মাঠে মাঠে ফসলের হাসি

কার্তিক মাস চলছে। এ মাস এলেই বৃহত্তর রংপুরবাসীর মনে পড়ে মঙ্গার কথা। এ মাসকে এলাকার মানুষ এক সময় মরা কার্তিক, খরা কার্তিক, অভাবের কার্তিক ও অশুভ কার্তিকসহ নানা নামে অভিহিত করত। কিন্তু এখন সবই অতীত। মরা কার্তিক এখন ভরা কার্তিকে পরিণত হয়েছে। এখন মঙ্গাপিড়িত গোটা উত্তারাঞ্চলের দৃশ্যপটই বদলে গেছে। ধু-ধু বালুর বুকে এখন শুধু সবুজ আর সবুজÑ যেন হাসছে ফসলের মাঠ।
মঙ্গা দূর করতে সরকার কয়েক বছর ধরে খরাসহিঞ্চু ধান উদ্ভাবন, মাটিভেদে রবি ফসল ও শাকসবজি উদ্ভাবনসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৭ থেকে ৮ বছর আগেও এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় আশ্বিন-কার্তিক মাস চরম অভাবের মাস নামে পরিচিত ছিল। শ্রমিকের হাতে কাজ থাকত না। এ অবস্থায় অভাবী মানুষরা জীবিকা নির্বাহ করার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়াত। এছাড়া আগাম শ্রম বিক্রিসহ বাড়ির হাঁস-মুরগি, গাছপালা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত তারা। এক পর্যায়ে কচুঘেচু, ভেট, শাপলা রান্না করে খেয়ে জীবনধারণ করত। এখন এ অঞ্চলের মাটির গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করে গম, ভুট্টা, বাদাম, আলু, আদা ও নানারকম শাকসবজি চাষ করার নির্দেশনা দিচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। সে অনুযায়ী এলাকার চাষিরা চাষাবাদ করছেন। এছাড়া নদীতে ঘের দিয়ে অনেকে মাছ চাষ করছেন। এগুলোয় ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন স্থানীয় কৃষক। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের সবজি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোঃ হামিদুর রহমান উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা দূরীকরণ প্রসঙ্গে আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা, কৃষি উপকরণের ওপর ভর্তুকি ও গবেষণালব্ধ নতুন প্রযুক্তি মাঠে আনার কারণে উৎপাদন অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে পাঁচ জেলায় ছয় জাতের উচ্চফলনশীল আমন ধান চাষে কৃষকের ভাগ্য ফিরেছে। স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল এ ধানের জাতগুলো হলো ব্রি-৩৩, ব্রি-৩৯, ব্রি-৫৬, ব্রি-৫৭, ব্রি-৬২ ও বিনা-৭। এছাড়া এ অঞ্চলে আগে কোনো শাকসবজিও উৎপাদন হতো না। বর্তমানে সরকারের সহায়তায় অল্প দামে কৃষকের মাঝে গুণগত মানসম্পন্ন সবজিবীজ, ভুট্টা ও রবিশস্যের বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব এলাকায় এখন জমিতে তিনটি ফসল উৎপাদন হচ্ছে। যেমন আমন কেটে আলু, আলু তুলে ভুট্টা বা পাট, পাট কেটে আবার ধান বা অন্য ফসল করছে। এসব কারণেই এলাকার মঙ্গা দূর হয়েছে।
রংপুর সংবাদদাতা জানান, রংপুর তথা উত্তর অঞ্চলে একসময় জমিতে ভালোভাবে ফসল হতো না। বর্তমানে ওই জমিতে বছরে তিন রকম ফসল উৎপাদন সম্ভব। রংপুর কৃষি সম্প্রাসারণ বিভাগের উপপরিচালক আশরাফ আলী বলেন, কৃষক খালি জমি রাখছেন না। একটি ফসল ওঠামাত্র আরেকটি ফসল লাগাচ্ছেন। এছাড়া সরকারের সাহায্য পাওয়ায় রংপুর থেকে অভাব বিদায় নিয়েছে।
রংপুরের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার বলেন, রংপুর মঙ্গা এলাকাÑ এটা এখন পুরনো কথা। এখন রংপুরে মঙ্গা নেই। নদী ও চর এলাকা ছাড়া বাকি এলাকায় অভাব নেই বললেই চলে।
