আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সফল অভিযানে নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তি

ড. মো. হুমায়ুন কবীর : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এইতো গত ৮ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শারদীয় দুর্গাপূজা চলাকালে ঢাকার আশুলিয়া, টাঙ্গাইল ও গাজীপুরে তিন-চারটি স্থানে একই সঙ্গে পরিচালিত পরপর যৌথবাহিনীর কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার অংশ হিসেবে নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করার সময় ‘অপারেশন শরতের তুফান’ নামের যৌথবাহিনীর এক সফল অভিযানে তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১২ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে।

এবারের পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে কাশ্মিরে সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল। ঈদের ঠিক তিনদিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর তারিখে পাকিস্তানের একটি মসজিদে আবারো আত্মঘাতী এক সন্ত্রাসী বোমা হামলায় সেখানেও প্রায় ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ, উন্নত ও শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স এমনকি ইসলাম ধর্মের পবিত্র পূণ্য ও তীর্থভূমি খ্যাত সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের স্থানে স্থানেও বিভিন্ন সময় বোমা, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হামলার কথা আমরা সবাই জানি। আর পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, ইরান, সিরিয়া, লিবিয়া, তুরস্ক, ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ইত্যাদি দেশে তো জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলা নিত্যদিনের নৈমিত্তিক ঘটনা। সেখানে আজ আইএস তো কাল আল-কায়েদা ইত্যাদি নামে-বেনামে ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী শান্তির দেশে দেশে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে যাচ্ছে সারাক্ষণ। ঈদের কয়েকদিন আগে-পরেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা ও খুনের ঘটনায় কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশিও খুন হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু উপরে উল্লেখিত কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেরই ত্বরিত কিংবা তৎক্ষণাৎ বিচার করে ফেলতে পেরেছে এমনটি শোনা যায়নি। সে জন্য আজকে এসে নিশ্চিতভাবেই এটা বলা যায়, আমাদের বাংলাদেশে এসব ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচারে যে অনেক সাফল্য অর্জিত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ বাংলাদেশে বিগত কিছুদিন যাবৎ দেশজুড়ে নিরাপত্তার বিষয়টি যেভাবে শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের অস্বান্তিতে রেখে এক প্রকার শঙ্কিত করে তুলেছিল। এবারের (২০১৬) কুরবানি ঈদে তা অনেকখানি কেটে গেছে বলে মনে করছেন নাগরিকরা। কারণ ধারাবাহিক ও ক্রমাগতভাবে দেশে যেভাবে জঙ্গি পরিচয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার ঘৃণ্য প্রয়াস চালিয়েছিল, তা এখন অনেকাংশেই বিফলতার দিকে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

শুরুটা বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই এবং শায়খ আব্দুর রহমানদের দিয়ে। এভাবে মুফতি হান্নান কিংবা অপরাপর জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের পরিচয় নিয়ে আগে গোঁজামিল দেয়ার চেষ্টা করা হলেও এখন সরকারের আন্তরিকতায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা তৎপরতায় তা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গছে। এখন চলছে এর মূলোৎপাটনের প্রক্রিয়া। যা হোক, এ বছরের রমজানের ঈদের আগে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি-বিদেশি ২০ জনকে নির্মমভাবে হত্যা এবং রমজানের ঈদের দিনে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী ঈদ জামাত শোলাকিয়ায় কথিত জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে যে বার্তা দিতে চেয়েছিল তা এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। দেখা গেছে, প্রতিবারই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে অভিনব কায়দায় সন্ত্রাসী হামলাগুলো চালানো হয়েছে। কারণ হলি আর্টিজানের মতো ভিআইপি নিরাপত্তার ভেতরে ও ক‚টনৈতিক এলাকায় কিংবা শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতের মতো পবিত্র স্থানে ইসলাম ধর্মের নামে সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে তা কোনো দিন কারো কল্পনাতেই ছিল না। সে জন্য এসব স্থানে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সব সময় স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাই নেয়া হতো। কিন্তু সে সময়কার এ দুটি হামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আবার নতুন করে ভেবে পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সেটারই বাস্তবায়ন দেখা গেল এবারের কুরবানি ঈদের নিরাপত্তা বেষ্টনী সৃষ্টিতে। আর তাই এবার কুরবানি ঈদে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, যার সুফল দেশবাসী পেয়েছেও।

আগে কখনো যে সব বিষয় আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীর নজরে কিংবা কল্পনাতেই আনেনি, সে সব ঘটনা ঘটার পর সেগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা নতুন নতুন কৌশল ও সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে তা সফল করার চেষ্টা করছে। আর সেগুলো কাজের অংশ হিসেবেই গুলশানে জিম্মি ঘটনায় যৌথ বাহিনীর গৃহীত ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’, তারপর কল্যাণপুরে ৯ জঙ্গির ঘটনার অভিযানের নাম ‘অপারেশন থান্ডার স্টর্ম-২৬’, গত ২৭ আগস্ট ২০১৬ তারিখে নারায়ণগঞ্জে ‘অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭’ এবং সর্বশেষ রাজধানীর রূপনগর ও আজিমপুরের সফল অভিযানে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মারাত্মক আহত হলেও অভিযান সফল হয়েছে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহসী সদস্যরা তাদের জীবনের ওপর এসব ঝুঁকি নিয়ে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছেন।

