গার্মেন্টে সবুজের হাতছানি

নেই গুমোট পরিবেশ আছে হাঁটাচলার পর্যাপ্ত জায়গাও

দেশের পোশাক খাতের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক একসঙ্গে একই ছাদের নিচে অনিরাপদ ও গুমোট পরিবেশে বছরের পর বছর কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু সময় বদলেছে। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করতে এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশি পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে দেশের গার্মেন্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ সবুজ ও পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি কারখানা এ উদ্যোগ গ্রহণ করায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন ইপিজেড ও শিল্পাঞ্চল এলাকার বেশ কয়েকটি কারখানার কর্মপরিবেশ আমূল বদলে গেছে। বদলে যাওয়া কারখানাগুলোয় নেই কোনো গুমোট পরিবেশ, আছে হাঁটাচলার পর্যাপ্ত জায়গা। বিশাল ইলেকট্রিক পাখার মাধ্যমে শ্রমিকরা পাচ্ছেন পর্যাপ্ত বাতাস। কারখানাগুলোর ভিতর ও বাইরে আছে সুবজের সমারোহ। আছে শ্রমিকদের খাওয়ার জন্য ক্যান্টিনের ব্যবস্থা, চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত আলোর জন্য স্কাই লাইটিং ব্যবস্থা। এগুলোয় পরিবেশবান্ধব কাজের পাশাপাশি আছে শ্রমিকদের জন ন্যায্য মূল্যের দোকান। নারী শ্রমিকদের সন্তান পালনের জন্য ডে-কেয়ার ব্যবস্থা। এমনকি গার্মেন্টগুলোর কয়েকটিতে শারীরিক প্রতিবন্ধীরাও কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। সবুজ পরিবেশবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরিতে এ কারখানাগুলোর অনেকটিতেই এখন সোলার প্যানেল লাগানো হয়েছে। আবার কারও পুরো কারখানাই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। আর কর্মক্ষেত্রে ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করায় এসব কারখানায় কাজ করে খুশি শ্রমিকরাও। পোশাক খাতে সবুজ কারখানার ধারণাটি এখন বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে  বাংলাদেশের তৈরি পোশাককে বিশ্বদরবারে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোক্তারা পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা নির্মাণে এখন বেশ আগ্রহী। বিশেষ করে গার্মেন্ট খাতে যারা ভালো করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যাদের পোশাকের কদর আছে তাদের অধিকাংশই সবুজ পরিবেশবান্ধব কারখানা নির্মাণ করেছেন বা এ প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এমনকি সবুজ কারখানা নির্মাণের ব্যাপারে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকেও বিক্রেতারা ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। পোশাক মালিকদের সংগঠন (বিজিএমইএ) সূত্রে জানা যায়, এরই মধ্যে পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার স্বীকৃতি হিসেবে দেশের ৩২টি কারখানা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের লিড (লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন) সনদ পেয়েছে। আর এই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য এখন অপেক্ষা করছে আরও ১১৮টি গার্মেন্ট কারখানা। এমনকি বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের লিড সনদ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত গার্মেন্টগুলোর মধ্যে ৪টিই এখন বাংলাদেশের। এ ছাড়া নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ গ্রিন নিট পোশাক কারখানা নির্মাণে উদ্যোক্তাদের সহায়তা করবে। আগামী দুই বছরে বিকেএমইএ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও অন্য অঞ্চলে ৫০টি সবুজ কারখানা উন্নয়ন করবে। উদ্যোক্তারা জানান, পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপচয় রোধ করে পরিবেশবান্ধব কারখানায় তৈরি পোশাক বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের জন্য যেমন আলাদা সুনাম বয়ে আনবে একইভাবে ভালো পরিবেশে কাজ করায় শ্রমিকরাও বেশি পোশাক উৎপাদন করতে পারবেন। