নদীতে পালতোলা নৌকা- দু’পাশে ঘনসবুজ বনরাজি

পাকশীর ঐতিহ্যবাহী বিবিসি বাজার। এ বাজার সম্পর্কে বিশ্বের রাজনীতি সচেতন প্রত্যেক মানুষের কমবেশি জানা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই বিবিসি বাজারের কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে বসে এলাকার আতঙ্কিত উৎসুক জনতা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা, এমনকি গভীর রাতে রেডিওতে যুদ্ধের খবর শুনতেন। এ কারণেই গণমানুষের মুখে মুখে বাজারটির নামকরণ হয়ে গেছে ‘বিবিসি বাজার’। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে অনেক পর্যটক এই বিবিসি বাজারে এসে মুগ্ধ হয়েছেন। অনেকে আরও মুগ্ধ হয়েছেন রূপপুর গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে। কয়েক বছর আগে সুদূর লন্ডন থেকে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (বিবিসি) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এসে ঐতিহাসিক বিবিসি বাজার ঘুরে গেছেন। তখন তারা স্থানীয় কর্মকর্তা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বিবিসি বাজারসহ গোটা পাকশীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। এছাড়া এখানকার আরও একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, সম্ভাবনার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ এসে ভিড় জমান পাকশীর জোড়া সেতু এলাকায়। এখানে বেড়াতে এলে মনকাড়া আনন্দ মেলে। সরচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে লালন শাহ ও হার্ডিঞ্জ- এই দুই সেতুর মধ্যখান দিয়ে দেখা মেলে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য।

পাবনা জেলাধীন এক উপজেলা ঈশ্বরদী। ব্রিটিশ আমল থেকেই রেলওয়ের জংশন শহর হিসেবে এর যথেষ্ট খ্যাতি। তাই ঐতিহ্যবাহী শহর হিসেবে ঈশ্বরদী দিন দিন আরও উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে। কারণ, এখানকার পাকশীতে রয়েছে চোখ ধাঁধানো এক অনন্য স্থাপনা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। শতবর্ষ পুরনো এই ব্রিজ আজও সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে।

উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বলে খ্যাত রেলওয়ে জংশন শহর ঈশ্বরদীর আট কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত পাকশী। এককালের প্রমত্ত পদ্মা নদীর উপর নিজস্ব শোভাবর্ধন করে সোজা দাঁড়িয়ে আছে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ব্রিটিশ প্রকৌশলী রবার্ট উইলিয়াম গেল্স’র নক্সা অনুযায়ী ১৯১০ সালে এই সেতু নির্মিত হয়। পাশাপাশি পদ্মা নদীর মাত্র তিন শ’ মিটার ভাটিতে নির্মিত হয়েছে লালন শাহ সেতু। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শত শত দর্শনার্থী বেড়াতে এসে ভিড় জমায় এ এলাকায়। এই দুই সেতুর পাশেই রয়েছে একই সময়ে গড়ে ওঠা প্রকৃতির রূপতিলক, ঈশ্বরদীর গর্বিত কন্যা বলে পরিচিত বিভাগীয় রেলওয়ে শহর পাকশী। সবুজে ঘেরা এই শহরে রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। লালন শাহ সেতু নির্মাণকে ঘিরে পদ্মা নদীর পাদদেশে গড়ে উঠেছে দেশী-বিদেশী কর্মকর্তাদের সৌন্দর্যম-িত আবাসিক এলাকা। বিমানে উড্ডয়নরত অবস্থায় বা যে কোন উঁচু স্থান থেকে দেখলে মনে হবে এটি চীন দেশের কোন এক অঙ্গরাজ্য। পর্যটনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে প্রতিনিয়ত জানাচ্ছে সাদর সম্ভাষণ। এখানে আরও রয়েছে রাশি রাশি বালুচর আর নয়নভোলা ঘন সবুজ বনরাজি। দেশ-বিদেশের বিচিত্র পাখির কলরব, হৃদয় কাঁপানো পদ্মার গর্জন। মৎস্য শিকারে জেলেদের নৌকা নিয়ে পদ্মায় ছুটে চলা। পদ্মায় আছড়ে পড়া উত্তাল ঢেউয়ের তরঙ্গ। এসব ছাড়াও এখানে রয়েছে লালন শাহ সেতু ও হার্ডিঞ্জ সেতুর মধ্যখানে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য। বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ের সামনে রক্ষিত স্মৃতির পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া স্টিম ইঞ্জিন এবং সুদূর ভারত থেকে আগত কুরাইশ বংশধরদের ঐতিহাসিক ফুরফুরা শরীফ। হার্ডিঞ্জ সেতু নির্মাণকালে প্রকৌশলী রবার্ট উইলিয়াম গেল্সের ব্যবহৃত বাংলো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। সব মিলিয়ে পাকশী শহর ও পদ্মা নদীর আশপাশের দৃশ্য যেন কপোত-কপোতিদের ভালবাসাবাসির কল্পনার স্বর্গ। এখানকার নিস্বর্গ আর প্রকৃতির মধ্যে রয়েছে হারিয়ে যাওয়ার অপূর্ব সব সুযোগ। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে এখানে পদ্মা নদীর তীরে আজও সরকারীভাবে গড়ে ওঠেনি কোন পর্যটন কেন্দ্র। যদিও দ্রুততম সময়ে নগরায়ন আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার হয়ে এখানে আপনা-আপনি গড়ে উঠেছে এক স্বপ্নময় নতুন পর্যটন কেন্দ্র, যা দেখামাত্র এক লহমায় চোখ জুড়িয়ে যায়।

