সোনালি আঁশ ও রুপালি ইলিশ: ফের মর্যাদার আসনে

বাঙালি ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। মাছে-ভাতে বাঙালি কিংবা কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের গর্বিত অনুষঙ্গগুলো আমাদের মাঝ থেকে ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে। দিন দিন যেমন কমছে কৃষিজমি, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির অসংখ্য মাছ। এই লুপ্ত তালিকায় যুক্ত হতে হতে সুদিনে ফিরতে শুরু করেছে সোনালি আঁশখ্যাত পাট ও জাতীয় মাছ ইলিশ। বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল কর্মতৎপরতা ইলিশ ও পাটের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করছে। মর্যাদার বিশাল অংশজুড়ে বিস্মৃত থাকা কৃষিজ পণ্য পাট এবং রশনা তৃপ্তির অন্যতম অংশীদার ইলিশ রক্ষায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ আশা জাগিয়েছে মানুষের মনে। একদিকে স্বপ্ন দেখছেন কৃষক, অন্যদিকে সুস্বাদু মাছ ইলিশের স্বাদ আস্বাদন প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বাংলাদেশ।

বাঙালি পরম্পরায় অহর্নিশ অংশীদার সোনালি ও রুপালি সম্পদ দুটিকে চিরতরে নিঃশেষ করার যে মহড়া চলছিল তা থেকে উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে জেনে ভালোই লাগছে। এটা সন্তুষ্টি, স্বস্তি, তৃপ্তি ও আনন্দের বিষয় বটে। ইলিশের স্বাদবঞ্চিত বাঙালি এবং পাটের ন্যায্যমূল্য থেকে যোজন যোজন দূরে দাঁড়ানো ক্লান্ত কৃষক আজ সুযোগ প্রাপ্তির সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। বাংলার মর্যাদা স্মারক পাট ও ইলিশের অতীত গর্ববোধের ক্ষেত্রটিকে পাকাপোক্ত করতে সরকার যে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কিংবা হাতে নিতে যাচ্ছে সেগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। ইলিশ ও পাটে ফিরবে পূর্ব গৌরব এমনটি প্রত্যাশা সবার।

ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। উনুনতলে পড়তে বসে মায়ের মুখে শোনা এই বুলিটি মুখস্থ করেছিলাম সেই শিশুবয়সে। অন্যান্য জাতীয় প্রতীকের সঙ্গে ইলিশের স্বাদ ও ঘ্রাণের বর্ণনা মা শুনিয়েছিলেন বেশ অহঙ্কারের সঙ্গে। আর বাবার হাত ধরে মৎস্যহাটে গিয়ে দরদাম কষে যখন বাঙালির গর্বিত প্রতীক রুপার মতো ঝকঝকে রুপালি ইলিশটি হাতে নিতাম তখন নিজের মাঝে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করত। পনেরো থেকে বিশ টাকা মূল্যের তখনকার ইলিশ মাছটি নিয়ে আনন্দচিত্তে বাড়ি ফিরতাম। মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে কী যে উৎফুল্লতা। পাশে বসিয়ে মা মাছ কেটেকুটে ধুয়ে চলে যেতেন উনুনতলায়। মাছটুকরো রন্ধনপাত্রে তোলার কিছু সময় পরই চারপাশের মানুষ অনুধাবন করতে পারত ইলিশের ঝাঁজ কতটা তীব্রতর। আর ইলিশের টাটকা ভাজি, ইলিশ পাতুরি, শর্ষে-ইলিশ ও ইলিশ-পোলাও যারা খেয়েছে তারা জেনেছে ইলিশের স্বাদ ও গুণের কথা। কিন্তু যখন শিশুবয়স থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হলাম তখন আস্তে আস্তে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে লাগল ঐতিহ্যবাহী ইলিশের সুগন্ধ। স্বাদ ও ঘ্রাণ থেকে পুরোদস্তুর বঞ্চিত হলো গ্রামগঞ্জের মানুষ। নিজের মধ্যে এক শূন্যতা দেখা দিল। মনে জাগল প্রশ্নÑ আমরা যা দেখেছি, শুনেছি, খেয়েছি তার ছিটেফোঁটাও পাবে না আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। তবে কি বইপত্রে লিপিবদ্ধ জাতীয় মাছের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় রূপকথার গল্পে পরিণত হবে! না, অবশেষে সব আশঙ্কা দূরে সরিয়ে ইলিশে ফিরছে সেই রুপালি ঝিলিক।

