আমূল পাল্টে যাবে বিনিয়োগ পরিবেশ

আঞ্চলিক বৈষম্য কমাবে অর্থনৈতিক অঞ্চল : পবন চৌধুরী

যে উদ্যোক্তা বিনিয়োগের অপেক্ষায় বসে আছে, যারা কর্মসংস্থানের আশায় প্রহর গুনছে তাদের জন্য শিগগিরই খুলছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। সে সুযোগ তৈরি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছে। এরই মধ্যে বেসরকারিভাবে ১২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে বিনিয়োগ পরিবেশ আমূল পাল্টে যাবে বলে জানান বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী। সম্প্রতি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা যাতে এক ছাদের নিচে সব সেবা পায় তার জন্য আইন (ওয়ান স্টপ সার্ভিস) প্রণয়নের কাজ চলছে। এটি চূড়ান্ত হলে উদ্যোক্তারা হয়রানি আর ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে। অস্বচ্ছতা দূর হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিবেশের তালিকায় বাংলাদেশের যে অবস্থান, তার উন্নতি হবে।

অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে আঞ্চভিত্তিক বৈষম্যও কমবে বলে মনে করেন বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যেসব অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে যাচ্ছি, তার প্রায় সবই ঢাকার বাইরে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে ঘিরেই সব পরিকল্পনা। চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি মিরসরাই, আনোয়ারা, ফেনী এবং মোংলা বন্দরের আশাপাশে অনেক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে ওই সব অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাদের চাকরির জন্য ঢাকায় আসতে হবে না। সেসব স্থানে নতুন নতুন টাউন গড়ে উঠবে। এমন সময় আসবে মানুষ ঢাকা থেকে গ্রামে চলে যাবে। এ ছাড়া ঢাকায় আসার যে প্রবণতা, পরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে সেটিও কমে আসবে। এতে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে অভিবাসনের সমস্যা ও আঞ্চলিক বৈষম্য অনেকটাই কমে আসবে।’

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, ‘মানুষকে সেটুকু স্বপ্নই দেখাব, যেটা আমরা করতে পারব। ২০১৮ সালের মধ্যে এ জাতি দেখবে আমরা কী করেছি আর কী করতে চাই। তখন গ্রাম থেকে চাকরির খোঁজে কাউকে শহরে আসতে হবে না। নিজ শহর কিংবা পাশের জেলায় তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এমন দিন আসতে যাচ্ছে, একজন ব্যবসায়ীকে গ্যাস-বিদ্যুতের মতো সেবা পাওয়ার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। একই ছাদের নিচে সব সেবা একসঙ্গে পাওয়া যাবে। বিশ্বব্যাংক প্রতিবছর ব্যবসা পরিবেশের (ডুয়িং বিজনেস) যে তালিকা তৈরি করে, সে তালিকায় বাংলাদেশ তলানিতে পড়ে থাকবে না। ওপরের দিকে থাকবে বাংলাদেশের নাম। চীন, জাপান, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এ দেশে বিনিয়োগের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে।’

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সাম্প্রতিক সফর বাংলাদেশের উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব রাখবে উল্লেখ করে পবন চৌধুরী বলেন, ‘বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চিত্র আমূল পাল্টে যাবে। চীন আগে থেকেই বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা করে আসছে। শি চিনপিংয়ের সফরের মধ্য দিয়ে সেই সহযোগিতার গতি বহুগুণে বাড়বে। বাংলাদেশ উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ গড়ার যে স্বপ্ন দেখছে, তাতে চীনের বড় ধরনের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৭৭৪ একর জমির ওপর চীনের জন্য করা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শুরু করতে শি চিনপিংয়ের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চায়না হারবারের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেছে বেজা। এ চুক্তির ফলে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশাপাশি চীনের অর্থায়নে কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণ, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মিত হলে ওই অঞ্চলের বিনিয়োগ পরিবেশ আমূল বদলে যাবে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ দেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবে। দেশি উদ্যোক্তারাও উদ্বুদ্ধ হবে। এর মাধ্যমে সমৃদ্ধ হবে দেশের অর্থনীতি।

