ঘরকন্যা থেকে সাগরের ট্রলারে সৌর বিদ্যুৎ

ঘরকন্যা থেকে সাগরের ট্রলারে সৌর বিদ্যুৎপানির কল ছাড়লেই আলো জ্বলবে, সাগরের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা রান্নার কাজে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহারের নতুন নতুন প্রযুক্তি তৈরি করেছে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
১০ নভেম্বর থেকে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় চলছে আন্তর্জাতিক বিদ্যুৎ মেলা। সেমস গ্লোবাল এ মেলার আয়োজন করেছে। গতকাল শনিবার মেলা ঘুরে তাদের তৈরি যন্ত্রগুলোর এই প্রদর্শনী দেখা যায়। তিন দিনের মেলার গতকাল ছিল শেষ দিন।
ঘরে পানির কল ছাড়বেন আর আলো জ্বলবে। বাড়ির ছাদের পানির ট্যাংকের পানির চাপ থেকে উৎপাদন হবে বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ করা যাবে মোবাইল, চালানো যাবে ছোট বাতি। এমনই যন্ত্র আবিষ্কার করেছে বগুড়ার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির শিক্ষার্থী মো. সালাউদ্দিন কায়সার। তিনি জানান, এই যন্ত্র ব্যবহার করে বহুতল ভবনের পানির ট্যাংকে সরবরাহ করা পানির প্রবাহ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বহুতল ভবনের পানির পাম্প ও ট্যাংকের মধ্যে পাইপের মধ্যে একটি টারবাইন বসাতে হবে। ট্যাংক থেকে পানি পড়বে এই টারবাইনে। আর পানির চাপে ঘুরবে চারবাইন। এতে যে শক্তি তৈরি হবে তা থেকেই উৎপাদন হবে বিদ্যুৎ। তিনি জানান, এই জেনারেটর থেকে যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে তা দিয়ে সীমিত ওয়াটের বাতি, ফ্যান চালানো ও মোবাইল চার্জ করা সম্ভব। এই যন্ত্রের নাম দেয়া হয়েছে হোম হাইড্রো-ইলেকট্রিক মিনি প্ল্যান্ট। এতে আছে ছোট্ট জেনারেটর, ওয়াটার টারবাইন, পাইপ ফিটিংস রিং নোজেলস, বাতি, ক্যাপাসিটর, ডায়োড।
মো. সালাউদ্দিন বলেন, শহরের যত বহুতল ভবন আছে এই যন্ত্র স্থাপন করলে অনেক বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।
ঘরকন্যা থেকে সাগরের ট্রলারেও সৌর বিদ্যুৎ: ঘরকন্যা থেকে সাগরের ট্রলার। সব জায়গাতে সৌর বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির (আইইউবি) শিক্ষার্থীরা। সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমেই রান্না করার কনডাকশন কুকিং নামের যন্ত্র তৈরি করেছে তারা। কন্ট্রোলারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে চুলার আঁচও। পাঁচজনের পরিবারে এক কিলোওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এই চুলায় বছরে প্রায় ৬০ হাজার টাকা সাশ্রয় সম্ভব। তবে এটি শুধু দিনের বেলার জন্য। রাতে ব্যবহার করতে চাইলে বাড়তি একটি ব্যাটারির প্রয়োজন হবে।
ছোটো ছোটো জমিতে পানি দেয়ার জন্য সৌর পাম্প কন্ট্রোলার তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে আর পানি বয়ে আনতে হবে না। সাগরে মাছ ধরার ট্রলারেও সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে। এই বিদ্যুৎ দিয়ে ট্রলারের ইঞ্জিন ছাড়া বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো যাবে। যেমন, টেলিভিশন, বাতি, ফ্যান, মোটর ইত্যাদি। একটি ট্রলারে এই যন্ত্র ব্যবহার করে ২০ বছরে ৫০ হাজার টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫০ হাজার ট্রলার আছে।