১৯৯৩ সালে সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি সাংবাদিক প্রতিনিধি দল বঙ্গভবনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কাছে পাকশীতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য সুপারিশ করে। সাবেক সরকারের বিমানমন্ত্রীও পাকশীতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়েও কোন কাজ করেননি। সে সময়কার পাকশী আর বর্তমানের পাকশীর মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান।

অনেকের মতে, পদ্মা নদীর গাইড বাঁধের ওপর শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা- এমনকি একটি আধুনিক পিকনিক স্পট নির্মাণ করা সম্ভব। যদিও সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই প্রতি শীত মৌসুমে পাকশীতে পিকনিক পার্টির ভিড় জমে। অথচ এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। পাকশীর ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে প্রতি বছর এখানে বসে বৈশাখী মেলা। আয়োজন করা হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। ১৯১০ সালে হার্ডিঞ্জ সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে পদ্মার কোলঘেঁষে পাকশী শহর গড়ে ওঠে। সেতু নির্মাণ শেষে শহরের মধ্যে গড়ে ওঠে বিভাগীয় রেলওয়ে কন্ট্রোল অফিস। এখান থেকেই দেশের অভ্যন্তরে ও ভারতবর্ষের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেন তদারকি করা হতো। তখন বিভাগীয় রেলওয়ে কন্ট্রোল অফিসের পাশেই পদ্মা নদীতে ছিল ঐতিহাসিক সাড়াঘাট। এ ঘাটে নিয়মিত এসে ভিড়ত দেশী-বিদেশী যাত্রী ও মালবাহী জাহাজ-স্টিমার। এ ঘাট থেকে নদীপথে সহজেই ভারতের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করা যেত। বর্তমানে সাড়াঘাটে দেশী-বিদেশী জাহাজ-স্টিমার না ভিড়লেও বিভিন্ন কারণে পাকশীর আকর্ষণ বেড়েই চলেছে। বিশাল এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে ইপিজেড। পাশেই নদীর ধার দিয়ে গড়ে উঠেছে একটি ভারতীয় কোম্পানির আবাসিক এলাকা ও বিশ্বের ২৮তম রূপপুর পরমাণু বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র, যার নির্মাণকাজ চলছে। এলাকাটি এখন রুশ নাগরিকদের পদভারে সব সময় সরগরম থাকে। প্রতি বছর শীত মৌসুমে উত্তর গোলার্ধ থেকে ছুটে আসা অনেক পাখি পাকশী অঞ্চলে থেকে যায়।

প্রায় সারাবছরই পাকশীতে জেলেদের কর্মব্যস্ততা লক্ষ্য করা যায়। গোটা শহরটা সবুজে ঘেরা থাকায় বিমানে উড্ডয়নের সময় মনে হয় শালিক পাখির বাসা আর হার্ডিঞ্জ সেতুকে মনে হয় বাঁশের তৈরি একটি সাঁকো। পাকশীর সঙ্গে দেশের সকল অঞ্চলের যোগাযোগ খুবই সহজ। বিমান, রেলপথ, সড়কপথ ও নদীপথে পাকশীতে আসা-যাওয়া সহজ। এছাড়াও এখানে রয়েছে পেপার মিল, আকর্ষণীয় রেলওয়ে, একাধিক সিঙ্গেল ও দ্বিতলবিশিষ্ট টানেল এবং ইপিজেডসহ আরও অনেক কিছু, যা সহজেই দর্শনার্থীদের মন কেড়ে নেয়।

নদীতে পালতোলা নৌকা, স্পিডবোট, কেরিট্রলার। এসবই নদী ভ্রমণের কাজে লাগে। পর্যটকরা কোথাও না গেলেও ব্রিটিশ প্রকৌশলী রবার্ট উইলিয়াম গেল্সের বাংলো এবং রেলওয় বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ের সামনে বিভিন্ন রঙে সজ্জিত ইংল্যান্ডের তৈরি বাষ্পচালিত ন্যারোগেজ ইঞ্জিনটি দেখতে যান। এ দুটি স্থানে না গেলে পর্যটকরা যেন স্বস্তি পান না। পাকশীতে নিরাপদ রাত কাটানোর জন্য সুব্যবস্থা রয়েছে। এখানে কয়েকটি এসি, নন-এসি গেস্ট হাউস ছাড়াও বিনোদনের জন্য রয়েছে টেনিস কোট, একাধিক সুইমিংপুল, খেলার মাঠ।