গ্রামীণ জীবন লোক চেতনার গৌরবে উদ্ভাসিত হবে নগর

কার্তিক প্রায় শেষ। মাত্র আর একদিন বাকি। এর পরই শুরু হচ্ছে নতুন মাস। আগামীকাল মঙ্গলবার ১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৩ বঙ্গাব্দ। শুধু নতুন নয়, দিনটি যারপরনাই বিশেষ। এই দিবসে আনুষ্ঠানিক শুরু হচ্ছে নবান্ন উৎসবের। ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ নতুন অন্ন। গত কিছুদিন ধরেই চলছিল আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ। নতুন চালের ঘ্রাণ আসছিল নাকে। এই চালেই হবে নবান্ন।

হাজার হাজার বছর আগে কৃষি প্রথা চালু হবার পর থেকেই নবান্ন উৎসব উদ্যাপিত হয়ে আসছে। কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন সেগুলোর প্রধানতম। আধুনিকতার চমক আর অন্যের চর্চারে অভ্যস্থ বাঙালী নিজের অনেক কিছুই খুইয়েছে। আগের মতো হয় না নবান্ন উৎসব। তবে একেবারে মøান হয়ে যায়নি আনন্দ। বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া গ্রামে এখনও নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। এবারও মহা আনন্দে উৎসব উদ্যাপন করবে বাংলার কৃষক। নতুন চালে পিঠা পুলির আয়োজন করা হবে। আছে আরও অনেক প্রাচীন রীতি। সেগুলো মেনেই হবে নবান্ন উৎসব। এখন বাংলার ঘরে ঘরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

অবশ্য নাগরিক জীবনে নতুন ধান বা চালের কোন অস্তিত্ব নেই। নেই বললেই চলে। রাজধানী শহর ঢাকায় বসে শুধু অনুভব করা যায়। শেকড় সন্ধানী মানুষ চিরায়ত ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করে। গ্রামীণ জীবন ও লোক চেতনার গৌরবে এবারও উদ্ভাসিত হবে নগর। ঘরে ঘরে উৎসব আয়োজনের সুযোগ নেই। তাই বলে খিল এঁটে কেউ ঘরে বসে থাকবেনÑ এমন নয়। বরং শহরে নগরে ভিন্ন আঙ্গিকে উদ্যাপিত হয় নবান্ন উৎসব। ১ অগ্রহায়ণ মনের আনন্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসবেন শেকড় সন্ধানী মানুষ। শহরজুড়ে থাকবে হরেক আনুষ্ঠানিকতা। ফসল কেন্দ্রিক সবচেয়ে প্রাচীন এবং বড় উৎসবের স্বরূপটি তুলে ধরা হবে নাচ গানসহ বর্ণাঢ্য পরিবেশনায়। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিবারের মতোই মূল আয়োজনটি থাকছে চারুকলার বকুলতলায়। এখানে বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করবে জাতীয় নবান্নোৎসব উদ্যাপন পর্ষদ। সকাল ৭টা ১ মিনিটে নবান্ন উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। উৎসব উদ্বোধন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আয়োজকরা জানান, সঙ্গীত নৃত্য আবৃত্তিসহ নানা আয়োজনে বাংলার লোকজীবন ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হবে। বেজে ওঠকে বাংলার ঢাক-ঢোল। নবান্ন উৎসবের আরেকটি বর্ণিল ছবি দেখা যায় পাহাড়ী জনপদে। ঝুম চাষের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি উৎসবে তুলে ধরবেন আদিবাসী শিল্পীরা। বর্ণাঢ্য পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসবেন তারা। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য পিঠা পুলির মাধ্যমে আপ্যায়ন করা হবে আগতদের। থাকবে মুড়ি মুড়কি বাতাসাও। প্রথম পর্ব শেষে সকাল ৯টায় নবান্ন শোভাযাত্রা বের করা হবে। দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। প্রায় একই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় আয়োজন করা হবে নবান্ন ও লোকজ মেলার। দুই দিনব্যাপী আয়োজনে উৎসবমুখর হয়ে উঠবে স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর। প্রথমবারের মতো উৎসবের আয়োজন করছে বাংলাদেশ ইয়ুথ এন্ড স্টুডেন্টস ফোরাম ফর ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট। নবান্ন উৎসবের দিন মঙ্গলবার সরব থাকবে ধানম-ি রবীন্দ্রসরোবর মুক্তমঞ্চ। বেশ কিছু সংগঠনের শিল্পীরা নাচ পরিবেশন করবেন। অংশগ্রহণ করবেন দেশের প্রথিতযশা শিল্পীরাও।

সকল আয়োজন থেকে লোক-মানসের প্রচার ও প্রকাশ ঘটানো হবে। হিংসা বিদ্বেষ ভুলে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাঙালী উৎসবে অংশ নেবেন বলে আশা আয়োজকদের। অবশ্য অনেকদিন ধরেই নবান্ন উৎসব সরকারীভাবে উদ্যাপনের দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন সংগঠন। এ প্রসঙ্গে নবান্ন উৎসব উদ্যাপন পর্ষদের চেয়ারপার্সন ও বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান বলেন, পৃথিবীর বহু দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। এরপরও রাষ্ট্রীয়ভাবে নবান্ন উৎসবের আয়োজন হয় না। সরকারীভাবে উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি পহেলা অগ্রহায়ণ সরকারী ছুটি ঘোষণার দাবি জানান তিনি। বলেন, সকল সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদের উত্থান ঠেকাতে বাঙালীর নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে হবে। নবান্ন উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে এটি সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।