বিমান পথে বিপ্লব ॥ হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প

ষাট হাজার কোটি টাকার বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট। চৌদ্দ হাজার কোটি টাকার থার্ড টার্মিনাল। দুই হাজার কোটি টাকার রাডার সিস্টেম। এক হাজার কোটি টাকার সিলেটের ওসমানী ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত এয়ারপোর্টের রানওয়ে শক্তিশালীকরণ। ছয় শ’ কোটি টাকার কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিকীকরণ। সাড়ে পাঁচ শ’ কোটি টাকায় খানজাহান আলী এয়ারপোর্ট। পাঁচ শ’ কোটি টাকায় সৈয়দপুর বিমানবন্দরের উন্নয়ন। ১৮৮ কোটি টাকার নিরাপত্তা প্রকল্প।

এই হচ্ছে বাংলাদেশ সিভিল এ্যাভিয়েশনের নেয়া মেগা প্রজেক্টস। এগুলো সম্পন্ন হলে এ দেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম হাব। এ্যাভিয়েশন সেক্টরে এভাবেই ঘটতে যাচ্ছে বিপ্লব। বিপুল সম্ভাবনার এসব প্রকল্পের মধ্যে সরকারের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, কক্সবাজার এয়ারপোর্ট নির্মাণ ও রাডার স্থাপন কাজ উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরের জোনাল হাব ও খানজাহান আলী এয়ারপোর্ট নির্মাণের কাজ শেষ না হলেও বাস্তবায়নের পথে থাকবে। দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন কাজ আগামী তিন বছরের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়েই চলছে কাজ। প্রধানমন্ত্রী যে কোন মূল্যে এই এয়ারপোর্টের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করতে আগ্রহী। সেটা মাথায় রেখেই এ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছে সিভিল এ্যাভিয়েশনের প্রকৌশল বিভাগ। এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সিভিল এ্যাভিয়েশনের বর্তমান চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গনি চৌধুরী, মেম্বার (অপস) এয়ার কমোডর মোস্তাফিজুর রহমান, পরিচালক উইং কমান্ডার জিয়াউল কবীর চৌধুরী ও প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর নেতৃত্বে প্রকল্পগুলোর সার্বিক তদারকি চলছে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আবুল কালাম আজাদ এসব প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নে সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন, যাতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই উদ্বোধন করা যায়। মূলত এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে দেশের এ্যাভিয়েশন খাত। নবদিগন্তের সূচনা হবে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ যান চলাচলে। দুবাই হংকং সিঙ্গাপুরের মতো হাব গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা থেকেই প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

কেমন হবে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট ॥ মেগা প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও আশ্চর্যজনক হচ্ছে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট। গত মাসে এ প্রকল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদনের কাজ দেয়া হয়েছে জাপানী নির্মাণ সংস্থা নিপ্পনকে। ১২০ কোটি টাকার এ সমীক্ষার কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে চারটি স্থানে জরিপ চালানো হবে। যেটা সার্বিক বিচারে উপযোগী হবে সেটাই নির্ধারণ করা হবে। তবে সরকারের পছন্দের তালিকায় রয়েছে- পদ্মা সেতুর দক্ষিণপ্রান্তে শরীয়তপুর জেলার চর জানাজা। একটি উপযোগী স্থান বাছাই, নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয়, সময় ও অবকাঠামোগত সুবিধাদি তৈরি করতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হতে পারে- তারও ধারণাপত্র থাকবে সমীক্ষায়। এ সমীক্ষায় চূড়ান্ত করা হবে বর্তমান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দশটি বিমানবন্দরের সঙ্গে তুলনামূলক অত্যাধুনিক একটি আকর্ষণীয় বিমানবন্দর নির্মাণ করা।

