তিন তরুণের কৃষি পর্যটন

কেরানীগঞ্জের কলাতিয়ায় নিজেদের গড়া কৃষি খামারে তিন তরুণ l ছবি: প্রথম আলোএলাকার মুরব্বিরা হেসেছিলেন খুব। ‘বইপড়া পোলাপান’-এর ‘নতুন ধারার’ চাষবাস এলাকায় হাসির ব্যাপার ছিল বেশ কিছুদিন। এখনো দেখা হলে সেই ‘চাচারা’ হাসেন। তবে সেই হাসিতে থাকে ভালোবাসা। কিছুটা গর্বও হয়তো থাকে—এই ছেলেগুলো পেরেছে। সার-কীটনাশকের চাষপদ্ধতি তাঁরা শুরুতেই বাতিল করেছিলেন, তাই বিষমুক্ত উপায়ে ফলানো রঙিন ফল-ফসল আজ খামার আলো করে আছে।

মাটির কাছে ফিরে যাওয়া তিন তরুণ কামরুল হাসান (৩০), মাহফুজ রশীদ (২৮) আর মহিউদ্দিনের (৩৩) গল্প এটি। গল্পটি তাঁদের বিষমুক্ত খামার ‘গ্রিনারি অ্যাগ্রো’র।

ফেসবুকের পাতায় ভেসে বেড়াচ্ছিল একটা সবুজ খেতের ছবি। ক্যাপশনে লেখা, ‘এখানে মানুষ কম সবুজ বেশি/ এখানে মানুষ কম পৃথিবী বেশি।’ নিজেদের খামারে তোলা ছবিটা শেয়ার করেছিলেন পেশাদার আলোকচিত্রী কামরুল হাসান। ফেসবুক প্রোফাইলে যাঁর পেশার ঘরে এখন লেখা আছে ‘ফার্মিং’ বা কৃষিকাজ। কামরুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর নিমন্ত্রণে যাওয়া হলো কেরানীগঞ্জের কলাতিয়ায়, তাঁদের খামারে। হিজলতলায় বসে শোনা হলো তাঁদের কথা।

বছর পাঁচ-ছয় আগে চিন্তাটা প্রথম কামরুলের মনেই আসে। তাঁর কথায়, ‘ছোট থেকেই হাসপাতালে অনেক সময় কাটাইছি। হাসপাতালে আত্মীয়দের ডিউটি দিতাম। হাসপাতালে থাকার কষ্ট, রোগীদের কষ্টটা খুব কাছ থেকে দেখছি। তখন থেকেই মনে হইতো এই দেশে থাকলে অসুস্থ হওয়া যাবে না। দূষিত হাওয়ায় শ্বাস নেওয়া যাবে না।’

অনেক ভাবনাচিন্তার পর কামরুলের মনে হলো, যদি নিজের হাতে উৎপাদন করা যায়, তবে সেই খাদ্য হবে সবচেয়ে নিরাপদ। এলাকার বন্ধু মাহফুজ রশীদকে বললেন তাঁর মনের কথা। মাহফুজ সায় দিলেন, তবে কাজ এগোল না।

গত বছর হুট করে সুযোগ এল। এক প্রতিবেশীর পুকুরপাড়ে এক ফালি জমি চেয়ে নিয়ে ৩০টি পেঁপেগাছ লাগালেন দুজনে। ৩০টি পেঁপেগাছ নিয়ে শুরু হওয়া খামার এখন ছয় একরে এসে দাঁড়িয়েছে।

তবে একদিনে হয়নি কিছু। কামরুল আর মাহফুজ তাঁদের পরিচিত বড় ভাই রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মহিউদ্দিনকে জানালেন তাঁদের পরিকল্পনার কথা। সব শুনে মহিউদ্দিনও যোগ দিলেন তাঁদের দলে। সেই প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধাপে ধাপে ইজারা নিলেন ছয় একর জমি। মহিউদ্দিন এখন গ্রিনারি অ্যাগ্রোর পরিচালক। বিপণন আর বিক্রয় অংশের দায়িত্ব কামরুলের, সঙ্গে মাঠের কাজেও হাত লাগান। আর খামারের পুরো কাজ সামলান মাহফুজ।

মাঠ আর চারটি পুকুর নিয়ে খামার। আগে মাহফুজ-কামরুল মিলেই চাষ করতেন। এখন তাঁদের সঙ্গে দুই শ্রমিক কাজ করেন। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চাষাবাদ চলে। মাঠে বসেই চলে দুপুরের খাওয়া।

শিখলেন কোথায় এসব?

