স্বাস্থ্য সেক্টরে সরকারের সাফল্য

লেখক : আ ব ম ফারুক, অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে। খাদ্য ঘাটতির দেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর করেছে। দারিদ্র্য কমিয়েছে। অর্থনীতিকে গতি দিয়েছে। দরিদ্র নিম্নœ আয়ের দেশকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করেছে। অসংখ্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে। নারীর ক্ষমতায়ন ঘটিয়েছে। শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়েছে। স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ কথা দিয়ে কথা রেখেছে।

ইতিহাসের পাতা থেকে দেখতে পাই আওয়ামী লীগ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসূচী ঠিক করে এবং সেভাবে এগিয়ে যায়। এই দল সেই ১৯৬৪ সালেই সম্মেলনে ঘোষণা করেছিল যে, তারা ক্ষমতায় গেলে এমন একটি অর্থনীতি চালু করবে যেখানে মানুষ, বিশেষ করে গরিব মানুষে খাদ্য-শিক্ষা-বাসস্থান-চিকিৎসাসহ বাঁচার পরিবেশ পাবে। তারা সে কথা রেখেছে।

আওয়ামী লীগ ১৯৬৪ সালেই বলেছিল যে, যমুনার ওপর সেতু করে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করা হবে। ফলে সেই এলাকার মানুষের যাতায়াতের কষ্ট কমবে, অর্থনীতিও গতি পাবে। আজ যমুনা সেতুর পর আওয়ামী লীগ এখন বিশ্ব মোড়লদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজেদের উদ্যোগে পদ্মা সেতুও নির্মাণ করছে। আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালেই বলেছিল যে, শিক্ষা হচ্ছে মানুষের অধিকার এবং তারা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকে বিনামূল্য করবে। এ ছাড়া গরিব পরিবারগুলোর জন্য শিক্ষা সহায়তা প্রদান করা হবে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতির চাইতেও বেশি করেছে।

আওয়ামী লীগের অর্জন বহু। এ অর্জনগুলোর বিভিন্ন দিক নিয়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ আলোচনা করছেন। এখানে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অর্জনগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় যেতে চাই।

স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন দেশটির হাল ধরলেন তখন সারাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল বেহাল। তিনি গরিব মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করেন। তখন মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে চিকিৎসক হওয়ার আগ্রহ থাকলেও পাস করার পর তাদের চাকরির নিশ্চয়তা ছিল না। বঙ্গবন্ধু চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে সব মেডিক্যাল কলেজে মেধাবীদের ভর্তির ব্যবস্থা করেন। চিকিৎসকরা তখন সরকারী চাকরিতে ১ম শ্রেণীর মর্যাদা পেতেন না। বঙ্গবন্ধু চিকিৎসকদের ১ম শ্রেণীর মর্যাদা দিলেন। ধর্মরাষ্ট্রের স্লোগান দিয়ে পাকিস্তান গঠিত হলেও বিভিন্নরকম জুয়া খেলা, মদ খাওয়া আর তথাকথিত প্রিন্সেসদের দিয়ে ক্যাবারে নৃত্যের নামে অশ্লীলতা চরমে ছিল। তিনি রেসকোর্স মাঠের ঘোড়দৌড়সহ সব ধরনের জুয়া খেলা ও মদ খাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন। বড়লোকদের আপত্তি না শুনে মদ, ক্যাবারে আর জুয়ার আসরের মধ্যমণি শাহবাগ হোটেল বন্ধ করে দিয়ে সেটিকে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এ্যান্ড রিসার্চ ও হাসপাতালে (পিজি হাসপাতাল) রূপান্তরিত করেন। দেশের একমাত্র কলেরা হাসপাতাল ও আইসিডিডিআরবিকে সাংগঠনিক রূপ দেন। ম্যালেরিয়ার বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য আলাদা হাসপাতাল স্থাপন করেন। তখন সারাদেশে হাসপাতাল ছিল মাত্র ৬৭টি। তিনি সরকারী চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রতি থানায় একটি করে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত এভাবে সারাদেশে ৩৭৫টি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতাল নির্মাণ করেন। এসব হাসপাতালের প্রতিটির শয্যাসংখ্যা ছিল ৩১।