ইলিশের ঐতিহাসিক দিক বিবেচনায় দেখা যায়, কবি বুদ্ধদেব বসু ইলিশকে ‘জলের রুপালি শস্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। দ্বাদশ শতকে প-িত জীমূত বাহন এই মাছের নাম সর্বপ্রথম ইলিশ বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া বারো শতকে সর্বানন্দের ‘টীকাসর্বস্ব’ গ্রন্থে ‘ইল্লিষ’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৮২২ সালে হ্যামিল্টন বুকানোন নামের এক ইংরেজ বঙ্গোপসাগরের মাছ নিয়ে গবেষণার সময় ইলিশ শব্দটির আগে হিল্সা শব্দটি জুড়ে দেন। হিল্সা এবং ইলিশের যুক্ত শব্দ হলো ইলিশা। ইলীশ (ইল+ঈশ=ইলীশ) ‘ইল’ মানে ‘জলের মধ্যে’ আর ঈশ মানে ঈশ্বর কিংবা রাজা। অর্থাৎ যে জলের মধ্যে রাজা সেই ইলীশ। যদিও বর্তমান বইপত্রে আমরা ‘ইলীশ’-এর পরিবর্তে ‘ইলিশ’ বানানের ব্যবহার দেখে আসছি। ইলিশ যে মাছের রাজা সেটি ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত। কিন্তু একটা সময়ে এসে মাছের রাজা ইলিশ তার রাজত্ব হারিয়ে ফেলে। তবে রাজত্ববাহী ইলিশ ফিরে পেতে যাচ্ছে তার পুরনো সিংহাসন।

বাঙালির ঐতিহ্য ও গর্বিত পালে বইছে সুবাতাস। বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত বদলে দিচ্ছে ইলিশ চিত্র। মা-ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের অংশ হিসেবে ২৭ জেলায় ২২ দিন (১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর) ইলিশ ধরার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এই ২২ দিন ইলিশ আহরণ, বিতরণ, বিপণন, কেনাবেচা, পরিবহন, মজুদ, বিনিময়সহ সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। এ ছাড়া ইলিশ নিয়ে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপে চলতি মৌসুমে সাড়া জাগানো সুফল আসায় আরও গবেষণার জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মূল্যবান এ মৎস্যের অবাধ প্রজনন, অভয়াশ্রম রক্ষা, প্রাচুর্যতা ও ম্যাচুয়িরিটিকে প্রাধান্য দেওয়া, পানির ভৌত ও রাসায়নিক, জৈবিক, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, নিরাপদ বিচরণসহ সম্ভাব্য সবকিছুর ওপর রিপোর্ট পাওয়ার পর সরকার আগামীতে আরও জরুরি ও জোরালো পদক্ষেপ নেবে বলে জানা গেছে।

বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। মাছবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইলিশ আছে এমন ১১টি দেশের মধ্যে ১০টি দেশে ইলিশ উৎপাদন কমছে। একমাত্র বাংলাদেশেই ইলিশ উৎপাদন বাড়ছে। প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ইলিশ উৎপাদন। সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপের ফলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩ দশমিক ৮৭ লাখ মেট্রিক টন। আর ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৯৯ লাখ মেট্রিক টন। উৎপাদনের এ সাফল্য ধরে রাখতে ইলিশ ধরা বন্ধের মৌসুমে ১৫ জেলার ২ লাখ ২৪ হাজার ১০২টি জেলে পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছে সরকার, যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তবে জেলেদের নামে বরাদ্দকৃত অর্থকড়ি সঠিকভাবে বণ্টন হচ্ছে কিনা সেটি ভেবে দেখতে হবে।

পাটকে সোনালি আঁশ বলা হয় কেন? পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। কৃষিজ এ দ্রব্যটি বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত বাংলাদেশ। তাই পাটকে সোনালি আঁশ বলা হয়। এ ধরনের প্রশ্ন থেকে উত্তর মুখস্থ করেছিলাম প্রাথমিক শিক্ষাজীবনে। এক সময়ের সোনালি আঁশ হারাতে বসেছিল তার রঙরূপ ও খ্যাতি। প্লাস্টিক ও পলিথিনের অবাধ বিচরণ এবং দেশের অধিকাংশ পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছিল বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পটি। পাটের তৈরি বস্তা, চট, থলে, রশি ছাড়াও নানান জাতের পণ্যসামগ্রীর ব্যবহার রুখে দিয়ে নিত্যনতুন বাহারি সব পণ্য বাজার দখল করায় পাট বাজারে চলে আসে দুর্দিন। এক সময় পাটের তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহৃত হতো দেদার। পৃথিবী এগোনোর দ্রুত মহড়ায় পাটের গায়েও লাগে পরিবর্তনের ছোঁয়া। তাই দিন দিন হ্রাস পেতে থাকে পাটের ব্যবহার।

