টাইগারদের ঐতিহাসিক জয় : বাংলার বাঘের থাবায় ধরাশায়ী ইংলিশ সিংহ

আহা কি আনন্দ আকাশে-বাতাসে, ইংল্যান্ডকে ১০৮ রানে হারিয়ে সিরিজে ১-১ সমতা এনেছে টাইগাররা। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার চৌহদ্দি পেরিয়া সারা বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীরা মুশফিকবাহিনীর জয়ে অভিভূত। ক্রিকেটের জনকদের মাটিতে নামিয়ে আনা চাট্রিখানি কথা নয়। সেই অসাধ্য সাধন করেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এ জয়ের মাহাত্ম্য অনেক। এর আগে বেশ কয়েকবার জয়ের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে মুলতানে পাকিস্তানের বিপক্ষে, ২০০৬ সালে ফতুল্লায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে এবং চট্টগ্রামে জিততে জিততে হেরেছিল টাইগাররা। এবার ঢাকা টেস্টে দুঃখ ভোলার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছিল মুশফিক-তামিমরা। সাকিব-মিরাজ ঘূর্ণি আর ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে হারের দুঃখটাকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়ে টাইগাররা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দশম টেস্ট সাক্ষাতে জয় পেয়ে আনন্দে মাতোরায়া মুশফিকবাহিনী যেন বলেছেন- দুঃখটাকে দিলাম ছুটি আসবে না ফিরে, এক পৃথিবী ভালোবাসা রয়েছে ঘিরে মনটা যেন আজ পাখির ডানা। অনেক সাধনার পর যে জয় এল তাতে আনন্দে ডানা মেলে উড়াতে দোষের কিছুই নেই। কারণ, এ আনন্দ টাইগারদের প্রাপ্য।

ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট ম্যাচে ঐতিহাসিক জয় পাওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতীয় দলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে টেস্ট ক্রিকেটে জয় এক অনন্য প্রাপ্তি। এদিকে অভিনন্দন বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থনের কারণেই এ ঐতিহাসিক সাফল্য এসেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বিজয়ের এ ধারা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া পৃথক বার্তায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া টাইগারদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

ঐতিহাসিক টেস্ট জয়টা আসতে পারত চট্টগ্রামেই। ওই টেস্টে ব্যাটসম্যানরা যদি কিছু ভুল না করতেন, তাহলে নিশ্চিত জয় পেত বাংলাদেশ। তাহলে ইংল্যান্ডের মতো দলকে হোয়াইটওয়াশের লজ্জায় ভাসাতে পারত টাইগাররা। কিন্তু সেটি আর সম্ভব হয়নি ২২ রানের কারণে। চট্টগ্রামে হাত ফসকে বেরিয়ে যাওয়া জয় ঢাকাতে এল একটু দেরিতে। এ জয়ে গৌরবের কোনো ঘাটতি নেই। এ জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রাচীন দলের অন্যতম ইংল্যান্ড অভিজাত ইতিহাসে সমৃদ্ধ সেই ইংলিশদের টেস্টে হারের স্বাদ দিল টাইগাররা।

গতকাল রোববার মিরপুরে দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ডকে ১৬৪ রানে অলআউট করে ক্রিকেট পরাশক্তিদের অগ্রিম সতর্কবার্তা দিয়ে রাখল টাইগাররা।

এর আগে জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জিতলেও এ জয়ের মাহাত্ম্য অন্যরকম। এ সময়ের অন্যতম সেরা দলকে হারানো বাংলাদেশকে টেস্ট ক্রিকেটেও এনে দিয়েছে নতুন আত্মবিশ্বাস।

গতকাল ঢাকা টেস্টের তৃতীয় দিনে মধ্যাহ্ন বিরতির পরপরই গুটিয়ে গেছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস। তাতে চট্টগ্রাম টেস্টের পর হোম অব ক্রিকেটেও রোমাঞ্চ ছড়ানোর মঞ্চ তৈরি করে ইংল্যান্ডকে ২৭৩ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দিয়েছে মুশফিকুর রহিমের দল। এই লক্ষ্যে জিতে মাঠ ছাড়তে হলে এশিয়ার মাটিতে নিজেদের সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ডই গড়তে হবে সফরকারীদের। সেই পথে শতরানের জুটি গড়ে শুরুটা দুর্দান্ত করেছিল দুই ইংলিশ উদ্বোধনী অ্যালিস্টার কুক ও বেন ডাকেট। এরপর মিরাজ ও সাকিবের ঘূর্ণি জাদুতে দ্রুত সব পাল্টে যায়।

২৭৩ রানের লক্ষ্যে খেলতে নামা ইংল্যান্ড বিনা উইকেটে ১০০ থেকে ১৬৪ রান তুলতে হারিয়ে বসে ১০ উইকেট। মূলত, মিরাজ আর সাকিব ঘূর্ণিতে দিশেহারা হয়ে পড়ে ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা। মেহেদী হাসান মিরাজ ৭৭ রানে ৬ ইংলিশ ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে পাঠান। অন্য প্রান্ত বল হাতে সাকিব আল হাসান ৪৯ রানে তুলে নিয়েছেন ৪ উইকেট। প্রথম ইনিংসে মিরাজ ৮২ রানে নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। ঢাকা টেস্টে ১২ উইকেট আর চট্টগ্রাম টেস্টে ৭ উইকেট নিয়ে অনন্য রেকর্ড গড়েছেন স্পিনার মিরাজ। গতকাল বিকেলে ইংল্যান্ডকে কুপোকাত করার আগে তৃতীয় দিনের শুরুটা ভালোই করেছিলেন ইমরুল আর সাকিব। দুজন মিলে ৪৮ রানে জুটি গড়ে বাংলাদেশকে ২০০ রানের লিড এনে দেয়। তবে এরপরই ঘটে ছন্দপতন। ব্যক্তিগত ৭৮ রান করে মঈন আলির বলে এলবিডব্লিউও হয়ে সাজঘরে ফিরে যান ইমরুল। এ ওপনারের বিদায়ের পর সাকিব-মুশফিকের ব্যাটের দিকে তাকিয়ে ছিল টাইগার সমর্থকরা। তবে দুজনই হতাশ করল। আদিল রশিদের বলে বোল্ড হয়ে সাকিবের (৪১) বিদায়ের পরের ওভারেই স্টোকসের বলে কুককে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরে গেছেন মুশফিকও (৯)।

এরপর শুভাগত হোমের সঙ্গে ৩০ রানের জুটি গড়ে ব্যক্তিগত ১৫ রান করে আদিল রশিদের দ্রুতগতির সোজা বলে এলবিডব্লিউ হয়ে সাজঘরে ফিরে গেছেন সাব্বির রহমান। মধ্যাহ্ন বিরতি থেকে ফিরে তাইজুল, মিরাজ আর রাব্বিকে সঙ্গে নিয়ে আরো ২৮ রান তোলেন শুভাগত। এতে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৯৬। আর ম্যাচ জিততে ইংলিশদের সামনে টার্গেট দাঁড়ায় ২৭৩ রানের।