গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া

বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। জীবন উন্নয়ন ও টেকসই বিশ্ব গড়তে তথ্যপ্রযুক্তির সেবা আবশ্যক এতে কোন সন্দেহ নেই। আর বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় এ দেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। সে কারণে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ফলে হালবলদের চেয়ে যন্ত্রনির্ভর চাষাবাদ এখন অনেক বেশি। গ্রামাঞ্চলে গরুর গাড়ির ব্যবহার এখন নেই বললেই চলে। সবকিছুই এখন মেশিন বা বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত। যার ফলে অল্প লোক দিয়ে অনেক বেশি কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। বাড়ছে কৃষি উৎপাদনও। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা বৃদ্ধির পেছনে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিও একটি অন্যতম কারণ। এ ক্ষেত্রে নারীর অবদান ৫৩ শতাংশ এবং পুরুষের ৪৭ শতাংশ। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান। একসময় উত্তর বা দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে বছরে একবার ধান চাষ হতো। বাকি সময় জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। ফলে মাঠজুড়ে চরে বেড়াত গরুর পাল। বর্তমানে সেই চিত্র পুরোটাই বদলে গেছে। একটি ফসল উঠতে না উঠতেই অন্য আরেকটি ফসল রোপণের চিন্তা শুরু করে কৃষক। পানির অভাবে ফসল নষ্টের সম্ভাবনা এখন খুব কম কেননা গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে যান্ত্রিক সেচের প্রবর্তন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের মাঠঘাট সবুজে ভরপুর সব সময়। আগের দিনে গ্রামের চাষীরা শুধু ধান আর পাট বেশি চাষ করতেন। তাতেই তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন মিটে যেত। আর বর্তমানে দেখা যায় গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে সবজি, ফল, মাছ, গরু, হাঁস-মুরগিসহ অনেক কিছুই। সম্প্রতি গ্রামে গরুর খামারে আগ্রহী হচ্ছে অনেকে। আবার অনেকে চাকরি করেন সময় নেই গরু পালনের তারাও গ্রামের গরিব মানুষদের কাছে গরু কিনে দিচ্ছেন বিভিন্ন শর্তে। এর ফলে দুজনই লাভবান হচ্ছেন। দেশে গরু উৎপাদন বাড়ছে এর ফলে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছের চাষ বেড়েছে অনেক। প্রায় প্রতি গ্রামেই এখন মৎস্য খামার আছে । যেখানে সেখানে মুরগির খামারও অনেক বেড়েছে। যা দুই দশক আগেও মানুষ চিন্তাই করত না। তাছাড়া রেমিটেন্স গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতির বিশেষ চালিকাশক্তি এখন। প্রায় এক কোটি মানুষ এখন প্রবাসে, যার বেশিরভাগই গ্রাম থেকে গেছেন। তাদের প্রেরিত অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাজার বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ফলে কমেছে দারিদ্র্য ২০০৫ সালে দেশে দরিদ্র মানুষ ছিলেন ৪৩.৩ শতাংশ। সেটা কমে এখন মাত্র ১২.১ শতাংশ। মাঠের পুরো জমিতেই উৎপাদন হচ্ছে এখন কোথাও ফাঁকা জমি দেখা যায় না । এমনকি বাড়ির আশপাশে এক টুকরো জমিও পাওয়া যাবে না যেখানে কোন ফসল বা সবজি উৎপাদন হয় না। যার ফলে এক সময় তিন বেলা খাবার নিয়ে অনেক মানুষ চিন্তা করত। আর এখন সবার হাতে দামি মোবাইল ফোন, বাড়িতে টেলিভিশন (ডিশ লাইনসহ) দেশে ও বিদেশে কখন কি হচ্ছে দ্রুতই জেনে যাচ্ছে একজন সাধারণ কৃষকও। মোবাইল বা মুঠোফোন অনেক ক্ষেত্রে কৃষির হেল্পলাইন হিসেবেও কাজ করছে। এতে ইন্টার এ্যাকটিভ ভয়েস রেকর্ড, মেসেজ, যে কোন পরামর্শ এমনকি বিরূপ আবহাওয়ার করণীয় বার্তা প্রদান এনে দিচ্ছে কৃষিক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক গতি ও সাফল্য। তা ছাড়া টেলিভিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান বা প্রামাণ্যচিত্র দেখে কৃষক নানা সমস্যার সমাধান পেয়ে যাচ্ছে। আগের দিনে গ্রাম ও শহরের যে ব্যবধান ছিল তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে তা এখন অনেকটা কমেছে। গ্রাম ও শহরের বাণিজ্যিক যোগাযোগ এখন আগের যে কোন সময়ের তুলনাই বেশি। তা ছাড়া কৃষকদের দেয়া হচ্ছে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ সরকারী ও বেসরকারীভাবে। ফলে ক্ষেতে পাচ্ছে না এমন লোকের সংখ্যা দেশে নেই বললেই চলে। তা ছাড়া আমাদের দেশের কৃষক প্রগতিমনা ও পরিশ্রমী। তার বাস্তব প্রমাণ দেখা যায় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে গেলে কাঁটাতারের বেড়ার পাশেই বাংলাদেশ সীমান্তে মাঠ ভর্তি ফসল। ভারতের অংশে ধু ধু মাঠ গরু চরছে। আমাদের দেশের কৃষকের পরিশ্রমের ফলেই কৃষি জমি কমলেও উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) সূত্রে জানা গেছে, সংস্থার বিজ্ঞানীরা ১৯৭১ সাল থেকে এ পযর্ন্ত ৭৪টি উচ্চফলনশীল (উফশী) ও চারটি হাইব্রিড ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন।

Views: 36