সিভিল এ্যাভিয়েশন প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট শুধু সিভিল এ্যাভিয়েশন নয়Ñ গোটা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প। কমপক্ষে দুটো পদ্মা সেতুর সমান ব্যয়ে নির্মিত হবে এই এয়ারপোর্ট। আগামী বছরের ডিসেম্বরে সমীক্ষা প্রতিবেদন হাতে পেলে সরকার খুব দ্রুতগতিতে সিদ্ধান্ত নেবে। পরবর্তী তিন মাসের মধ্যেই নক্সা ও অবকাঠামোগত সব স্থাপনার বিষয় চূড়ান্ত করা হবে। তারপর অর্থাৎ ২০১৯ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্টের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ চলছে।

সিভিল এ্যাভিয়েশনের প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী জনকণ্ঠকে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট হবে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ও আকর্ষণীয় এক স্থাপনা। এর নান্দনিক নির্মাণশৈলী হবে অভূতপূর্ব। আগামী এক শ’ বছরের পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়ে সাজানো হবে এর অবকাঠামো। এটির ব্যয় কতটা হবে সেটা অংক করে আনুমানিক ধারণা দেবে সমীক্ষা প্রতিবেদনের কাজ পাওয়া নিপ্পন কোম্পানি। জাপানের এ কোম্পানি ঢাকায় ব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছে। সমীক্ষা কাজ শুরুর আগে নিজস্ব নিরাপদ অফিস গুছাচ্ছে নিপ্পন। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ওই কোম্পানি যাবে সাইট পরিদর্শনে।

বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্টের সম্ভাব্য স্থান, নির্মাণ ব্যয়, সময়সীমা ও মডেল কেমন হতে পারে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী জনকণ্ঠকে বলেন, এসব প্রশ্নের জবাব তৈরির কাজই দেয়া হয়েছে জাপানের শীর্ষ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান নিপ্পনকে। নিপ্পনের সমীক্ষা প্রতিবেদন যত দ্রুত পাওয়া যাবে, তত দ্রুত এ প্রকল্পের বা এয়ারপোর্টের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করা সম্ভব হবে। উপযুক্ত স্থান নির্ধারণের জন্য দেশের চারটি এলাকা যেমন ভালুকা, পদ্মার দক্ষিণের শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও মুন্সীগঞ্জের একটি এলাকা যাচাইবাছাই করে প্রকল্পের উপযোগী একটি গ্রহণযোগ্য স্থান নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে অনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। কেননা আগামী এক শ’ বছরের পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে তৈরি করা হবে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট। ওই এক শ’ বছরে দেশের সম্ভাব্য জনসংখ্যা, যাত্রী পরিসংখ্যান কী হবে, যাতায়াত ব্যবস্থা কতটা উন্নত হবে, বিশেষ করে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে ওঠা অন্যান্য যাতায়াত অবকাঠামো সুবিধার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এয়ারপোর্টের মডেল তৈরি করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্টের জন্য যে পরিমাণ জমির দরকার- সেটা বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে সহজে পাওয়া যাবে সেটার ওপর নির্ভর করছে সবকিছু।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে একজন এ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ জানান, চারটি স্থানের কথা ওঠে আসলেও প্রাধান্য দেয়া হবে জমির সহজলভ্যতাকে। ভালুকায় জমি পাওয়া গেলেও সেটা দেশের একপ্রান্তে থাকায় আকাশসীমা ব্যবহার নিয়ে জটিলতা রয়েছে। সে কারেণ এটা প্রথমেই বাদ পড়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ- স্বপ্নের পদ্মা সেতুকেন্দ্রিকই বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট নির্মাণ করা। এ বিষয়টা বিবেচনায় শরীয়তপুরের চর জানাজাই এখন পর্যন্ত এ বিবেচনা শীর্ষে। কেননা এখানেই রয়েছে প্রায় ত্রিশ হাজার একর খাসজমি, যা দেশের আর কোন এলাকায় নেই। জমি হচ্ছে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। এর আগে মুন্সীগঞ্জের আড়িয়ল বিলে জমি খুঁজতে গিয়ে সরকারকে পশ্চাদবরণ করতে হয়। কারণ ওখানে ছিল কৃষিজমি। চর জানাজায় ত্রিশ হাজার একর খাসজমি রয়েছে। বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্টের জন্য দরকার হবে বড় জোর ১২ হাজার একর জমি। এ জমি এ্যাকোয়ার করতে হবে না। এসব বিবেচনায় সবচেয়ে উপযোগী স্থান হতে পারে চর জানাজা।

