচ্ছে না। সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা আমরা পাইনি। তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে একটি মাল্টিমিডিয়ার জন্য আবেদন করেও তা পাইনি। আমরা স্কুলটিকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত চালুর পরিকল্পনা নিয়েছি। কিন্তু জায়গা পাচ্ছি না।’

উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুর রহমান বলেন, ‘এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি গান ও কবিতা শেখানো হয়। শেখানো হয় দেশপ্রেম। আমার মেয়েও এই স্কুলে পড়ে। স্কুলটি আমাদের কাছে একটি মডেল।’