এখন ব্লুগার রাজীব হত্যা থেকে শুরু করে জাগৃতি প্রকাশনীর দীপন ও টুটুলের হত্যাকারী, সর্বশেষ গুলশানের হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়া হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং মূল পরিকল্পনাকারীদের অনেককেই পুলিশ ধরতে সমর্থ হয়েছে। তার মধ্যে কেউ ‘মাস্টারমাইন্ড’ ও কেউ প্রশিক্ষণ দাতা। নব্য জেএমবির নতুন নেতৃত্বের পাঁচ স্তম্ভের দুই জন ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছেন। তারা হলেন- তামিম আহমেদ চৌধুরী ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলাম। এর মধ্যে তামিম ছিলেন মাস্টারমাইন্ড আর জাহিদুল ছিলেন সামরিক কমান্ডার। এখন তিন জন আছেন পুলিশের ‘হিট লিস্টে’। তারা হলেন- নুরুল ইসলাম মারজান, মামুনুর রশীদ রিপন ও মানিক। এর বাইরেও হয়তো আরো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে রয়েছে যা স্বভাবতই তদন্ত ও নিরাপত্তার খাতিরে প্রকাশ করছেন না তারা। এখন এসব জঙ্গি দূরীকরণ করতে গিয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছেন পুলিশ।

এক সময় ধারণা করা হতো যে, এসব ধর্মীয় জঙ্গিবাদে শুধু মাদ্রসায় পড়–য়া দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা জড়িত থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এ ধারণা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং দেশ-বিদেশ থেকে একটি বিশেষ বয়সের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং দেশের অভ্যন্তরে নামি-দামি বেসরকারি ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ধনীর দুলালরাও এতে জড়িয়ে পড়ছে। অপরদিকে এ রকম ধারণাও এক সময় বদ্ধমূল ছিল যে, এসব জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদে শুধু পুরুষ কিংবা ছেলেরাই জড়িত হতো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ছেলে জঙ্গিদের উচ্চ শিক্ষিত স্ত্রীরাও তাদের সহযোগী হিসেবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। সর্বশেষ কয়েকটি পুলিশি অভিযানে বেশ কয়েকজন নারী সদস্য ধরা পড়েছে। সেখানে পুলিশের জেরায় বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর অনেক কাহিনী। আর এসব জঙ্গি নেটওয়ার্কের নাড়ি-নক্ষত্রের মূলে কুঠারাঘাত করতে পারার কারণে ঈদুল ফিতরের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় বড় ধরনের জঙ্গি হামলার পর দীর্ঘ প্রায় আড়াই-তিন মাসের মধ্যে আর কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়নি। তবে বেশ কয়েকটি হামলার প্রস্তুতির কথা আগে থেকেই টের পেয়ে সেগুলো ধূলিসাৎ করে দিতে পেরেছে এবং তাদের পাকড়াও করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সফল অভিযানের কারণে জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে আসায় দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আবারো উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে বিদেশি নাগরিকদের টার্গেট করার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে যে একটি স্থবিরতা ও মন্দা কাজ করছিল যা কাটতে শুরু করেছে। সে জন্য বাংলাদেশের জঙ্গি-সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে দেশি-বিদেশি সব মহলেই আপাতত সন্তুষ্ট হয়েছেন। কারণ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মিসেস মার্শা ব্লুম বার্নিকাট নারায়ণগঞ্জের অভিযানের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য গিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাছাড়া সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ঝটিকা ঢাকা সফরে এবং এ বিষয়ে তার দেয়া মন্তব্যগুলো আশার সঞ্চার করেছে, যাতে সহজেই কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যেতে পারে। কাজেই জঙ্গি নির্মূলে শেষ কথা বলতে কিছু নেই কিংবা শেষ কথা বলার সময় এখনো আসে নাই। তারপরও একটি সমাধান সূত্র যে আবিষ্কার করা গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব সাফল্যের পেছনে যেমন রয়েছে সরকারি নীতির সুফল, তেমনি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিকতাপূর্ণ অভিযানের সফলতা। সেই সঙ্গে জনগণের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণমূলক সহযোগিতা। কারণ এসব ঘটনার পর সারা দেশে এ নিয়ে জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। আর তরুণ প্রজন্মের ভেতরে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জঙ্গি-সন্ত্রাসবিরোধী কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এতে অনেক সুফল পাওয়া যাচ্ছে।

সবাই জানেন এসব ঘটনা একক কোনো দেশের একার কোনো সমস্যাও নয় আর কোনো দেশের একার পক্ষে সমাধানও সম্ভব নয়। বর্তমানে এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। আর বাংলাদেশের জঙ্গিদের যদিওবা আইএসের সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগযোগ নেই, তারপরও তাদের বিদেশি নেটওয়ার্ক রয়েছে। তাদের অর্থ, অস্ত্র, সাহস, বুদ্ধি, পরামর্শ ইত্যাদি দিয়ে কেউ না কেউ সহযোগিতা করছে। তাদের মধ্যে সর্বশেষ অভিযানে নিহত জঙ্গি তানভীরসহ একাধিক জঙ্গি সদস্যের আইএসের সঙ্গে কানেকশন তৈরি করার চেষ্টার আলামত পাওয়া গেছে। কাজেই যেহেতু এখন সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দেশের সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, সে জন্য জঙ্গিরা আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না বলেই নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশাবাদ রয়েছে। তবে এখন থেকে বসে না থেকে এসব সচেতনতা ধরে রাখতে হবে এবং তা অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলেই সফলতা দীর্ঘস্থায়ী হবে।