সিভিল এ্যাভিয়েশন সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট আগামী এক শ’ বছরের পরিকল্পনা বিবেচনায় নেয়া হলেও সেটা হবে ধাপে ধাপে। প্রথম ধাপে আগামী ত্রিশ বছরে দেশের এ্যাভিয়েশন সেক্টর কতটা বৃদ্ধি পাবে, কত উড়োজাহাজ ওঠানামা করার প্রয়োজনীয়তা থাকবে সেটা বিবেচনায় রেখে এয়ারপোর্টের নক্সা তৈরি করা হবে। এমনভাবে সেটা করা হবে যাতে এক শ’ বছরের সম্ভাব্য সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও সেটা করা সম্ভব। যেটা বর্তমান শাহজালাল বিমানবন্দরে নেই। সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে সিভিল এ্যাভিয়েশন এখনই তেমন কোন মন্তব্য না করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বর্তমান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেসব অবকাঠামোগত সুবিধা আছে তেমন একটি এয়ারপোর্ট তৈরি করতেও কমপক্ষে ষাট হাজার কোটি টাকা লাগবে। তারপর বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট থেকে গুলিস্তানের জিরো আওয়ার পর্যন্ত বিশেষ যাতায়াত অবকাঠামো তৈরি করতেই লাগবে আরও প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা। চর জানাজায় বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট নির্মাণ করা হলে সেখান থেকে গুলিস্তান ও বর্তমান শাহজালাল পর্যন্ত তৈরি করা হবে উড়ন্ত সেতু, বিশেষ রেল ও অন্যান্য সড়ক। যা শুধু বঙ্গবন্ধু এয়ারর্পোর্টকেন্দ্রিকই তৈরি করা হবে। এজন্য এর আনুমানিক ব্যয় কমপক্ষে ষাট হাজার কোটি টাকা ধরেই প্রকল্পে নামতে হবে। ধাপে ধাপে করলেও এ প্রকল্পটি শেষ করতে কমপক্ষে দশ বছর সময় লাগতে পারে। বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্টের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন আনুষ্ঠানিকভাবে কাজে নামার আগে এ ধরনের তথ্যাদি সংগ্রহ করছে।

থার্ড টার্মিনাল ॥ বহুপ্রতীক্ষিত থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের লাগোয় দক্ষিণপ্রান্ত থেকে শুরু করে পদ্মা ওয়েল ডিপো পর্যন্ত। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এ প্রকল্পের কাজ অনেকটা এগিয়েছে। এরই মধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে থার্ড টার্মিনালের মূল নক্সা ও মডেল। প্রায় চৌদ্দ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজ করতে যাচ্ছে জাইকা। এর আগে সিভিল এ্যাভিয়েশন নিজস্ব অর্থায়নে একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে থার্ড টার্মিনালের সমীক্ষা প্রতিবেদন ও নক্সা তৈরি করে। জাইকা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর সেই নক্সাই অনুমোদন করে। এখন অন্যান্য কারিগরি মূল্যায়নের কাজ করছে। আগামী বছরের মাঝামাঝি থার্ড টার্মিনালের মূল দরপত্র ডাকা হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে কার্যাদেশ দেয়ার পর ২০১৮ সালের মধ্যে কাজে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে সিভিল এ্যাভিয়েশনের।