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে সবুজ কারখানায় তৈরি পোশাকের চাহিদা ভালো থাকায় বেশি দামে পোশাক বিক্রি করে আগের চেয়ে উদ্যোক্তাদেরও অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই পোশাক কারখানাগুলোর মালিকরা আশা করছেন আন্তর্জাতিক বিখ্যাত পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানায় তৈরি পোশাক আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে কিনবে। বিজিএমইএ’র দেওয়া তথ্যমতে, ঋণসহ অন্যান্য সুবিধা পেলে ২০১৬ সালের শেষে বাংলাদেশের দেড় শ’র বেশি কারখানা লিড সনদ অর্জন করতে পারে। জানা যায়, সবুজ কারখানা হিসেবে সনদ পেতে একটি কারখানাকে সব ধরনের কমপ্লায়েন্স সুবিধা পূরণ করতে হবে। এ ছাড়া কারখানায় ব্যবহূত সব পণ্যই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের মাধ্যমে পরীক্ষিত হতে হবে। বর্তমানে বড় বড় কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যবসার প্রসার করতে সবুজ কারখানা তৈরির দিকে মনোযোগী হচ্ছে। এর মাধ্যমে পানির অপচয় রোধ করে, জ্বালানি সাশ্রয়ের মাধ্যমে, বয়লারের স্ট্রিম অন্য কাজে লাগিয়ে, ইটিপির ময়লা পানি অন্য কাজে ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় পোশাক উৎপাদন করা সম্ভব। সাধারণত গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল সবুজ কারখানাগুলোকে ‘প্লাটিনাম’, ‘গোল্ড’, ‘সিলভার’ ও সাধারণ ক্যাটাগরিতে সনদ দেয়। এবা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিল্লুর রহমান মৃধা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গ্রিন কারখানা তৈরির কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের পোশাকের ব্র্যান্ড তৈরি হবে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে মালিক-শ্রমিক দুই পক্ষই লাভবান হবেন। মালিকরা শ্রমিকদের থেকে বেশি উৎপাদন পাবেন আর শ্রমিকরাও নিরাপদ পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার সুযোগ পাবেন। আন্তর্জাতিক বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো সবুজ কারখানা, তার কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে অনেক গুরুত্ব দেয়। এমনকি পশ্চিমা দেশের ক্রেতারাও যে পোশাকটি কিনছেন তা পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে কিনা তা বিবেচনায় এনে পোশাক কেনেন। বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, অনেকে নতুন করে সবুজ কারখানা তৈরি করছেন আবার অনেকেই পুরনো কারখানায় নতুন করে সবুজ কারখানা গড়ে তোলার ব্যবস্থা করছেন। দেশের কারখানাগুলো সবুজ কারখানা হিসেবে গড়ে তোলা হলে এ খাতের আমূল পরিবর্তন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা থেকে বেশকিছু সুবিধা পাওয়া যায়। এর ফলে একদিকে শতকরা ২৪ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ৫০ শতাংশ পানির অপচয়ও কমে। এর পাশাপাশি কারখানার পরিবেশ সুন্দর হয়, এর সঙ্গে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া গেলে, নিরাপত্তা বজায় থাকলে পোশাক উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। যদিও সবুজ কারখানা তৈরিতে সাধারণ কারখানার চেয়ে খরচ বেশি হয়, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তা কারখানার মালিক ও শ্রমিক উভয়ের জন্য লাভজনক। দেশের সবুজ কারখানাগুলোর মধ্যে ‘ক্ল্যাসিক ফ্যাশন’ এরই মধ্যে লিডের প্লাটিনাম সনদ পেয়েছে। গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরের এই কারখানায় এখন মোট চার হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল্লাহ আজিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে হলে আমাদের আরও বেশি সবুজ কারখানা নির্মাণ করতে হবে।’ দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব লিড প্লাটিনাম কারখানার ছাড়পত্র পায় ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও। প্রথম দিকে এবা গ্রুপ, ভিয়েলাটেক্স, প্লামি ফ্যাশন লি. ও এনভয় টেক্সটাইল সবুজ কারখানা গড়ে তুলে নতুন এ ধারণার সঙ্গে অন্যদের পরিচয় করিয়ে দেয়। এর বাইরে লিড সনদপ্রাপ্ত অন্য সবুজ কারখানাগুলো হচ্ছে— শ্রুতি টেক্সটাইল, জেনেসিস ফ্যাশনস ও জেনেসিস ওয়াশিং, ওসমান ইন্টারলাইনিং, তাসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, তারাসিমা অ্যাপারেলস, এসকিউ বিরিকিনা, এসকিউ কোলব্লেরস, রিজেন্সি গার্মেন্ট, গ্রিন টেক্সটাইল, ইকো অ্যাপারেলস, ইপিক গার্মেন্টস, ইপিলিয়ন স্টাইল কারখানা, ভিয়েলাটেক্স, পার্ল গার্মেন্টসহ অন্যান্য কারখানা।