উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ

সদ্য জন্মলাভ করা একটি শিশু। নয় মাসের এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তার জন্ম। পিতা সে শিশুটির নাম রাখলেন বাংলাদেশ। পিতার হাত ধরে আস্তে আস্তে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ে উঠছিল শিশুটি। কিন্তু জন্মের মাত্র চার বছরের মাথায় পিতাকে ঘাতকের দল নৃশংসভাবে হত্যা করে এতিম করে দিয়েছিল শিশুটিকে। তার পরের গল্প অবহেলার, অযত্ন আর চরম নির্মমতার…।

’৭৫-এ নির্মমভাবে স্ব-পরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর স্বাধীনতা-বিরোধীরা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠে বাংলার বুকে। যে ‘জয় বাংলা’ জয়ধ্বনি আকাশে-বাতাসে প্রকম্পিত করে বাংলাদেশের জন্ম, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সাথে সাথে সেই জয় বাংলাকে মুছে দিয়ে রেডিওতে পাকিস্তানের আদলে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” নামে কুিসত এক স্লোগানের আবর্তন করে ঘাতকের দল। খুনিরা বঙ্গবন্ধুর রক্তকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু তাঁর দুই কন্যা দেশের বাইরে থাকায় খুনিদের ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে যায়। এরপর কেটে যায় অনেক বছর। দেশে চলতে থাকে চরম বিশৃঙ্খলা, লুটপাট আর দুর্নীতির মহোত্সব। সেই ছোট্ট শিশুর কাঁধে একের পর এক চেপে বসে অগণতান্ত্রিক সরকার ও স্বৈরশাসক। জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানাকে দেশে আসতে বাধা দেওয়া হয় বারংবার। অবশেষে সকল বাধা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে আসেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। দায়িত্ব নেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির। দেশ ফিরে পায় তার আপন আত্মীয়কে…।

চারদলীয় জোট সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভয়-ভীতির কারণে দেশে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিলো তা কাটিয়ে উঠতে শেখ হাসিনাকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। ২০০৮ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করে শেখ হাসিনা শুরু করেন এক নতুন অভিযাত্রা। দিন বদলের সনদ হাতে নিয়ে দেখিয়েছেন একের পর এক চমক। ২০০৮-২০১৪ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে দেশ বিদ্যুত্ উত্পাদনে ব্যাপক সক্ষমতা অর্জন করে যা দেশের বিভিন্ন ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে যোগ করে নতুন মাত্রা। এছাড়াও গড়ে ছয় শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন, পাঁচ কোটি মানুষকে মধ্যবিত্তে উন্নীতকরণ, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে জলসীমা চুক্তির বিরোধের নিষ্পত্তি, প্রতি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন, মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের মাধ্যমে বই উত্সব চালু, কৃষকদের জন্য কৃষিকার্ড, ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা, ১৬০০০ কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন,দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৩৮.৪ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৪.৩ শতাংশ হ্রাস করে নিয়ে আসে আওয়ামী লীগ সরকার। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার এবং সাজা নিশ্চিত করে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এ মেয়াদে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সফলতা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের আইনের সম্মুখীন করে তাদের বিচার নিশ্চিত করে স্বাধীন বাংলাদেশের কলঙ্ক মুছে দিয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। দেশ গঠনে তাঁর নানামুখী পদক্ষেপ সারাবিশ্বে প্রশংসিত হতে শুরু করে এ মেয়াদে। বাংলাদেশ পরিণত হয় উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে। ২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্সের স্পিকার জন ব্রেক্রো এমপি প্রধানমন্ত্রীকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে দূরদর্শী নেতৃত্ব, সুশাসন, মানবাধিকার রক্ষা, আঞ্চলিক শান্তি ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে অনবদ্য অবদানের জন্য গ্লোবাল ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড প্রদান করেন। ২০১২ সালে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বিশেষ অবদানের জন্য আইএনইএসসিও ১৬ জুন প্রধানমন্ত্রীকে কালচারাল ডাইভারসিটি পদকে ভূষিত করে। ২০১৩ সালে খাদ্য নিরাপত্তা এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ অবদানের জন্য জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর সাউথ-সাউথ কো-অপারেশন, ‘একটি বাড়ি ও একটি খামার প্রকল্প’ ভারতের নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত তথ্যপ্রযুক্তি মেলায় সাউথ এশিয়া ও এশিয়া প্যাসিফিক ‘মান্থন অ্যাওয়ার্ড’ এবং জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) দরিদ্রতা, অপুষ্টি দূর করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করায় ‘ডিপ্লোমা অ্যাওয়ার্ড’ পদকে ভূষিত করে শেখ হাসিনাকে। ২০১৪ সালে নারী ও শিশু শিক্ষা উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য ইউনেস্কো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘শান্তিবৃক্ষ পদক’ পুরস্কারে ভূষিত করে। খাদ্য উত্পাদন ও তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটি প্রধানমন্ত্রীকে এই সম্মাননা সার্টিফিকেট প্রদান করে।