এ ছাড়াও সৌর ইনভার্টার, ভেহিক্যাল চার্জার, হাই ক্যাপাসিটি চার্জার কন্ট্রোলারসহ মোট ৬টি সৌর বিদ্যুৎ চালিত যন্ত্র তৈরি করেছে আইইউবির শিক্ষার্থীরা।
আইইউবির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ও অধ্যাপক ড. খসরু এম সেলিমের তত্ত্বাবধানে ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা এসব যন্ত্রের আবিষ্কার করেছে।
সাগরের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ: সাগরের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্র তৈরি করেছে সিলেট পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউটের তিন শিক্ষার্থী। যন্ত্রটির নাম দিয়েছে হোম হাইড্রো ইলেকট্রিক মিনি প্ল্যান্ট। প্রকৌশলী মোহম্মদ সালাউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আব্দুল্লাহ তারেক, তামিম বিল্লাহ ফুয়াদ ও রায়হান আলী এই যন্ত্র তৈরি করেছেন।
তারা জানান, সাগরের ঢেউয়ের শক্তিকে মেকানিক্যাল শক্তিতে পরিণত করে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। দুটি ভাসমান ডিভাইসের মাধ্যমে ঢেউ থেকে শক্তি নেয়া হয়। এই শক্তি দিয়েই ঘুরবে টারবাইন। আর তা থেকেই উৎপাদন হবে বিদ্যুৎ। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে ইমপালস টারবাইন।
বিদ্যুৎ দিয়ে থেরাপি: চুম্বকের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থেরাপি দেয়ার যন্ত্র তৈরি করেছে ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তিন শিক্ষার্থী। যন্ত্রটির নাম দিয়েছে তারা ইনফারেড হিট থেরাপি। বিদ্যুৎ মেলায় এই যন্ত্রের প্রদর্শনী করছেন ঈশিতা জাহান, মেহজাবিন রাহমান ও মৌসুমী আক্তার। তারা ইনস্টিটিউটের ইলেক্ট্রো মেডিকেল বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। কিছু চুম্বকের বিকর্ষণে একটি ফ্যান ঘুরবে। ফ্যানটি ঘুরলে যে শক্তি উৎপন্ন হবে তার মাধ্যমে জ্বালানো যাবে একটি বাতি। এই বাতির তাপ দিয়েই দেয়া হবে থেরাপি। তবে এ ক্ষেত্রে বাতিটি হতে হবে ‘আইআর’ বাতি। এই তাপ দিয়ে রোগীর ব্যথার স্থানে তোয়ালে ব্যবহার করে থেরাপি দিতে হবে। খুবই কম খরচে এটি তৈরি করা যায়। ছোটো ছোটো আঘাতজনিত স্থানের ব্যথায় এই যন্ত্র খুবই কার্যকর বলে জানান উদ্ভাবক শিক্ষার্থীরা।
পরিবেশবান্ধব কাঠ এখন বাংলাদেশে: কাঠের গুঁড়া থেকে কাঠ। শক্ত কাঠ। নতুন আর একটি গাছ না কেটেই কাঠের চাহিদা পূরণ। আবার ঘুণ ধরবে না। পানিতে পচবে না। ঋতু পরিবর্তনের সময় কাঠ আঁকাবাঁকাও হবে না। এমনই পরিবেশবান্ধব কাঠ এখন বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে। করছে ওরিয়েন্টাল ইকো উড গ্রুপ।
মিলে কাঠ কাটার পর যে গুঁড়া তা সংগ্রহ করা হয়। গুঁড়াগুলো মেশিনে দিয়ে পাউডারে পরিণত করা হয়। এই পাউডারের সঙ্গে কেমিক্যাল মিশিয়ে তৈরি করা হয় পরিবেশবান্ধব কাঠ। কারখানা থেকেই আবার তৈরি করা হচ্ছে দরজা, বোর্ড এবং টিম্বার টিউব। ইকো উড গ্রুপের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান মো. রেদওয়ান সিদ্দিক জানান, তাদের এই পণ্যগুলোকে তারা উড কম্পোজিট বলছেন। এটি পানিতে পচবে না, ঘুণে ঘরবে না এবং ঋতু পরির্তনের সময় ্আঁকাবাঁকা হবে না। ইকো উড পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের জেনারেটরও বাজারজাত করছে। জাপান থেকে এনে এই জেনারেটর বাংলাদেশে সরবরাহ করছে তারা।