পরীক্ষিত নেতৃত্ব সফল সম্মেলন

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এবং পুরনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে এবং জাঁকজমকপূর্ণভাবেই সমাপ্ত হয়েছে। এই সম্মেলনকে ঘিরে সারা দেশে আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আগ্রহ, উদ্দীপনা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। যেহেতু আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দলের একটি বড় সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখনো বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে এ দলটি। কাজেই এ দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে ঘিরে স্বভাবতই শুধু দলীয় নেতাকর্মী সমর্থক নয়, সমগ্র রাজনৈতিক মহলে একটি আগ্রহ এবং কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এবার আওয়ামী লীগের এই ২০তম জাতীয় কাউন্সিল বিশেষ প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
যার জন্য আওয়ামী লীগের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ছিল এ সম্মেলনটিকে মানুষের চোখে পড়ার মতো, আলোড়ন তৈরি করার মতো করে করার। সেদিক দিয়ে আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।
সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলো নানা ধরনের খবর প্রচার করেছে। আমার মনে হয়, এটা একটা ব্যাপক আয়োজন ছিল। আমাদের দেশে এর আগে আর কোনো রাজনৈতিক দল এত বড়, এত জাঁকজমকপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল সম্মেলন করতে পারেনি। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, আওয়ামী লীগের মতো একটি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক দলের এত টাকা-পয়সা খরচ করে সম্মেলন করার প্রয়োজনীয়তা বা যৌক্তিকতা আছে কিনা? কিন্তু আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ তার সক্ষমতার পরিচয় দেয়ার জন্য এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সেদিক দিয়ে আমি বলব, সম্মেলন সফল হয়েছে।
এছাড়া আওয়ামী লীগ যে উদ্দেশ্যে এ সম্মেলন করতে চেয়েছে- শুধু দলের মধ্যে একটি নাড়া দেয়া নয়, বরং সামগ্রিকভাবে রাজনীতিতে এবং দেশের মানুষের মধ্যেও একটা জাগরণ তৈরি করা- সেদিক দিয়েও এ সম্মেলন শতভাগ সফল হয়েছে।
এখন আসা যাক, আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব প্রসঙ্গে। নানা ধরনের কৌতূহল ছিল দলের মধ্যে, বিভিন্ন ধরনের সংবাদও গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। পত্রিকায়ও কেউ কেউ বলেছিলেন, ব্যাপক চমক থাকবে। পুরনো এবং নতুনের সমন্বয়ে এমন একটি কমিটি তৈরি হবে, যা আগামী ২০১৯ সালে যে নির্বাচন, সেই নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেবে।
আমরা জানি যে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কতগুলো লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিণত করা, ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কিছু কর্মসূচি এবারের সম্মেলনে ঘোষিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ তিনি গড়তে চান এবং সে জন্য দেশে এখনো যারা হতদরিদ্র আছে, যাদের বাসস্থান নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই এ ধরনের মানুষের তালিকা তৈরি করার জন্য দলের নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।
আমি মনে করি, দলকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া, দলের জনপ্রিয়তা বাড়ানো, দলকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা- এসব লক্ষ্য নিয়ে কাজটি করার জন্য তিনি দলের নেতাকর্মীদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। এ কাজটি যদি সুন্দরভাবে সুচারুভাবে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা করতে পারেন এবং আগামী নির্বাচনের আগে এই যে গৃহহীনদের ঘর দেয়া, যাদের হতদরিদ্র অবস্থা তাদের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কর্মসংস্থান বা অন্যকোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা- এসব একটা বড় ঘটনা হিসেবেই দাঁড়াবে।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে একটি জিনিস মনে রাখতে হবে- সম্প্রতি ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণের একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, হতদরিদ্র ৫০ লাখ মানুষের কাছে এই চাল পৌঁছানোর কথা। কিন্তু ইতোমধ্যেই আমরা গণমাধ্যমে এমন অনেক খবর দেখেছি যে, এই চাল বণ্টনের ক্ষেত্রে কিছু কিছু অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে একটি কর্মসূচি নেয়া হয়, দলের কিছু খারাপ মানুষের কারণে যেন সেই উদ্দেশ্যটি ব্যর্থ না হয়- সেটা দেখাও দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব।