শুধু চিকিৎসক ও হাসপাতালই নয়, বঙ্গবন্ধু গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধের দিকেও নজর দিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নুরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেন, যার লক্ষ্য ছিল ক্ষতিকর, অপ্রয়োজনীয় ও বেশি দামী ওষুধ আমদানি বন্ধ এবং ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা। ক্ষতিকর বিধায় তিনি অনেক ওষুধ বাতিল করেছিলেন। সেইসঙ্গে তিনি ওষুধের উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ওষুধ প্রশাসন পরিদফতর গঠন করেন। বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলো কর্তৃক মামলা করার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি ওষুধের পেটেন্ট আইন না মানার ঘোষণা দেন। ফলে মানুষ কম দামে ওষুধ খেতে পারত, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। এভাবে তিনি পূর্ণাঙ্গ না হলেও ওষুধ নিয়ন্ত্রণে একটি নীতিমালা তৈরি করেছিলেন, যাকে বাংলাদেশের প্রথম ছায়া ওষুধনীতি বলা যেতে পারে। ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়নের সময় বিশেষজ্ঞ কমিটি বঙ্গবন্ধুর এসব নীতিমালাকেই ভিত্তি হিসেবে অনুসরণ করেছিল।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে পাকিস্তানী আমলের নৈরাজ্য পুনরায় ফিরে আসে। এমনকি ১৯৮২ সালের ওষুধনীতিরও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও মূল্য সংক্রান্ত নিয়মের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটানো হয় ১৯৯৪ সালে বিএনপির শাসনামলে। আক্ষরিক অর্থেই স্বাস্থ্য খাতের জনবান্ধব নীতিমালা থেকে সরকার সরে আসে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এলে স্বাস্থ্য খাত পুনরায় জনবান্ধব হতে থাকে। তিনি স্বাস্থ্যকে গণমুখী ও জনবান্ধব করার জন্য ১৯৯৮ সালে দরিদ্র মানুষের প্রতি লক্ষ্য রেখে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচীকে একত্র করার ফলে সেবা পাওয়া আরও সহজ হয়। তিনি আইপিজিএমআরকে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করেন এবং হাসপাতালকে উন্নততর সেবায় সজ্জিত করেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালগুলোকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। ফলে বিশেষত গরিব মানুষ উন্নত সেবা পেতে থাকে। প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য ১টি করে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন শুরু করেন, যা ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে বন্ধ করে দেয়।

বঙ্গবন্ধুকন্যা ২০০৯ সালে পুনরায় সরকারে আসার পর গরিব মানুষের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন কাজ পুনরায় চালু করেন এবং এ পর্যন্ত সারাদেশে মোট ১৩ হাজার ৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিক, যেগুলোতে ৩১টি ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে সরকারী ৩০ ও ৭৪টি বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে, যেগুলোর শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সরকারী ও বেসরকারী সব মেডিক্যাল কলেজের সিলেবাসকে উন্নত এবং একমুখী করেছেন। এভাবে প্রতি বছর সারাদেশে ১০ হাজার চিকিৎসক স্বাস্থ্যসেবায় যোগ দিতে পারবেন। সব জেলা হাসপাতালকে তিনি ২৫০ শয্যা, যেগুলো ২৫০ শয্যার ছিল সেগুলোকে ৫০০ শয্যা এবং ৫০০ শয্যার হাসপাতালকে এক হাজার শয্যায় রূপান্তরিত করেছেন। কিছু সমস্যা সত্ত্বেও সরকারী হাসপাতালগুলো এখনও গরিব মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার জায়গা। বিষয়টি মাথায় রেখে তিনি এসব করেছেন। সেইসঙ্গে তিনি সব সরকারী হাসপাতালে রোগীপ্রতি খাবারের বরাদ্দ দ্বিগুণ করে দিয়েছেন। এ ছাড়া নতুন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৩৬টি। দেশে এই প্রথম জেলা হাসপাতালগুলোতে কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শহরের নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তদের জন্য নতুন হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া উন্নত বিশ্বের মতো নতুন বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছেন। প্রত্যন্ত গ্রামের হাসপাতাল থেকে ভিডিও কনফারেন্স করে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’ প্রকল্পে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে গ্রামের রোগীরাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। রোগীরা এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে কম যাচ্ছে এবং জটিল ও দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা দেশেই গ্রহণ করতে শুরু করেছে।

আগে যেখানে শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৫ শয্যার একটিমাত্র বার্ন ইউনিট ছিল এখন সেখানে আলাদা ভবনে উন্নত ও সম্প্রসারিত বার্ন ইউনিট করা হয়েছে। এখন আলাদা একটি ইনস্টিটিউট করে বরাদ্দ করা বড় জায়গায় বিশাল আকারের বার্ন হাসপাতাল নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি সরকারী ও বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং জেলা হাসপাতালে বার্ন ইউনিট খোলা হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হচ্ছে। নার্সদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী তাদের সরকারী ২য় শ্রেণীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে।

