প্রত্যাশার চেয়েও বেশি অগ্রগতি

গত কয়েক বছরে দারিদ্র্য বিমোচনে, বিশেষ করে হতদারিদ্র্য বিমোচনে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি অগ্রগতি হয়েছে বাংলাদেশের। তবে আয়-রোজগারের দিক দিয়ে এগুলোও দরিদ্রতার বহুমাত্রিক সূচকের সব কটিতে সমান অগ্রগতি না হওয়ায় তেমন সুফল মিলছে না দৈনন্দিন জীবনে। এ অবস্থায়, স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য বিমোচনে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচী হাতে নেয়ার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের।

সারা বিশ্বে এখনও সাড়ে ৩৮ কোটি হতদরিদ্র শিশু আছে। এর ফলে ভবিষ্যত তারুণ প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে থাকছে। আবার দরিদ্র শিশুদের এক-পঞ্চমাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। আফ্রিকার সাবসাহারা ও দক্ষিণ এশিয়ার সিংহভাগ হতদরিদ্র শিশুর বসবাস। সম্প্রতি শিশু দারিদ্র্য নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের যৌথভাবে প্রকাশিত এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

তবে হতদরিদ্র শিশুদের চিহ্নিত করা হয়েছে কিছুটা ভিন্নভাবে। ক্রয়ক্ষমতা অনুসারে (পিপিপি) দৈনিক ১ দশমিক ৯ ডলারের কম আয় করলে ওই ব্যক্তিকে হতদরিদ্র ধরা হয়। তবে নিজেদের কিংবা পরিবারের আয়কে মাথাপিছু ভাগ করলে কোন শিশুর আয় দৈনিক ১ দশমিক ৯ ডলারের কম হলেই ওই সব শিশুকে হতদরিদ্র হিসেবে গণনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দরিদ্র শিশুদের মানসম্পন্ন জীবনধারা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরী। শিশু দারিদ্র্য নিরসন করতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্যটি অর্জন করা কঠিন হবে।

একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে ভারতে ৩০ শতাংশ হতদরিদ্র শিশু আছে। এ সংখ্যা ১১ কোটির বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে নয় বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় ২৩ কোটি শিশু এখনও হতদরিদ্র।

ওই প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের যত হতদরিদ্র শিশু আছে, এর অর্ধেকের বেশি প্রায় ৫১ শতাংশের মতো আফ্রিকার সাবসাহারা এলাকার দেশগুলোর শিশু। ওই অঞ্চলে প্রায় ১৯ কোটি হতদরিদ্র শিশুর বসবাস। আর বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ হতদরিদ্র শিশুর বাস। এ দুই অঞ্চলেই প্রায় ৮৭ ভাগ দরিদ্র শিশু বাস করে।

দারিদ্র্য সবচেয়ে আঘাত করে শৈশবকে। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে এখন ৭৬ কোটি ৭০ লাখ হতদরিদ্র মানুষ আছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু। ৩৮ কোটি ২০ লাখ পূর্ণবয়স্ক হতদরিদ্র। আর কর্মক্ষম হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৪ কোটি। যাঁদের বয়স ১৯ থেকে ৫৯ বছর। দুই দশক আগে জামালপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন মর্জিনা বেগম। এ সময়ের মধ্যে অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। বদলায়নি শুধু তার জীবিকা নির্বাহের উপায়। কারওয়ান বাজারে সবজি কেনাবেচা করা তার ব্যবসা। এই ব্যবসা থেকে প্রতিদিনের লাভের টাকা যোগ হয় সংসারের নিত্য ব্যয়ে। মধ্যম আয়ের দিকে যাওয়া বাংলাদেশে, জীবিকার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা এসব মানুষের গল্প কোন রূপকথা নয়।

তবে আশার কথা হলো গেল কয়েকবছর ধরে উল্লেখযোগ্য হারে কমছে দারিদ্র্য মানুষের সংখ্যা। যদিও প্রত্যাশা মতো পরিবর্তন আসছে না এসব মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। এর কারণ হিসেবে, এনজিওগুলো বলছে, দারিদ্র্য বিমোচনে সবগুলো সূচকে সমান তালে অগ্রগতি হচ্ছে না বাংলাদেশের। পাশাপাশি, শহরাঞ্চলে দরিদ্র মানুষের কাছে কাক্সিক্ষত সেবা পৌঁছে দিতে পারছে না সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

অন্যদিকে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী হতদারিদ্র্য শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এসডিজিতে তা অর্জন করতে হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি, দারিদ্র্য সীমার নিচে থাকা পরিবারের শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয়ার পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১০-১১ সময়ে বাংলাদেশে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ; ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ; ২০১২-১৩ অর্থবছরে ছিল ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ; ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশে অতি দারিদ্র্যের হার মোট জনসংখ্যার ১২ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে ২০০৯-১০ অর্থবছর শেষে এ হার ছিল সাড়ে ১৮ শতাংশ।

দ্রুত কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘তবে এটা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, আমাদের দারিদ্র্য শূন্যে নামিয়ে আনতে কোনমতেই ২০৩০ সাল লাগবে না। তার আগেই আমরা সে লক্ষ্যে পৌঁছে যাব।’

বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে ‘বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস’ পালন করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

গত বছর অক্টোবরে পেরুর রাজধানী লিমায় বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তৃতায় সংস্থাটির ১৮৮টি দেশের প্রায় ১০ হাজার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছিলেন।

এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অর্জন শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, অনুকরণীয় হয়েছে উন্নয়নশীল বিশ্বে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় মাথাপিছু আয় কম হওয়ার পরও শিশু মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছে।

বাংলাদেশ দেখিয়েছে প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচনের একমাত্র অবলম্বন নয়, স্বল্প আয় নিয়েও অনেক অর্জন সম্ভব।