আমরা বড় ধরনের উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে এই জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে দেখলাম। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও দেখলাম যে, দলের ত্রুটি দুর্বলতা নিয়ে কেউ কোনো কথা সেভাবে বলেননি। এমনকি তৃণমূলের যারা কথা বলেছেন তারাও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসাই বেশি করেছেন বা সরকারের সাফল্যের কথাই বারবার বলেছেন। কিন্তু দল যে একেবারে সমস্যামুক্ত নয় বা দলের মধ্যে সাংগঠনিক পর্যায়ে কিছু দুর্বলতা আছে। সেই কথাগুলো সেভাবে আলোচনায় আসেনি বা সেগুলো থেকে উত্তরণের বিষয়েও খুব কথা বলা হয়েছে বলে আমি অন্তত শুনিনি বা গণমাধ্যমে খবর দেখিনি।
আমি মনে করি, একটি সম্মেলন শুধু নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য নয়, এই নেতৃত্ব কোন লক্ষ্যে পৌঁছবে এবং কিভাবে সেই লক্ষ্য অর্জন করবে সেটা নিয়েও আলাপ-আলোচনা হওয়া বাঞ্চনীয়। প্রকৃতপক্ষে, যে আয়োজন করে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো সেই আয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে মজবুত করে তুলতে হবে।
দলের সভানেত্রী পদে শেখ হাসিনার পুনর্নির্বাচন ছিল অবধারিত। এটা নিয়ে কারো মনে কোনো প্রশ্ন ছিল না। তিনি যদিও বারবার বলেছেন, এমনকি সম্মেলনেও বলেছেন যে, ‘৩৫ বছর আমি এই দায়িত্ব পালন করেছি, এখন নতুন নেতা নির্বাচন করা হোক’। কিন্তু কাউন্সিলররা তার এই বক্তব্য সমর্থন করেননি, তারা তাকেই আবার সভাপতি পদে নির্বাচিত করেছেন।
সাধারণ সম্পাদক পদে কে আসছেন এটা নিয়ে সবার মধ্যেই কৌতূহল ছিল, একবার শোনা গিয়েছিল যে, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আবার ৩য় বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন, কাউন্সিলের ২ দিন আগে থেকেই প্রচার হতে থাকে যে, সাবেক ছাত্রনেতা ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হচ্ছেন, এবং সেটাই হয়েছে। ওবায়দুল কাদের দলের মধ্যে একজন জনপ্রিয় মানুষ।
শোনা গেছে, সজিব ওয়াজেদ জয় এবার দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হবেন। কাউন্সিলের প্রথমদিন ২য় অধিবেশনে যে কয়েকজন জেলা প্রতিনিধি বক্তৃতা দিয়েছেন, তারাও জয়কে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বরণ করে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সম্মেলনের ২য় দিন জয় নিজেই সংবাদ মাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন, তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন, বিদেশে থেকেই তিনি দলের জন্য সময় দিতে চান, কাজ করতে চান, এখন যেভাবে করছেন। নেতৃত্বে তিনি এখনই আসতে চান না। আমরা জানি না শেষ পর্যন্ত তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাবেন কিনা?
আরেকটি কৌতূহল বা আগ্রহের বিষয় ছিল, সোহেল তাজকে নিয়ে। শোনা গিয়েছিল তিনিও দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসবেন। এখনো দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্পাদকমণ্ডলীর কমিটির পূর্ণাঙ্গ নাম প্রকাশ হয়নি। কাজেই প্রকাশ হলে বোঝা যাবে সোহেল তাজ আসলেই নেতৃত্বে আসছেন কিনা।
শেখ হাসিনার বর্তমানের যে জনপ্রিয়তা, সম্মেলনে উপস্থিত বিদেশি প্রতিনিধিরাও যেভাবে তার এবং বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন, সেটা এক কথায় তুলনাহীন, তিনি বাংলাদেশকে যেমন ভিন্ন মর্যাদায় নিয়েছেন, তেমনি তার রাজনৈতিক অবস্থানও একটি ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছেছে। কাজেই এটা বলা যায় যে, তার উপস্থিতিতে তার বর্তমানে আওয়ামী লীগে যারাই নেতা নির্বাচিত হবেন, যারাই যে পদে থাকবেন, তারা তার ছায়াতে এবং পরামর্শেই কাজ করবেন।
অনুলিখন : মো. জিল্লুর কামাল