গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করতে ১০৫ কোটি টাকার প্রকল্প

গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য উপজেলা পর্যায়ে নারীদের জন্য আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৫ কোটি ৬৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর ৭ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সুপারিশ অনুযায়ী প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রকল্পটি সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কেননা প্রকল্পটি সরকারের উন্নয়ন নীতির আওতায় দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচিতে বাংলাদেশের দরিদ্র নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন তথা দেশের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এতে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
নারী উন্নয়নের পথে যে ১২টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয় তার শীর্ষে আছে দারিদ্র্য। এটি নারী উন্নয়নের প্রধান বাধা। বাংলাদেশ বিগত কয়েক দশকে নারীর দারিদ্র্য দূর করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আইনি সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর প্রবেশাধিকার ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, শ্রমবাজারের সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণের হার বৃদ্ধি করে কৃষি খাত ও অন্যান্য চাকরিতে নারীকে অধিক মাত্রায় আকৃষ্ট করা, নারী উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ঋণ সুবিধা প্রদান করে মাঝারি ও কুটির শিল্পে নারী উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ, বাজেটে নারীর জন্য পৃথকভাবে সামাজিক নিরাপত্তার (আর্থিক) ব্যবস্থা করা, নারীর আয়বৃদ্ধি সংক্রান্ত নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে। আরেকটি যে অগ্রগতি হয়েছে তা হলো সরকারের জেন্ডার সংবেদনশীল বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন। এতসব ইতিবাচক কর্মসূচির ফলে নারী অর্থকরী কাজে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ফলে সরকারি পর্যায়েও বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে নারীদের জন্য আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।
১ লাখ ১৫ হাজার ২০ নারীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে ১০৫ কোটি ৬৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এবং ২০১৬ জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
মহিলা অধিদফতরের মহাপরিচালক সাহিন আহমেদ চৌধুরী এ সম্পর্কে বলেন, মূলত নারীদের কর্মক্ষম করা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যই এ কার্যক্রম হাতে নেয়া হচ্ছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেলে ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে মহিলাবিষয়ক অধিদফতর। এরই মধ্যে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াকরণ শেষ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
দেশের ৪২৬ উপজেলায় প্রতি বছর তিনটি ব্যাচে, প্রতি ব্যাচে ৩০ জন করে চার মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। যেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে তার মধ্যে রয়েছে টেইলারিং, ব্লক বাটিক, সেমাই প্রস্তুতকরণ, বিউটিফিকেশন, ক্রিস্টাল, শোপিস তৈরি, শতরঞ্জি তৈরি, প্যাকেট তৈরি, মোমবাতি তৈরি, বেসিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ওভেন সিউইং মেশিন প্রশিক্ষণ, স্কার্ফ ও টুপি তৈরি প্রশিক্ষণ, ফ্যাশন ডিজাইন প্রশিক্ষণ, ট্যুরিস্ট গাইড প্রশিক্ষণ, মাশরুম ও মৌচাষ প্রশিক্ষণ, উলের পোশাক তৈরি প্রশিক্ষণ, সেলসম্যানশিপ প্রশিক্ষণ, মোবাইল সার্ভিসিং অ্যান্ড রিপেয়ারিং প্রশিক্ষণ, হাউসকিপিং প্রশিক্ষণ, ফ্রন্টডেস্ক ম্যানেজমেন্ট।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১ লাখ ১৫ হাজার ২০ নারীকে আয়বর্ধক কর্মকা-ের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। প্রকল্পটি নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের ৬৪টি জেলা অফিস তৃণমূল পর্যায়ের অনগ্রসর শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত গরিব নারীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে থাকে। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। ফলে উপজেলা পর্যায়ের বিরাট সংখ্যক গরিব নারী বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ হতে বঞ্চিত হচ্ছেন। বর্তমানে মহিলাবিষয়ক অধিদফতর আত্মকর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে অনগ্রসর নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।