চীন ও ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার

চীন ও ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদারদক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-ভারতের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগের সৃষ্টি করে চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ আজ সুপরিচিতি। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারত একসঙ্গে কাজ করার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে এটা রক্ষা করা উভয় দেশের পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। এরই প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর ৩০ বছর পর দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশে আগমন করেন। এ দুইদিনের সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত সূচনা হয়েছে বলে বাংলাদেশের মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক বন্ধুত্বের সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে এটাও নিঃসন্দেহে বলা যায়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশে সফরের মাধ্যমে তিনটি স্তরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ২৭টি এমওইউ সই, বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্য ১৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি। বর্তমানে আরো যেসব দেশের উন্নয়ন প্রকল্প চীনের সাহায্যে এগিয়ে যাচ্ছে সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের হাত নিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নে চীন এগিয়ে এসেছে। চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার। চীন বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতার হাত যেভাবে সম্প্রসারণ করেছে তা উল্লেখযোগ্য। উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরো সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর এক মাইলফলক। যদিও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে চীনের ভূমিকা ছিল বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের বিরুদ্ধে অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম লাল-সবুজ পতাকার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর চীন আস্তে আস্তে বুঝতে পারল দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের মধ্যে সুদৃঢ়।
বর্তমান সরকার জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যখন বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জিডিপি জোড় সংখ্যায় দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, চীনের বর্তমান রিজার্ভ ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। চীনের সঙ্গে যে সব চুক্তি হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা আরো সম্প্রসারিত হবে এবং ২০২১ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প বা ভিশন ২০২১ বাস্তবায়িত হয়ে মধ্যম আয়ের দেশ নয়, উন্নত মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে আরো উজ্জ্বলভাবে পরিচিত হবে বাংলাদেশ তা দৃঢ়ভাবে বলা যায়। অগ্রসরমান অর্থনীতির চাকা যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাধাগ্রস্ত না হয়, তবে দৃঢ়ভাবে বলা যায়, ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বে পরিণত হয়ে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়িত হবে।
নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারত আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে পরিচিত। ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নে দুই বিলিয়ন ডলারে সাহায্যে প্রতিশ্রুতবদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু ভারত আজ বিশ্বে ইকোনমিক জায়ান্ট হিসেবে পরিচিত। ভারত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রয়োজন। দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান অমীমাংসিত অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে। বর্তমান দুই দেশের সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীন ও ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদারভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আন্তরিক সদিচ্ছায় বন্ধুত্বের বন্ধন আরো সুদৃঢ় হবে এটাই বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা। কিন্তু বহুদিনের প্রতীক্ষিত সমস্যা তিস্তা নদীর চুক্তি আজো হয়নি। যদিও কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়শই বলা হয়, তিস্তা চুক্তি সহসাই হবে। কিন্তু আসলে নানা অজুহাত দেখিয়ে বহুদিনের প্রতীক্ষিত চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কারণগুলো যদি অনুধাবন করা যায় তাহলে এভাবে বলা যায়, কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। প্রধান কারণ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সম্মতি না পাওয়ার কারণে বিলম্বিত হচ্ছে। মমতা ব্যানার্জি আমাদের কাছে দিদি হিসেবে সুপরিচিত ও জনপ্রিয়। যেমনটি তিনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে জনপ্রিয় ও দিদি হিসেব সুপ্রিয়। তিনি বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার সফরে এসেছেন এবং দেখেছেন তিনি কত জনপ্রিয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে যোগদান করতে এসে জাতীয় প্রেসক্লাব