২০ হাজার কোটি টাকার ইলিশের বাণিজ্য

২০ হাজার কোটি টাকার ইলিশের বাণিজ্যএসএম আলমগীর: গত কয়েক বছর গড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন ইলিশ উত্পাদন হয়েছে দেশে। কিন্তু চলতি বছর ইলিশ আহরণ গত ২০ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছর চার লাখ টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে এবার ইলিশ আহরণ হয়েছে সাড়ে চার লাখ টন। এই ইলিশকে ঘিরে এবার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। মত্স্য অধিদফতর ও বাংলাদেশ মাত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংস্থা দুটির মতে, এর আগে ১৯৯৮ সালে দেশে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়ে। সূত্র জানায়, ইলিশ পাওয়া যায় বিশ্বের এমন ১১টি দেশের মধ্যে ১০টিতেই উত্পাদন কমছে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতি বছর উত্পাদন প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে আহরিত ইলিশের ৬০ শতাংশই উত্পাদিত হয় বাংলাদেশে। অন্যদিকে দেশে মোট মত্স্য উত্পাদনে এককভাবে ইলিশের অবদানই প্রায় ১৫ শতাংশ। আর মোট দেশজ উত্পাদনেও (জিডিপি) এ খাতের অবদান ১ দশমিক ১৫ শতাংশ।
ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকলেও প্রধান কারণ জাটকা নিধন বন্ধ করা এবং মা ইলিশ ধরা বন্ধ করা। বাংলাদেশ মাত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, সরকার ২০০৩ সাল থেকে জাটকা নিধন বন্ধ করে। আর ২০০৭ সাল থেকে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা বন্ধ করে। কিন্তু এতদিন এ নির্দেশনা ঠিকমতো মানা হতো না। গত বছর থেকে
সরকার জাটকা নিধন বন্ধ ও মা ইলিশ রক্ষার জন্য কঠোর অবস্থান নেয়। নদী ও সাগরে নিষিদ্ধ সময়ে যাতে জেলেরা না নামতে পারে তার জন্য কোস্টগার্ডের অভিযান জোরালো করে। এর সুফল পাওয়া গেছে এবার।
বাংলাদেশ মাত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান সকালের খবরকে বলেন, ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধির পেছনে সবার ঐকমত্য প্রচেষ্টা রয়েছে। এ ছাড়া এল-নিনোর প্রভাব, ভূমিকম্পের প্রভাব এবং ভারত থেকে বেশি পানি আসার প্রভাবও রয়েছে। তবে ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে জাটকা নিধন বন্ধ করা ও মা ইলিশ রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া। এ ছাড়া গবেষণার মাধ্যমে ইলিশের অভয়াশ্রম তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। এসব জায়গায় ইলিশের আগমন ঘটেছে বেশি। তিনি বলেন, এবার যে পরিমাণে ইলিশ আহরণ হয়েছে তার বাজার মূল্য ১৭ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার মতো।
তিনি আরও বলেন, ইলিশ বেশি উত্পাদন হওয়ায় ভরা মৌসুমে এবার বেশ কয়েক এলাকায় ইলিশ ফেলা দেওয়া ও নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যেহেতু ইলিশ সংরক্ষণে সরকার আরও কঠোর হচ্ছে, সেহেতু আগামীতে ইলিশের উত্পাদন আরও বাড়বে। এ কারণে ভরা মৌসুমে যাতে ইলিশ নষ্ট না হয় তার জন্য পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার গড়তে হবে। তা ছাড়া সরকার এখন ইলিশ রফতানি বন্ধ রেখেছে। উত্পাদন বাড়ায় রফতানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া যায় কি না সেটাও ভেবে দেখা দরকার।