গাইবান্ধা সংবাদদাতা জানান, জেলা সদরসহ সাতটি উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। বিভিন্ন জাতের ধানসহ নানা সবজি চাষে ব্যাপক বিপ্লব ঘটিয়েছে এ দরিদ্র জনগোষ্ঠী। কৃষি বিভাগের পরামর্শক্রমে ২ থেকে ৩ বছর আগে মঙ্গা ঠেকাতে দরিদ্র মানুষ আগাম ব্রি ধানসহ শাকসবজি উৎপাদনে ঝোঁকে। আলু, পটোল, মরিচ, বেগুন, লাউ, বরবটি, করলাসহ বিভিন্ন জাতের সবজিতে মাঠ এখন পরিপূর্ণ। গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষ এখন আর বসে নেই।
গাইবান্ধা জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক আ ক ম রুহুল আমিন জানান, কৃষকের আপ্রাণ চেষ্টা এবং আমাদের সার্বিক সহায়তায় এ সফলতা অর্জিত হয়েছে।
নীলফামারী সংবাদদাতা জানান, নীলফামারী অঞ্চলে মঙ্গার সময় যেখানে ৪০ টাকা দিয়ে কৃষি শ্রমিক মিলত, সেখানে আজ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। ফসল কাটার মৌসুম হলে তো অবস্থাপন্ন গৃহস্থ কৃষক শ্রমিকের হাত ধরতে শুধু বাকি রাখে। এ রকম একটা অবস্থা বিরাজ করছে।
নীলফামারী সরকারি কলেজের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক মোঃ মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন নতুন উচ্চফলনশীল ফসল উন্নয়ন আর তার সঙ্গে কৃষি উৎপাদনে বৈচিত্র্য নিয়ে আসার কারণে খাবারের সমস্যার সমাধান হয়েছে উত্তরবঙ্গে। একফসলি জমি তিনফসলি পর্যন্ত হয়েছে। আউশের জায়গায় বোরো ধান ফলন উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ।
জেলা পরিষদ প্রশাসক মমতাজুল ইসলাম বলেন, সরকারের কাজের বিনিময়ে খাদ্য, টাকার বিনিময়ে খাদ্য, ওএমএস, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (এনজিও) স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ, দেশি ও বহুজাতিক এনজিওগুলোর শিক্ষা চিকিৎসা ও স্যানিটেশনে কাজ করার ফলেও নীলফামারীর এ আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে।
কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা পরিত্যক্ত ধু-ধু বালুচর। সেই বালুচরে সবুজায়নের যুদ্ধে নেমেছেন চরের চাষিরা। ধু-ধু বালুচরে কুমড়া, ভুট্টা, চীনাবাদাম, তরমুজ ও বাদাম চাষ করে বদলে গেছে এসব নদীপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান।
কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোঃ মকবুল হোসেন জানান, এখন কুড়িগ্রাম জেলা মঙ্গামুক্ত। কারণ এ জেলার মানুষ এখন ফসল উৎপাদনে অনেক এগিয়ে গেছে। কৃষকের উৎপাদন ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন যেসব শ্রমিক, তারা এখন আর বেকার থাকেন না। কাজ করে বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করছেন। তিনি আরও জানান, স্বল্পমেয়াদি ফসল উৎপাদন করে এ জেলার খাদ্য উদ্বৃত্ত হচ্ছে।
লালমনিরহাট সংবাদদাতা জানান, আগাম জাতের বিভিন্ন ধান আর শীতকালীন নানা সবজি চাষে বর্তমান প্রেক্ষাপট বদলে গেছে অনেকখানি। যে অঞ্চলে সবজি উৎপাদন হতো না, সে অঞ্চলে মাত্র ৩০ শতাংশ জমিতে বেগুনের চাষ করে লাখ টাকার অঙ্ক কষে আসছেন সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের ফুলগাছ গ্রামের মোবারক হোসেন। একই জমিতে বেগুনের পাশাপাশি অন্যান্য শাকসবজি চাষ করে পরিবারের চাহিদা মেটান তিনি। মোবারক হোসেনের মতোই হাজার হাজার কৃষক সবজি চাষ করেই এ অঞ্চলের চিত্র পাল্টে দিয়েছেন।
লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এসে হামিদ বাবু আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, নানারকম শাকসবজি আর আগাম জাতের ধান চাষ পাল্টে দিয়েছে মঙ্গা শব্দটি।