এ সম্পর্কে প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দুু বিকাশ গোস্বামী জনকণ্ঠকে বলেন, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের অনুমিত সময়সীমা তিন বছর। তবে কাজ শুরু করা গেলে আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগেই আংশিক হলেও উদ্বোধন করা যাবে। সে লক্ষ্য নিয়েই সিভিল এ্যাভিয়েশন বেশ তৎপর রয়েছে।

অনুমোদিত নক্সায় দেখা যায়, এখানে থাকছে বোর্ডিং ব্রিজ। তিন তলাবিশিষ্ট একটি টার্মিনালে রাখা হয়েছে অত্যাধুনিক ডিজিটালাইজড সিস্টেম চেকইন, ইমিগ্রেশন ও প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জ। এ টার্মিনাল থেকে বাইরে যাতায়াতের জন্য থাকছে বিশেষ টানেল, যা দিয়ে বিমানবন্দরে গোলচক্করের সংলগ্ন প্রতিটি সড়ক ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ রাখা হয়েছে।

এদিকে থার্ড টার্মিনালের প্রস্তাবিত স্থানে বেসরকারী এয়ারলাইন্স ও হেলিকপ্টার সার্ভিসের স্থাপনাগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার চূড়ান্ত নোটিস দেয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ডেকে সিভিল এ্যাভিয়েশন আগামী একবছর সময় বেঁধে দিয়েছে।

সিভিল এ্যাভিয়েশন প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ কাজ বলতে শুধু একটি ভবন আর কয়েকটি বোর্ডিং ব্রিজ বোঝায় না। এগুলো ছাড়াও পাওয়ার হাউস, সাব-স্টেশন, বিভিন্ন ফ্যাসিলিটিজ, কমপক্ষে তিনটি কানেক্টিং টানেল ও ফ্লাইওভার, বর্তমান ভিআইপি লাউঞ্জ ও অন্যান্য স্থাপনা উত্তরদিকে স্থানান্তর করার মতো আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে। এসব মিলিয়েই আনুমানিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা।

জানা যায়, বর্তমানের অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল ভবন, ভিভিআইপি লাউঞ্জ, ৬ বেসরকারী হেলিকপ্টারের হ্যাঙ্গার, একটি ফ্লাইং ক্লাব সরানোর জন্য এরই মধ্যে নোটিস ও এক বছর সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। এগুলো সরিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের সর্ব উত্তরপ্রান্তের কার্গো এলাকায় প্রতিস্থাপন করার জন্য জমিও দেয়া হয়েছে। বর্তমান আমদানি ও রফতানি এলাকায় সরিয়ে নেয়া হবে শাহজালালের অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল ভবন।

রাডার ও এটিসি ॥ আধুনিক বিশ্বের নিরাপদ বিমান চলাচলের জন্য রাডার ও এয়ারট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম প্রধান বিবেচ্য স্থাপনা। এ্যাভিয়েশন জগত যতটা এগিয়ে যাচ্ছে- রাডার ও ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেমও ততই আধুনিক হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের তাল মিলিয়ে সিভিল এ্যাভিয়েশনও হাতে নিয়েছে বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প। ইতোমধ্যে পিপিপির আওতায় ডাকা হয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরের রাডার ও কন্ট্রোল টাওয়ার সিস্টেমের দরপত্র, যার মূল্যায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এরই মধ্যে কারিগরি মূল্যায়ন শেষ হয়েছে। এখন চলছে আর্থিক মূল্যায়নের কাজ। আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যেই আর্থিক মূল্যায়নের কাজ শেষে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

এ সম্পর্কে জানা যায়- এ জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র মূল্যায়ন করতে দুই জন বিদেশী বিশেষজ্ঞ এনেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তারা হলেন, ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) সার্ভিলেন্স সিস্টেম এক্সপার্ট রোলান্ড সলনার ও একই সংস্থার এটিএম (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) ও সিএনএস (কমিউনিকেশন নেভিগেশন সার্ভিলেন্স) বিভাগের বিশেষজ্ঞ গ্রে ডেনিশন। রাডার ও কন্ট্রোল টাওয়ার নির্মাণ কাজের জন্য জমা হওয়া দরপত্র ও দরপত্রে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই-বাছাই করে বেবিচককে একটি রিপোর্টও দিয়েছেন তারা । এছাড়া তারা শাহজালালের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেবেন।