বর্তমানে ইলিশ উন্নয়ন কার্যক্রম চার জেলার ২১ উপজেলা থেকে বাড়িয়ে ১২ জেলার ৫১ উপজেলায় বিস্তৃত করা হয়েছে। ২০১২ সালের ৩১ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইলিশ রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময়ের আগ পর্যন্ত পাঁচ বছরে ২২ হাজার ২২.৭৯ টন ইলিশ রফতানি করে ৯৪৪.০৪ কোটি টাকা আয় করে সরকার। এর মধ্যে ২০১২-১৩ সালে ৫২৩.২০ টনে ২৪.৩৭ কোটি টাকা রফতানি আয় হয়েছে। এ ছাড়া ২০১১-১২ সালে ৬ হাজার ১৭৩.৬৫ টনে ২৯৪ কোটি, ২০১০-১১ বছরে ৮ হাজার ৫৩৮.৭৭ টনে ৩৫২.৪৯ কোটি, ২০০৯-১০ সালে ৩ হাজার ১০৭.১৭ টনে ১২৪.১২ কোটি ও ২০০৮-০৯ বছরে ৩ হাজার ৬৮০ টনে ১৪৯.৬ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে।
মত্স্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ জানান, সরকারের পরিকল্পিত কর্মসূচির কারণেই ইলিশের উত্পাদন বেড়েছে। তিনি জানান, এ বছরের ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার। এ সময়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাবে। আর এই কর্মসূচি সঠিকভাবে পালন হলে আগামী বছর ইলিশের উত্পাদন আরও বাড়বে।
মত্স্য অধিদফতর জানায়, দেশের মোট মাছ উত্পাদনের ১৩ ভাগ যার আনুমানিক অর্থ মূল্য ১৫-২০ হাজার কোটি টাকা আসে ইলিশ মাছ থেকে। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণে সরাসরি এবং ২০-২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।
মাছ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে উত্পাদিত মোট ইলিশের ৬৫ ভাগই বাংলাদেশের। বাকি ১৫ শতাংশ ভারত, ১০ শতাংশ মিয়ানমার এবং বাকি ১০ শতাংশ আটলান্টিক, প্রশান্ত ও আরব সাগর তীরবর্তী দেশগুলোয় উত্পন্ন হয়। নদী গবেষণা কেন্দ্রের এক তথ্যে জানা গেছে, দেশের ১৫টি জেলায় ৮৫টি উপজেলায় ইলিশ উত্পাদন এলাকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জাটকা রক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা ও অভয়াশ্রমগুলোয় মা মাছ আহরণ বন্ধ রাখায় ইলিশ উত্পাদন বেড়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ৯ ভাগ, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ১০ ভাগ, ২০০৮ সালে ৩৮ ভাগ, ২০০৯ সালে ১৭ ভাগ, ২০১০ সালে ৩৩ ভাগ, ২০১১ সালে ৩৬ ভাগ, ২০১২-১৩ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৪ ভাগ ও ২০১৩-১৪ সালে ৫০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ফিশের তিন বছর ধরে চলা গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ধরা পড়া ইলিশের আকৃতি ও সংখ্যার এই বদল ২০১৩ সালে গড়ে ৫১০ গ্রাম, ২০১৪ সালে ৫৩৫ গ্রাম, ২০১৫ সালে ৬২৮ গ্রামের বেশি হারে ইলিশ ধরা পড়েছে। এটি আশার খবর বটে, এক কেজি গড় ওজনের ইলিশ মাছ বাংলাদেশে ফিরতে শুরু করেছে।
নদী কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১২ সালে ধরা পড়া ইলিশ ২০০ গ্রামের চেয়ে কম ২৫ শতাংশ, ২০১৩ সালে ২৩ শতাংশ, ২০১৪ সালে প্রায় ২০ শতাংশ, ২০১৫ সালে ১৯ শতাংশ ও ২০১৬ সালে ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান ও মাত্স্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাইদুর রহমান চৌধুরী জানান, ইলিশ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। মাছ সংরক্ষণ করা যাবে না। নদীগুলো ইলিশ উপযোগী কি না বা মাছ সংরক্ষণ মৌসুম কত দিন রাখতে হবে, সেটি জানতে গবেষণার প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকার যে অভয়াশ্রমের কথা বলছে, সেটিও কত দিন রাখা যাবে তাও অনিশ্চিত।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকার যে ক’দিন মাছ ধরা বন্ধ করেছে, সে সময়েই ইলিশ সর্বোচ্চ ডিম দেয় কি না তা জানা নেই। তাই কখন ইলিশ প্রচুর ঢুকছে সেটি জেনে কর্মসূচি নিতে হবে। পানি প্রস্তুত কি না, তাও খেয়াল রাখতে হবে।