২০০৮-২০১৪ মেয়াদের শেষের দিকে বিএনপি-জামায়াত জোট দেশে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ক্ষমতালোভী এ জোট কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে শেষে আক্রমণ করে বসে দেশের সাধারণ মানুষের উপর। প্রতিদিন তারা চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে দেশের মানুষের প্রতি তাদের ক্ষোভ ঝাড়তে থাকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত কঠোরভাবে তাদের দমন করে জনসাধারণের নিরাপত্তা বিধান করেছেন।

২০১৪’র ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে তৃতীয়বারের মত ক্ষমতা গ্রহণের পরে গোটা বিশ্বে শেখ হাসিনা পরিচিতি পান বিশ্বনেত্রী হিসেবে। দেশের জনগণের স্বপ্ন পদ্মা সেতু যখন নানামুখী ষড়যন্ত্রে ডুবে যেতে শুরু করেছিল তখন বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার এক সাহসী পদক্ষেপ নিলেন। সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল পদ্মা সেতুর কাজ এবং এই লেখাটি যখন লিখছি তখন পদ্মা সেতুর ৩৫% কাজ ইতোমধ্যেই শেষ! পদ্মা সেতুর মতোই দেশের সকল ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে চলছে সমান তালে কাজ। যানজট নিরসনে নেত্রী গ্রহণ করেছেন একের পর এক পদক্ষেপ, নির্মাণ করে চলেছেন ওভার ব্রিজ, ফ্লাইওভার, ফোর লেন হাইওয়ে থেকে শুরু করে এইট লেন হাইওয়ে, মেট্রো রেল, এক্সপ্রেস ওয়ে থেকে শুরু করে উন্নত বিশ্বের সকল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা! ইতোমধ্যেই দেশ পরিণত হয়েছে মধ্যম আয়ের দেশে। শের শাহের আমলের পরে এই দেশে কবে ১০ টাকায় উন্নতমানের চাল পাওয়া যেত সেটি ইতিহাস ঘেঁটে দেখার বিষয়। শেখ হাসিনার সরকার আজকে তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকার ১০ টাকা কেজি চাল নিম্ন-আয়ের মানুষদের প্রদান করছে। দেশে করা হয়েছে অর্থনৈতিক জোন। এ তো গেল ডেভেলপমেন্ট সেক্টরের কথা। বিশ্ব দরবারে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় জাতিসংঘের পরিবেশ-বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য জাতিসংঘ ‘আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার’ লাভ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেয়া হয়েছে। নোবেল পুরস্কার যে ছয়টি বিষয়ে দেয়া হয়, সেখানে পরিবেশ নেই। তবে জাতিসংঘের পরিবেশ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ আখ্যা পেয়ে থাকে পরিবেশের নোবেল হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বছর পরিবেশ বিষয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ সেই পুরস্কার পেয়েছেন। গত মে-তে জাপানে অনুষ্ঠিত জি-৭ আউটরিচ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ছিলেন সকলের কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে দেশের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা শেখ হাসিনার কাছে দিন বদলের এই চমকের রহস্য শিখতে চেয়েছেন! শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ দেখতে একে একে বাংলাদেশ সফর করছেন বিশ্ব মোড়লরা। এইতো গত শুক্রবার চীনের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। গত ৩০ বছরে এই প্রথম কোনো চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করেছেন। নিঃসন্দেহে দেশরত্ন, বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা এবং গঠনমূলক মৈত্রী-প্রিয় দৃষ্টান্তমূলক কূটনীতিক সাফল্যের প্রমাণ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই ঐতিহাসিক সফর। এর দুইদিন পরেই আবার এলেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। তিনি এসে রেসিপি চাইলেন! কিসের রেসিপি? দিন বদলের রেসিপি কিভাবে এত দ্রুত বাংলাদেশের চিত্র বদলে গিয়েছে, কিভাবে এত দ্রুত গড়ে উঠেছে ডিজিটাল বাংলাদেশ, সেটিই তিনি জানতে চাইলেন!

জঙ্গিবাদ রুখতে যেখানে অন্যান্য দেশ রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে সেখানে হলি আর্টিজনে জঙ্গি হামলার মাত্র তিন মাসের মাথায় সবকিছু স্বাভাবিক করে নিয়ে এসেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্সের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। জঙ্গিবাদের কবলে পড়ে বহু দেশ আজ ভয়াবহ দিন কাটাচ্ছে সেখানে জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উন্নতির শীর্ষে।

Views: 8