জানা যায়, বাংলাদেশে রাডার ও কন্ট্রোল টাওয়ার নির্মাণের কাজটি এটাই প্রথম। তাই এ ব্যাপারে কোন ধরনের ঝুঁকি নেয়া হয়নি। কোন বিতর্ক ও সমালোচনা যাতে দেখা না দেয় সেজন্য কঠোরভাবে নিয়মনীতি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্যই এ দুজন বিদেশীকে ডেকে এনে মূল্যায়ন করা হচ্ছে দরপত্রের সব কাগজপত্র।

মৃত প্রায় এ প্রকল্পটিকে পুনরুজ্জীবন প্রদানকারী সিভিল এ্যাভিয়েশানের পরিচালক (ফ্লাইট সেফটি) উইং কমান্ডার জিয়াউল কবীর চৌধুরী বলেন- এ ধরনের দরপত্র মূল্যায়ন করার জন্য ে দেশী বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করলে কোন বিভ্রান্তি থাকবে না। মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও নিখুঁত হবে। দুই সদস্যবিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ দলটি ইতোমধ্যেই ঢাকায় এসে রাডার ও কন্ট্রোল টাওয়ার সিস্টেমের পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করেছেন। পাশাপাশি পরিদর্শন করেছেন রাডার প্রতিস্থাপনের স্থানটিও। এ বিষয়ে তারা একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদনও জমা দিয়েছেন। তাতে তারা বেশ সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেছেন-অত্যন্ত স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পিপিপির আওতায় রাডার ও এটিসির দরপত্র প্রক্রিয়ার কাজ করা হচ্ছে। বহুল আলোচিত এ রাডারের জন্য দেয়া আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিশ্বের নামী-দামী চারটি কোম্পানি অংশ নেয়। প্রাথমিক বাছাইয়ে দুটি দরপ্রস্তাব ননরেসপন্সিভ হয়। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠান কারিগরি মূল্যায়নের জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল পিপিপির (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) মাধ্যমে রাডার ব্যবস্থাপনার প্রকল্প করার জন্য একটি আনসলিসিটেড প্রস্তাব পায়। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে এবং আর্থিক ব্যয়ের সাশ্রয় বিবেচনা করে সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নতুন রাডারসহ এয়ার ট্্রাফিক ব্যবস্থপনা সংস্কারের প্রকল্পটি পিপিপির মাধ্যমে করার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারী ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী সিএএবি কর্তৃপক্ষ ২০১৩ সালের ৩ অক্টোবর দরপত্রের স্পেসিফিকেশন তৈরির জন্য পিপিপি অফিসের সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক কয়েকটি কমিটি করে দেয়। কমিটি আন্তর্জাতিক সিভিল এ্যাভিয়েশন সংস্থার সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে দরপত্রের স্পেসিফিকেশন দাখিল করে। দীর্ঘ ৭ মাস ধরে সিএএবি, পিপিপি সেল ও আন্তর্জাতিক সিভিল এ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশনের প্রতিনিধিরা দরপত্রের ডক্যুমেন্ট প্রস্তুত করে। ২০১৪ সালের ২৮ মার্চ রিকোয়েস্ট ফর ইন্টারেস্ট প্রকাশিত হয়। এতে ১০টি দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করে। দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এভারশেড, ইউকে দরপত্রটির ডকুমেন্টের লিগ্যাল ভেটিং করে। গত বছর ৬ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক সিভিল এ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও) দরপত্রটির ডকুমেন্টের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। গত বছরের ৮ নবেম্বর দরপত্র আহবান করা হয়। প্রায় সাতবার দরপত্রের তারিখ পেছানো হয়। সর্বশেষ গত ২২ জুন দরপত্র জমা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে গত বছরের ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর সম্ভাব্য ঠিকাদারদের উপস্থিতিতে প্রিবিড সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশী-বিদেশী ১৭টি স্স্থংার প্রতিনিধি অংশ নেয়। প্রিবিড সভা শেষে সিএএবি সাইট ভিজিটের তারিখ নির্ধারণ করে। এতে ১৬টি সংস্থা অংশ নেয়। গত ২২ জুন দেশী-বিদেশী মোট ৪টি প্রতিষ্ঠান দর প্র্রস্তাব জমা দেয়। এর মধ্যে মেসার্স এরোনেস ইন্টারন্যাশনাল ফ্রান্সের থ্যালেস, মেসার্স করিম এ্যাসোসিয়েটস্ কানাডার রেথিয়ন, উইংস্ এ্যাভিয়েশন স্পেনের ইন্দ্রা এবং চতুর্থ প্রতিষ্ঠান মেসার্স গেকী তাদের প্রস্তাবে টোশিবার রাডার স্থাপনের প্রস্তাব জমা দেয়। প্রাথমিক বাছাইয়ে দুটি প্রস্তাব ননরেসপন্সিভ হয়। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠান কারিগরি মূল্যায়নের জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়।