এরকম আরও বিভিন্ন জনবান্ধব ও গরিব মানুষমুখী কাজের ফলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আজ তৃতীয় বিশ্বের রোল মডেলে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অনেক ইতিবাচক ফল পাওয়া গিয়েছে। নবজাতক মৃত্যুর হার বর্তমানে প্রতি হাজারে ২৪ এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার বর্তমানে প্রতি হাজারে ৩১ জনে নেমে এসেছে। মাতৃ মৃত্যুর হার বর্তমানে প্রতি হাজারে ১.৮১। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচী, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের সফলতায় বাংলাদেশ বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। কালাজ্বরে মৃত্যুর হার এখন শূন্য। যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসায় সফলতার হার এখন ৯৪%। এইচআইভির বিস্তার থামানো গেছে। ২০১১ সালে বার্ড ফ্লু প্রতিহত করা হয়েছে। হেপাটাইটিস-বি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, মামস্ ও রুবেলার টিকা এখন সরকারী টিকা কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশকে এখন পোলিওমুক্ত রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০১ সালেই বাংলাদেশকে পোলিওমুক্ত করেছিল। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মৌলবাদীদের বাধা দেয়ার কারণে দেশ এক্ষেত্রে আবার পিছিয়ে গিয়েছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কারণে এখন দুর্ভিক্ষ আর মঙ্গা দেশে নেই। মানুষের সচ্ছলতা বেড়েছে। ফলে মানুষের গড়পড়তা ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে। বিভিন্ন হিসেবে ক্যালরি গ্রহণের সর্বনি¤œ পরিমাণ ২১০০ থেকে সর্বোচ্চ ২৬৪০ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা গড়ে ২২০০ ক্যালরি অনায়াসেই ধরে নেয়া যায়। ফলে মানুষের কর্মক্ষমতা বেড়েছে। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের উন্নতির ফলে গড় আয়ু বেড়ে ৭১.২ বছর হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের এতসব সাফল্যের কারণে জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্র্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের দু’বছর আগেই অর্জন করে ফেলেছে। যার ফলে সরকারের প্রধানমন্ত্রী এমডিজি এ্যাওয়ার্ড ২০১০, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তির সফল প্রয়োগের জন্য সাউথ-সাউথ এ্যাওয়ার্ড ২০১১-সহ বেশকিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন।

ওষুধের মানসম্মত উৎপাদন ও দেশকে ওষুধে স্বনির্ভর করার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে ওষুধ প্রশাসন পরিদফতর গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে একে অধিদফতর করেছেন। এখন দেশের বার্ষিক চাহিদার ৯৮% ওষুধ দেশেই উৎপাদন হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এখন বাংলাদেশের ওষুধ মোট ১২৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে। স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত বিশ্ব, এমনকি যারা এক সময় আমাদের মিসকিন বলে অবজ্ঞা করত তারাও আজ আমাদের ওষুধ খাচ্ছে। পৃথিবীর সবচাইতে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ওষুধের বাজার বলে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এ বছর থেকে আমাদের ওষুধ রফতানি শুরু হয়েছে। কিছু অসাধু ওষুধ কোম্পানি যখন যে সরকার আসে সে সরকারী দলের আশ্রয়ে গিয়ে নিম্নমান, নকল ও ভেজাল ওষুধ বিক্রির চেষ্টা করে থাকে। এই সরকারের আমলে জাতীয় সংসদের স্বাস্থ্য বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সুপারিশে ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নিম্নমান, নকল ও ভেজাল ওষুধ নির্মূলে ৬২টি কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এরকম ব্যবস্থা নিয়মিত এবং আরও কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধে নেয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিচ্ছেন এবং সরকারও এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে রয়েছে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সব মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। আশা করা যায় সরকারের এসব তৎপরতা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালে দেশের ওষুধ খাত গার্মেন্টসের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাতে পরিণত হবে।

খাদ্যে ভেজাল মেশানোর যে অপতৎপরতা এদেশে ইংরেজ আমল থেকে চলে আসছে তা নিয়ন্ত্রণ যুগোপযোগী করে বিশুদ্ধ খাদ্য আইন ২০১৩ জারি হয়েছে। এখানে আগের আইনগুলোতে বর্ণিত মোলায়েম শাস্তির পরিবর্তে ভেজাল খাবারের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ- করা হয়েছে। এ ছাড়া ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ জারি হয়েছে এবং ফরমালিনের আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এর ফলে বাজারের সবজি, ফল, মাছ ও দুধে ফরমালিন মেশানোর প্রবণতা কমেছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়েছে। ভোক্তা অধিকার রক্ষা অধিদফতর স্থাপন করা হয়েছে।

