পাট খাতে সম্ভাবনার দ্বার খুলছে

জীবনরহস্য উন্মোচনের পর সোনালী দিনের অপেক্ষায় দেশের পাট খাত। পাশাপাশি আগামীতে ইউরোপের বাজারে নিষিদ্ধ হচ্ছে সিনথেটিক পণ্য। দু’মিলে বাংলাদেশের জন্য নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। এর মধ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে পাটপণ্যের ওপর নগদ সহায়তা বাড়ানোর। একদশক পরে তৈরি হচ্ছে পাটনীতিও। পাশাপাশি সংস্কারের আওতায় আসছে জুটমিল কর্পোরেশন। ফলে পাট খাতে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। সার্বিকভাবে এ খাতে বিনিয়োগও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পাটপণ্য রফতানি বাড়াতে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। রফতানি বাড়লে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির পথ প্রশস্ত হবে।

জানা গেছে, দেশে মোট কাঁচাপাটের উৎপাদনের পরিমাণ হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ লাখ বেল। অভ্যন্তরীণ চাহিদা হচ্ছে ৬৩ লাখ বেল। যা মোট উৎপাদনের ৭৫ শতাংশ। পাশাপাশি বিদেশে কাঁচাপাট রফতানি হচ্ছে বছরে ১২ লাখ বেল। অবশিষ্ট ৭ থেকে ১০ লাখ বেল ব্যবহার হচ্ছে গৃহস্থালি কাজে।

সূত্র মতে, বিশ্বে পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার ৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের। এর মধ্যে চীনের দখলে অধিকাংশ বাজার থাকলেও বাংলাদেশের অবস্থান আছে ছোট আকারে। তবে ২০১৮ সালে ইউরোপের বাজারে সিনথেটিক পণ্য নিষিদ্ধ হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী বাড়ছে বায়োডাইবারফিকেশন ব্যাগ ও পণ্যের চাহিদা। যা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

জানা গেছে, এসব বিষয় সামনে রেখে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বৈঠকও হয়েছে। ওই বৈঠকে পাটপণ্য বিশেষ করে হেসিয়ান, সেকিং ও সিবিসি এবং পাট সুতার ওপর ভর্তুকি প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কৃষকের কাছ থেকে জোনভিত্তিক পাট কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচাপাট কেনার জন্য ৫৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। খুব শিগ্গিরই এ অর্থ ছাড় করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, ২০১৩ সালে দেশীয় পাটের জন্মরহস্য আবিষ্কার করেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। ফলে জীবাণু প্রতিরোধক পাট উৎপাদন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশী পাট দিয়ে বস্ত্রশিল্পের উপযোগী সুতা উৎপাদন করাও সম্ভব হবে। ২০১৮ সালের মধ্যে সুফল পাওয়া যাবে।

সূত্র মতে, পাট খাতে এখন বেশ সাড়া মিলেছে। এ জন্য প্রায় একদশক পরে নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। এই নীতিতে বন্ধ হওয়া সরকারি পাটকলগুলো ক্রমান্বয়ে চালুর ব্যবস্থা করা হবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই তা করা হচ্ছে। খসড়া নীতিমালায় সরকারের এ ধরনের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরা হচ্ছে। সেখানে আরও উল্লেখ্য করা হয়, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার এবং পাটপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে আইনগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। পাট বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় বিএডিসির সক্ষমতা বাড়ানো, পাটচাষীদের অর্থ সংকট লাঘবে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, বিক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে পাটচাষীরা অর্থ পেয়ে যান- এসব বিষয় খসড়া পাটনীতিতে স্পষ্ট করে তুলে ধরা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জন্মরহস্য আবিষ্কার হওয়ায় পাটের সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। বিশ্ববাজারেও পাটপণ্যের চাহিদা রয়েছে। ফলে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এ খাতে বিনিয়োগ জরুরি। তিনি বলেন, এ খাতে গবেষণা আরও বাড়াতে হবে।

বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, আইভোরিকোষ্ট, ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, জার্মানি, স্পেন, ইংল্যান্ড, মিসর, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের কাঁচাপাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। দেশের ভেতরেও পাটজাত পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে বেসরকারি পাটকলগুলো।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি এ খাতে সমস্যাও কম নেই। উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার, দক্ষ শ্রমিক, পণ্য বৈচিত্র্যকরণ ও বিপণন কৌশলের অভাব রয়েছে পাট শিল্পে। সহযোগিতাও নেই পাট গবেষণায়। এসব দিকে এখনই নজর না দিলে বিশ্ববাজারে অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। এ খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে এ খাত ছাড়িয়ে যেতে পারে তৈরি পোশাক শিল্পকে। এ জন্য গুরুত্ব দিতে হবে বীজ উৎপাদনে। কারণ মানসম্মত বীজের অভাব রয়েছে।

জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে সাড়ে ১২শ’ টন উৎপাদন হলেও পাট বীজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ হাজার টন। ফলে ভারত বা চীন থেকে প্রতিবছর বীজ আমদানিতে চলে যাচ্ছে বড় অংকের অর্থ। তবে পাট খাতে সরকারি বিনিয়োগে অসন্তোষ অবস্থানে রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ সংস্থার মতে, অদক্ষতা, লুটপাট, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে লোকসানি মিলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে নতুন করে পাটের পুনঃজাগরণের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে প–নরায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।