ভার্মি কম্পোস্টে ফিরছে জমির প্রাণ

মেহেপুরের কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো কম্পোস্ট) সার। এ সার ব্যবহারে কাক্সিক্ষত ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি খরচও সাশ্রয় হচ্ছে। অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারে উর্বরা শক্তি কমে যাওয়া জমিতে আবারও প্রাণ ফিরে এসেছে। পরিবেশ ও জমির সুরক্ষায়ও ভার্মি কম্পোস্ট সার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার পল্লী অঞ্চল হোগলবাড়ীয়া গ্রামে ২০১১ সালে সাত কাঠা জমির ওপর ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদনের খামার গড়ে তোলেন আকুবপুর গ্রামের তিন শিক্ষিত যুবক মহির উদ্দীন, সুমন আহম্মেদ ও লেলিন। চাকরির জন্য সময় ব্যয় না করে পরিবেশ রক্ষার ব্রত নিয়েই তারা ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করেন। শুরু থেকেই তারা পেতে থাকেন সাফল্য। ব্যবসার মুনাফা দিয়ে পুঁজি বাড়াতে থাকেন। সাত কাঠা জমির ছোট্ট খামারটি আজ বিশাল পরিসরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ বিঘায়। মাত্র আটটি উৎপাদন হাউসে ১ লাখ কেঁচো দিয়ে শুরু করলেও খামারে এখন হাউসের সংখ্যা ৬৪ আর কেঁচোর সংখ্যা ১ কোটির ওপর। প্রতি মাসে গড় উৎপাদন ৫০ কেজি ওজনের ৪৫০ থেকে ৬০০ বস্তা। প্রতি কেজি সার বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা। সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহারে দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছেন এ এলাকার কৃষক। ওই খামারে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫ বেকার যুবকের।
সার উৎপাদনের বিষয়ে উদ্যোক্তা মহির বলেন, উদ্যোক্তা ও শ্রমিক মিলে বিভিন্ন স্থান থেকে গোবর সংগ্রহ করে তা হাউসে ভরাট করেন। এরপর তার মধ্যে ছেড়ে দেয়া হয় অস্ট্রেলিয়ার রেড-১ জাতের কেঁচো। ওই কেঁচো গোবর খেয়ে যে মল ত্যাগ করে তা-ই উন্নত মানের কম্পোস্ট সার। এসব হাউসে শুধু সার উৎপাদন নয়, কেঁচোও উৎপাদন করা হচ্ছে এবং তা দিয়ে হাউসের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। পাশাপাশি অন্য উদ্যোক্তাদের কাছেও কেঁচো বিক্রি করা হচ্ছে। তাছাড়া তাদের খামারে উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট সার দেশের বিভিন্ন স্থানের কৃষকও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অপর উদ্যোক্তা সুমন জানান, এলাকার দরিদ্র চাষিদের কথা ভেবে ১০ টাকা কেজি দরে ভার্মি কম্পোস্ট সার বিক্রি করা হচ্ছে। এতে মুনাফার পাশাপাশি এলাকার মানুষের জন্য কিছু করতে পারছেন বলে তিনি মনে করেন। এটাই তাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
১৯৯৭ সালে সরকারের এক জরিপে দেশের আবাদি জমিতে জৈব সার ব্যবহার না করার ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। অন্যদিকে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ওই সার আদমানি বৃদ্ধির পাশাপাশি ফসলে নানা রকম রোগ-বালাই দেখা দেয়। তখন থেকেই জৈব সার প্রয়োগে জোর দেয় কৃষি বিভাগ। জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি ও রাসায়নিক সার আমদানি কমাতে ভার্মি কম্পোস্ট সার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
গাংনীর কৃষক জানান, প্রতি বছর নতুন নতুন ফসল উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় রাসায়নিক সার প্রয়োগের মাত্রা বেড়েছে। কিন্তু ঘাটতি ছিল শুধু জৈব সারের। তাই ফলনও হচ্ছিল না আশানুরূপ। নিরুপায় সেই কৃষক ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহার করে মাটির উর্বরা শক্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছেন। এতে খরচও সাশ্রয় হচ্ছে। তাই কৃষকদের কাছে আস্থাভাজন হয়ে উঠেছে ভার্মি কম্পোস্ট সার।
তিন যুবকের এ সফলতায় এলাকার অনেক বেকার যুবক নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। এখান থেকে হাতে-কলমে প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জন করে নিজেরাই গড়ে তুলছেন ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন খামার। নতুন উদ্যোক্তা আকুবপুর গ্রামের শামীম হোসেন মিলনও ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন করে আজ স্বাবলম্বী। প্রবাসে যা আয় করতেন তার চেয়ে অনেক বেশি আয় করছেন বলে জানালেন তিনি। তিন যুবকের সাফল্যে সাধুবাদ জানিয়ে, মাটির প্রাণ ফিরিয়ে আনতে কম্পোস্ট সার প্রয়োগ বৃদ্ধির তাগিদ দিলেন মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক এস এম মোস্তাফিজুর রহমান।