জানা যায়, এখন চলছে এই বৃহৎ প্রকল্পটির দরপত্র কারিগরি মূল্যায়নের কাজ। আগামী দু’সপ্তাহের মধ্যে সিভিল এ্যাভিয়েশন মূল্যায়ন চূড়ান্ত করে প্রতিবেদন পাঠানো হবে মন্ত্রণালয়ে। তারপর সেটা যাবে অর্থ ও ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে। সেখানকার অনুমোদনের পর ডিসেম্বরের মধ্যেই দরপত্রের কার্যাদেশ দেয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন এক সদস্য। প্রকল্পটি নিয়ে প্রতিটি ৩ সদস্য করে মোট ৯টি কারিগরি সাবকমিটি রিপোর্ট তৈরি করেছে। বিদেশী বিশেষজ্ঞরা তাদের সব কমিটির সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন।

ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশনের গাইডলাইন্স অনুযায়ী ২০১৭ সালের মধ্যে বিশ্বের সব বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি), এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে যুগোপযোগী করতে হবে। এরই অংশ হিসেবে বেবিচক এই প্রকল্প হাতে নেয়। এই প্রকল্পে প্রাইমারী ও সেকেন্ডারি রাডার স্থাপন, ওয়াইড এরিয়া মাল্টিলেটারেশন (ডব্লিউএএম) ও এডিএস-বি স্থাপন, এটিএস সেন্টার আপগ্রেড, কন্ট্রোল টাওয়ার বিল্ডিং স্থাপন, ভিএইচএস, এক্সটেন্ডেট ভিএইচএস, এইচএফ, মাস্টার ক্লক, আরসিএজি, রেকর্ডিং সিস্টেম, ভিসিসিএস স্থাপন করা হবে।

সর্বাধুনিক রাডার ও কন্ট্রোল টাওয়ার স্থাাপনের এই প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর দফতরাধীন পিপিপি সেলের প্রথম আনসলিসিটেড প্রকল্প। পিপিপির মাধ্যমে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে সিএএবি এর কোন অর্থ ব্যয় হবে না। উল্টো আগামী ২০ বছরে সরকার ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ আয় করতে পারবে। পিপিপির আওতায় কার্যাদেশ পাওয়া কোম্পানিটি ১০ বছর পর্যন্ত বিনামূল্যে রাডার রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও রাডার অপারেটর এবং সংশিষ্ট প্রকৌশলীসহ আনুমানিক ১৫০ জনকে দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণ দেবে। যারা প্রকল্পটির কার্যাদেশ পাবে- তাদেরকে আগামী ১০ বছর খরচসহ লাভের একটি অংশ দেয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ সরকারের ‘ভিশন-২০২১’ বাস্তবায়নে এগিয়ে যাবে আরও এক ধাপ। নিরাপদ হবে দেশের আকাশসীমা এবং বিমান চলাচল ব্যবস্থা।