কামরুল-মাহফুজ বলেন, বই পড়ে আর ইন্টারনেটে দেখে তাঁদের কৃষিতে হাতেখড়ি। এ ছাড়া এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ওডিশার কৃষি বিশেষজ্ঞ দেবাল দেবের পরামর্শ নিয়েছেন। এলাকার কৃষি কর্মকর্তারাও নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন বলে জানালেন মাহফুজ।

গ্রিনারি অ্যাগ্রোর লক্ষ্য হচ্ছে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন করা এবং বিষমুক্ত চাষে অন্যদের উৎসাহিত করা। তাঁদের স্লোগান ‘বাই লোকাল, ইট ফ্রেশ’।

চাষের পদ্ধতি নিয়ে বললেন মহিউদ্দিন। অর্গানিক বা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষ হয় তাঁদের খামারে। এই খামারে সার হলো গোবর আর পচা পাতা। কীটনাশক নেই। আছে নিমপাতা, আতাফল পাতা ছেঁচে তৈরি ‘বালাইনাশক’। খুঁজেপেতে দেশি বীজ সংগ্রহ করে আনেন তাঁরা, অথবা নিজেরা বীজ তৈরি করেন। মহিউদ্দিন বললেন, ‘অর্গানিক ফার্মিং তো কোনো নতুন পদ্ধতি না। এটাই প্রাচীন পদ্ধতি। আগে তো আর রাসায়নিক সার ছিল না। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ হতো।’ তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে স্বল্পভাষী মাহফুজ। একটা বেগুনগাছ দেখিয়ে বললেন, ‘এই দেখেন দেশি বেগুন। গোড়ায় শুধু একটু গোবর দিছিলাম। ফল দিয়েই যাচ্ছে।’

—নিজেরা তো ফিরলেন মাটির কাছে, প্রাকৃতিক চাষবাসে, কিন্তু অন্যদের কী হবে? তাঁরা কী করে পাবেন বিষমুক্ত খাবার?

তিন বন্ধুর উত্তর, বিষমুক্ত ফসল পেতে তাঁদেরও মাটির কাছে আসতে হবে। আর কোনো পথ নেই।

—মানে?

খোলাসা করলেন মহিউদ্দিন। কোনো দোকান বা সরবরাহসেবা নেই তাঁদের। মাঠের ফসল পেতে শর্ত হলো মাঠে এসেই নিতে হবে। গ্রিনারি অ্যাগ্রোর এই আয়োজনের নাম ‘গ্রিনারি অ্যাগ্রিকালচার ট্যুরিজম’। ‘অ্যাগ্রি’ আর ‘কালচার’ শব্দ দুটি আলাদা। কামরুল বললেন, ‘কৃষি তো একটা সংস্কৃতি। কৃষকের জীবনযাত্রা, কাজের পদ্ধতি, মোটকথা বাংলার কৃষিসংস্কৃতি নিয়ে এই পর্যটন। আমরা চাই মানুষ এসে দেখুক তাদের খাবারটা কোন মাটিতে ফলে, কারা সেটা চাষ করে, কীভাবে করে।’

গ্রিনারির এই আয়োজনে দর্শনার্থীরা সারা দিন খামারে কাটাবেন। খামারের পুকুরে ডুব দিয়ে এসে খামারে ফলানো সবজি আর মাছ দিয়ে হিজলতলায় বসে ভাত খাবেন। ফিরে যাওয়ার সময় সবজি-ফল-মাছ নিজ হাতে তুলে নিতে পারবেন। চলতি বছর থেকেই কৃষি-পর্যটনের এ আয়োজন শুরু হয়েছে। এই অল্প সময়ে প্রায় ৪৫০ জন অতিথি খামারে ঘুরে গেছেন। সঙ্গে নিয়ে গেছেন বিষমুক্ত খাবার। ফিরে আসার সময় হঠাৎ শোনা গেল ঘুঘুর ডাক। মাহফুজ বললেন, প্রাকৃতিক চাষের কারণে তাঁদের খামারে ফিঙে, ঘুঘু, পানকৌড়ি, মাছরাঙা ফিরে এসেছে। পুকুরে বাসা বেঁধেছে আট জোড়া ডাহুক। চুপচাপ কান পাতলেই তাদের সাড়া পাওয়া যায়।