সফর করেছিলেন। তখন তিনি দেখেছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকরা তার প্রতি কত আন্তরিক। জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের কক্ষে তার সঙ্গে প্রয়াত সাংবাদিক বেবী মওদুদের নেতৃত্বে সাংবাদিকরা খোলামেলা আলোচনায় তাকে আমরা বলেছিলাম, বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার মানুষের কাছে আপনি অগ্নিকন্যা হিসেবে পরিচিত হবেন। তিনি তাই হয়েছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কারণে বিশ্বজনমত গঠন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন জুগিয়েছিলেন যা বাংলাদেশের মানুষের কাছে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত করে আনার ব্যাপারে শ্রীমতী গান্ধী যে নিরলস ভূমিকা পালন করেছিলেন তা বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বাংলাদেশের মানুষ চিরদিন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষমতাকে দেখেছি তিনি যুব কংগ্রেসের নেতা হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছিলেন। যে মমতা দিদিকে আমরা পেয়েছি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিরলস পরিশ্রম করতে, বাংলাদেশের উন্নয়নে তার সহযোগিতা পাব না এটা বিশ্বাস করতে আমাদের খুবই কষ্ট হয়। তাই মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি অথবা আমাদের দিদিকে বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই আমাদের উভয় বাংলার মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে অনতিবিলম্বে ভারত বাংলাদেশের তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি করুন। এ কামনা ও বাসনা বাংলাদেশের মানুষের। তিস্তা চুক্তি হলে বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্ব আরো সুদৃঢ় হবে এবং ভারত বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নে অংশীদার হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের বন্ধুত্ব এবং উভয় সরকারের সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় দুই দেশের উন্নয়নের মডেল হিসেবে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে বাংলাদেশের জনগণের বিশ্বাস।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফর শেষে যোগ দেন ব্রিকস বিমসটেক সামিটে। চীনের প্রেসিডেন্ট ব্রিকস সম্মেলনে বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আজ বিশ্ব অর্থনীতি। যে কোনো দেশের অর্থনীতির অবস্থা যদি ঝুঁকিপূর্ণ বা বাধাগ্রস্ত হয় তবে ওই দেশের জনগণের অবস্থাও বিপদগ্রস্ত হয়। সেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা না দিতে পারলে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতেই পারে। এ কারণে ব্রিকস সম্মেলনে উপস্থিত নেতারা সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদকে শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের জন্য হুমকি উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তারা আরো দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, যারা সন্ত্রাসীদের অর্থ দিয়ে লালন-পালন করে এবং সমর্থন জোগায় তারাও শান্তিপূর্ণ ও উন্নয়নশীল বিশ্ববাসীর জন্য বিপজ্জনক। ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত অষ্টম ব্রিকস সম্মেলনে বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন ব্রিকসভক্ত ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নেতারা। এ সময় তারা সন্ত্রাসবাদের বৈশ্বিক হুমকির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনা করেন এবং কীভাবে এই সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদকে মোকাবিলা করা যায় তার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। বিশ্বে এখন সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ এবং চরমপন্থা যে বিপদ বাড়িয়েছে তা তারা চিহ্নিত করেছেন। আঞ্চলিক ও বিশ্বশান্তি এবং নিরাপত্তা ইস্যুতেও সহযোগিতা জোরদার করতে দায়বদ্ধতা প্রকাশ করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ আমন্ত্রণে ব্রিকস সম্মেলনে যোগদানকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সার্ক, সীমান্ত সমস্যা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে সহযোগিতার পাশাপাশি তিস্তা ইস্যু তুলে ধরেন। এ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে এবারো আশ্বাস দেয়া হয়েছে। এ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য হলো সুযোগের মধ্যে অংশীদারিত্ব হওয়া। বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার ভারত। তাই বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে সহযোগিতা করাই হবে দু’ দেশের মৈত্রীর চেতনাকে আরো শক্ত ভিত্তি চাওয়া। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে ৫০ দফার যে চুক্তি হয়েছিল তাতে তিস্তা চুক্তি দ্রুত সম্পাদনের প্রতিশ্রুতি ছিল। ২০১৫ সালে জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তা চুক্তির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ সঠিকভাবেই বলেছেন, দেশের উন্নয়নের অগ্রাধিকার দিয়ে চীনের পাশাপাশি ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে হবে। কারণ চীন ও ভারত উভয় দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা।

লেখক: সাংবাদিক ও ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ
দূতাবাসের সাবেক প্রেস মিনিস্টার