খান জাহান আলী বিমানবন্দর ॥ বিমানবন্দরের উন্নয়ন দেশের পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বাগেরহাটের খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের কাজেও হাত দিয়েছে সিভিল এ্যাভিয়েশন। ইতোমধ্যে এ জন্য পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। এরই মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি এসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) বা দরপত্র আহ্বান করে সিভিল এ্যাভিয়েশন। অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ২০১৫ সালের ৫ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ৫৪৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে ২০১৮ সালের জুন নাগাদ। তারপরই বিমানবন্দরের নকশা ও মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুতের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগে ইওআই আহ্বান করে সিভিল এ্যাভিয়েশন। বিআরটিসি ও বুয়েটের সুপারিশের আলোকে ইওআই থেকে পাওয়া প্রস্তাবগুলো খতিয়ে দেখে মূল্যায়ন কমিটি। এখান থেকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করা হয় সাতটি প্রতিষ্ঠানকে। ৪ সেপ্টেম্বর এসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় ধরা হয়েছে আগামী ২৭ অক্টোবর। এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দুু বিকাশ গোস্বামী জানান, খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পটি অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। বর্তমানে পরামর্শক নিয়োগের কাজ চলছে। পাশাপাশি বিমানবন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রমও চলমান। খুব দ্রুত প্রকল্পটির কাজ শুরু ও শেষ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হবে।

জানা যায়- ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত একনেকের সভায় বাগেরহাটের ফয়লায় মংলা-খুলনা মহাসড়কের পাশে হযরত খানজাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। সে সময় এ প্রকল্পের জন্য ৯৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার দ্বিতীয় তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হবার পর একনেকের ২০১৫ সালের ৫ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় খানজাহান আলী বিমানবন্দরের সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। সংশোধিত প্রকল্পে জমির পরিমাণ আরো ৫৩৬ একর বাড়ানো হয়। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকায়। ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণের জন্য বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে এরই মধ্যে ৪৩ কোটি টাকা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। নতুন করে অধিগ্রহণ করা জমির উন্নয়ন ও মাটি ভরাটে ব্যয় হবে ৩০ কোটি ৩২ লাখ টাকা। জেলা প্রশাসনও এরই মধ্যে দাগ নম্বর চিহ্নিত করে অধিগ্রহণযোগ্য জমি সমীক্ষার কাজ শেষ করেছে।

খুলনায় বিমানবন্দর তৈরির জন্য ১৯৬১ সালে খুলনা নগরী থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে ফুলতলার মশিয়ালী এলাকায় স্থান নির্ধারণ করা হয়। ১৯৬৮ সালে ওই পরিকল্পনা বাতিল করে নগরীর তেলিগাতি এলাকায় নতুন স্থান নির্ধারণ করে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। আশির দশকে তৃতীয়বারের মতো স্থান নির্ধারণ করা হয় বাগেরহাটের কাটাখালিতে। চতুর্থ দফায় ১৯৯৬ সালে রামপাল উপজেলার ফয়লা এলাকায় খানজাহান আলী বিমানবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এজন্য খুলনা-মংলা সড়কের পাশে ৯৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৯৬ সালের জুনে সিভিল এ্যাভিয়েশনের কাছে এ জমি হস্তান্তর করে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন। কিন্তু অর্থের অভাবে ওই সময় নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। ১৯৯৭ সালের প্রথম দিকে মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে ছোট আকারের বিমানবন্দরের প্রকল্প বাদ দিয়ে মাঝারি আকৃতির বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয়। এজন্য প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৮৩ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী আবার শুরু হয় অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাটের কাজ। ওই সরকারের আমলে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকার মাটি ভরাটের কাজ হয়। কিন্তু ২০০৬ সালের প্রথম দিকে মাটি ভরাটের কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর বর্তমান সরকারের শুরুর দিকেই আবার চাঙ্গা করা হয় প্রকল্পটি।

সৈয়দপুরে আঞ্চলিক হাব॥ বর্তমান সরকারের আমলে আবারও চালু করা হয় উত্তরাঞ্চলের সৈয়দপুর বিমানবন্দর। প্রতিদিন এখানে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ যাত্রীর সংখ্যা। বর্তমানে নয় শ’ একর জমির ওপর এ বিমানবন্দর। সিভিল এ্যাভিয়েশন এ বিমানবন্দরকে আরও উন্নত করে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। যাতে এখান থেকে কলকাতা, অসম, ভুটান ও নেপালের ফ্লাইট ্পরিচালনা করা যায়। এ অঞ্চলে সঙ্গে আশপাশের দেশগুলোর আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে ব্যবসা বাণিজ্য আরও জোরদার হবে বলে জানান প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী । তিনি জানান- এরই মধ্যে সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরির পরামর্শক নিয়োগের জন্য প্রক্রিয়া চলছে। দরপত্রে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাগজপত্র মূল্যায়ন করা হচ্ছে। শীঘ্রই কার্যাদেশ দেয়া হলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানই চূড়ান্ত করবে কত জমি অধিগ্রহণ করতে হবে, রানওয়ে কত বড় করতে হবে কি ধরনের অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।

সিভিল এ্যাভিয়েশনের পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়- সৈয়দপুর বিমানবন্দর এখন যতটুকু আছে তার দ্বিগুণ সম্প্রসারণ করতে হবে। এ জন্য আরও প্রায় নয় শ’ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। রানওয়ে আরও দ্বিগুণ সম্প্রসারণ করতে হবে। যাতে ৭৩৭ মতো মাঝারি ধরনের এয়ারক্রাফট ওঠানামা করতে পারে।

সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর॥ এদিকে সিলেটের এমএজি ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রানওয়ে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নিরাপদ বিমান চলাচলের জন্য এ দুটো রানওয়ে শক্তিশালী ও সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়ছে। এ দুটো প্রকল্পে কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

১৮৮ কোটি টাকার জাইকা প্রকল্প ॥ এসব প্রকল্প ছাড়াও সম্পূর্ণ জাইকার অর্থায়নে দেশের কয়েকটি বিমানবন্দরের নিরাপদ বিমান চলাচলের জন্য বেশ কিছু সুবিধাসংবলিত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কাজ চলছে। ১৮৮ কোটি এ প্রকল্পে ঢাকার হজরত শাহজালাল বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর, সৈয়দপুর বিমানবন্দর, যশোর বিমানবন্দরে যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ চলছে। আগামী ছয়মাসের মধ্যে এ প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে জাপানীজ বিশেষজ্ঞরা বেশ দ্রুতগতিতে কাজ করছে। এর প্রজেক্ট ডিরেক্টর মাহবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বসানো হচ্ছে একটি অত্যাধুনিকমানের রাডার যা দিয়ে ২০০ নটিক্যাল মাইল দূরের গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করার সক্ষমতা থাকবে। জাপান থেকে এরই মধ্যে সব যন্ত্রপাতি চলে এসেছে। একইভাবে হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নিরাপত্তায় বসানো হচ্ছে এক্সরে মেশিন ও এসিএস। শাহজালালের অগ্নিদুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ফায়ার ফাইটিং ভেহিকলও সরবরাহ করছে জ্ইাকা। সৈয়দপুর ও যশোর বিমানবন্দরের এটিসি সিমুলেটর, ডিভিওআর, এফপিডিএস প্রযুক্তি চালু করা হবে। এ সব সুবিধা নিশ্চিত করা হলে দেশের বিমানবন্দরগুলোর মান অনেকাংশেই বেড়ে যাবে।