বিবর্ণ আঁশে ফিরতে শুরু করেছে সোনালি রঙ। এক সময়ের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট হারাতে বসেছিল তার গীতি-গৌরব। যতটুকু জানা যায়, পাটের সোনালি আঁশের জন্যই বাংলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোনার বাংলা। পৃথিবীর একমাত্র বাংলাদেশেই ভালো মানের পাট উৎপন্ন হয়। এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থাকা সত্ত্বেও ২০০২ সালে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার চিরতরে এশিয়ার বৃহত্তম আদমজী জুট মিলটি বন্ধ করে দেয়। সেই সময়কার বাস্তবতায় সদ্য চাকরি হারানো হাজার হাজার জুট শ্রমিক নামেন রাস্তায়। বেকারত্ব ঘোচাতে কেউ কেউ ঝোঁকেন ভিন্ন পেশায়। আবার অনেকে অভিশপ্ত জীবন পরিচালনায় হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন সর্বদা। অপরদিকে পাটের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে অন্য পথে হাঁটেন পাটচাষিরা। ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে মূল্যবান এ ফলনের উৎপাদন। দেশের এই সোনালি সম্পদ অর্থ উপার্জনের বদলে ভারী বোঝা হয়ে একদিন চেপে বসেছিল কৃষক শিরে। বাংলার মাটি পাট আবাদে উপযোগী হলেও মূল্যহীন পরিস্থিতি সেই উর্বর ভূখ-কে পতিত ভূমি কিংবা মানব বসতিস্থলে পরিণত করে। তবে বর্তমান সরকার পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনতে গ্রহণ করে নানা পদক্ষেপ। যার ফলে গৌরবের সেই সোনালি পাট আবারও গন্ধ ছড়াচ্ছে পল্লি জনপদের গেঁয়ো প্রকৃতিতে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত পাট সম্পর্কিত সংবাদে পাটের ইতিবাচক দিক খুঁজে পাওয়া যায়। সংবাদে প্রকাশ, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবন এবং আধুনিকায়নের ঘোষণার পর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে প্রায় দুই বছর ধরে পাটের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ছে। পাটকে জনপ্রিয় করতে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০’ বাস্তবায়ন করতে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। আইন অনুযায়ী ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনিÑ এ ছয় পণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রিতে পাটের মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক। সম্প্রতি মরিচ, হলুদ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনিয়া, আলু, ময়দা, আটা, তুষ-কুঁড়া, পোলট্রি ফিড (হাঁস-মুরগির খাদ্য) ও ফিশফিডসহ (মাছের খাদ্য) ১৩ পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া পাটের রকমারি পণ্য রপ্তানিতে নগদ সহায়তা ১০ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এর বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর আধুনিকায়নের জন্য চিনের সরকারি প্রতিষ্ঠান সিটিইএক্সআইসির কারিগরি সহায়তায় ২৬টি কারখানার আধুনিকায়নের কাজ চলছে। সর্বোপরি সরকারের সঠিক তত্ত্বাবধানে পাটের সুদিন ফিরে আসছে।

সোনালি আঁশের অশনি সংকেতে বর্তমান সরকার পাট উৎপাদন ও বাজারজাতে বিশেষ মনোযোগী হওয়ায় সুফল আসতে শুরু করে। পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন বাস্তবায়নের জন্য দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনার ফলে আইনটির বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয়েছে। পাটের ব্যবহার বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে বছরে পাটের ব্যাগের চাহিদা ১০ কোটি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। স্থানীয় বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে এ পণ্য রপ্তানির পরিমাণও প্রতিবছর বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে এ খাতে আয় হয়েছে ৮২ কোটি মার্কিন ডলার। এ পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছর পাট চাষে আওতাভুক্ত জমির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। এবার ৭ লাখ ২৫ হাজার হেক্টর জমি পাট চাষের আওতায় এসেছে। গেল বছর এর পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে গেল অর্থবছরের ১১ মাসে ৭৯ কোটি ৪২ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। কাঁচা পাট রপ্তানি বেড়েছে ৫৪ শতাংশের বেশি। তাছাড়া দেশে বেশ কয়েকটি পণ্য পরিবহনে পাটের বস্তা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকায় বাড়ছে অভ্যন্তরীণ চাহিদাও। সব মিলে এক সময়ের সোনালি আঁশ হিসেবে পরিচিত পাটের সুদিন ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।