অতি দরিদ্রদের খাদ্যের জন্য কর্মসংস্থান প্রকল্প, প্রতিবন্ধী ভাতা, টাঙ্গাইল থেকে শুরু করা স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প, দলিতদের জন্য প্রতি জেলায় সুইপার কলোনি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য সাহায্য কর্মসূচী, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতি কেজি ১০টাকা কেজি দরে প্রতি পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি চাল প্রদান কর্মসূচী, দরিদ্র ও অতি দরিদ্রদের জন্য ভিজিএফ কার্ড বিতরণ, দুর্বৃত্ত ও স্বামী কর্তৃক নির্যাতিত নারীদের জন্য আইন প্রণয়ন, তাদের চিকিৎসার জন্য সব মেডিক্যাল ও জেলা হাসপাতালগুলোতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রবর্তন, গৃহকর্মী নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ, গর্ভবতী মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস করা, দরিদ্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোতে সহায়তা ভাতা, শারীরিক প্রতিবন্ধী আইন ২০১৩, মানসিক ও স্নায়ুগত প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষা আইন ২০১৩, মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ন, ক্যান্সার-কিডনি-লিভার সিরোসিস রোগীদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান ইত্যাদি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীও দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রভূত অবদান রাখছে। একটি দেশে সরকার তার বিভিন্ন দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য একটি-দুটি নয়, মোট ১১৮টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচী চালু করেছে। তাও আবার প্রথাগত চিন্তা অনুযায়ী শুধু সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নয়, বরং ২৩টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং এগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে দেশের মোট বাজেটের ৯.৫% অর্থ, ভাবা যায়!

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করছেন। ডিজিটাল ক্ষেত্রে তিনি নতুন আইডিয়া ও কর্মসূচী দিয়ে সরকারকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে নিচ্ছেন। এক সময় যারা ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করতেন তারাও আজ এই সাফল্যকে মেনে নিয়েছেন। সরকারের অসংখ্য কর্মসূচীতে তিনি জড়িত রয়েছেন। মানুষ শুধু শহর নয়, বরং প্রত্যন্ত এলাকাতেও ডিজিটাল সেবা পাচ্ছেন, এটি কম কথা নয়। তিনি যখন এসব অবদানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হন এবং এসব পুরস্কার উৎসর্গ করেন দেশের মানুষ ও ডিজিটাল কর্মীবাহিনীর হাজারও তরুণের উদ্দেশে তখন গর্বে আমাদের মন ভরে ওঠে। সায়মা ওয়াজেদ পুতুল অটিজম সচেতনতায় সারাবিশ্বে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। হাজার হাজার অটিস্টিক শিশুকে তিনি অবহেলার জায়গা থেকে আদর ও বিশেষ মনোযোগের জায়গায় এনে ভবিষ্যতের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার মহান ও মানবিক ব্রত নিয়েছেন। তিনি যাতে এ কাজকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে পারেন সেজন্য তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা নিযুক্ত হয়েছেন। এ জন্য হু এক্সেলেন্স এ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সন্তানদের কাজের কারণে এভাবে বিশ্ব দরবারে আমাদের সম্মান বেড়ে যায়, আমরা আরও গর্বিত হই।

বঙ্গবন্ধুকন্যা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পাকিস্তানের মতো অলীক ধর্মরাষ্ট্র থেকে একটি জাতিরাষ্ট্রের জন্ম সহজ কথা নয়। সেই অসাধ্যের নাম ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধু সেই কাজটি করে আমাদের একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন। আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা সেই স্বপ্নকে একটার পর একটা বাস্তবায়ন করে আমাদের আত্মপ্রত্যয়ী করছেন। অন্যান্য সেক্টরের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুকন্যা স্বাস্থ্য সেক্টরে যে প্রভূত ও অন্যান্য দেশের জন্য ঈর্ষণীয় এবং উদাহরণস্বরূপ কাজগুলো করছেন তা জাতির ভবিষ্যত ইতিহাসেও উল্লিখিত হবে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যা যা কথা দেয়া ছিল, অন্যান্য খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতেও সেসব ওয়াদা রক্ষা করছে। নিশ্চয়ই শেখ হাসিনা এভাবে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করবেন।