দেশি কিংবা বিদেশি কোনো উদ্যোক্তা শিল্প-কারখানা করতে গেলে তার প্রয়োজন হয় জমি, গ্যাস-বিদ্যুৎ। কিন্তু এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের যে গ্যাস-বিদ্যুতের মতো সেবা পেতে পদে পদে হয়রানির শিকার হয় উদ্যোক্তারা। আগের বিনিয়োগ বোর্ড (এখন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিডা) ব্যবসায়ীদের ওয়ান স্টপ সার্ভিস দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তা কার্যকর ছিল না। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের বিষয়ে পবন চৌধুরী বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের একই ছাদের নিচে সব ধরনের সেবা দিতে আমরা একটা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমরা দেখেছি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ২৬ ধরনের সেবার প্রয়োজন হয়। ব্যবসায়ীরা যাতে এসব সেবা একই ছাদের নিচে পায় সে জন্য আমরা একটি আইনের খসড়া তৈরি করে সেটি প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেছি।’

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের ওপর আস্থা আছে বলেই আবদুল মোনেম, এ কে খান, মেঘনা ও বসুন্ধরা গ্রুপের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারিভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে এগিয়ে আসছে। এখন পর্যন্ত বেসরকারিভাবে ১২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আমান ও মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প-কারখানা স্থাপনের কাজও শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে আরো অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পর্যালোচনা চলছে।’ পবন চৌধুরী বলেন, ভারতের জন্য প্রথমে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও বাগেরহাটের মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও এখন তারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য আরো জমি চায়। সে জন্য দেশটির জন্য নতুন করে মিরসরাই, রামপাল ও খুলনায় তিনটি অর্থনৈতিক অঞ্চল দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া জাপানের জন্য ঢাকার পাশে দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল দেওয়ার কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ করতে এরই মধ্যে চায়না হারবারসহ জাপান, সিঙ্গাপুরের বড় বড় কম্পানিগুলো যোগাযোগ শুরু করেছে।

ভারতে অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জমি অধিগ্রহণের পর দেখা গেছে সেখানে দিনের পর দিন সেসব জমি খালি পড়ে থাকতে। বাংলাদেশেও কি একই অবস্থা তৈরি হবে কি না—এ বিষয়ে পবন চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা এখন থেকেই সচেষ্ট। জমির সুষ্ঠু ব্যবহারে বেজা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবে। কোনো সমস্যা তৈরি হলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে। তা ছাড়া কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবস্থা নেবে বেজা। সে জন্য চট্টগ্রামে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। যেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে।’

অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশেষ কোনো খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে কি না এ বিষয়ে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের এখনো প্রধান খাত হলো পোশাক। যত পণ্য রপ্তানি হয়, তার শতকরা আশি ভাগের ওপরে পোশাক খাত। তাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে এ খাতের অগ্রাধিকার থাকবে। তবে দুই-তিন বছরে নতুন কোনো খাত দাঁড়িয়ে যাবে। তখন সেই খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’

অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে প্রতিবন্ধকতার শিকার প্রসঙ্গে পবন চৌধুরী বলেন, ‘যেকোনো কাজ করতে গেলে ছোটোখাট বাধা থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। তবে নিজ লক্ষ্যে যেতে কাজে লেগে থাকলে আর আন্তরিকতা দিয়ে সব বাধা অতিক্রম করা যায়। আমরা সেটাই করে যাচ্ছি।’

এখন থেকে দুই বছর আগেও সরকারের যে সংস্থাটি (বেজা) ঠিকমতো অফিস ভাড়া দিতে হিমশিম খেত, সেই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি এখন ঢাকা ও চট্টগ্রামে বহুতল ভবন তৈরির স্বপ্ন দেখছে। আয়ের অনেক উৎস তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় বেজা। দুই বছর পর বেজাকে আর কারো দিকে তাকাতে হবে না। হাত পাততে হবে না অন্যের কাছে। বেজা নিজে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবে।