দারিদ্র্যজয় দেখে অভিভূত বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট

‘বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী। তারা কোনো কাজেই পিছিয়ে পড়ে না। তাদের অগ্রগতি দেখে আমি মুগ্ধ। আমরা বাংলাদেশে অতিরিক্ত বিনিয়োগ-সহায়তা দেব’Ñ পরিশ্রমের মাধ্যমে হতদরিদ্র মানুষের দারিদ্র্যজয় দেখে অভিভূত বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম একথা বলেছেন। গতকাল মঙ্গলবার বরিশালের বাবুগঞ্জে গিয়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে দেখেন তিনি। এ সময় তিনি প্রকল্পের মাধ্যমে উপকারভোগীদের সঙ্গেও কথা বলেন।

কর্মব্যস্ত দুই দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে গতকাল রাতে ঢাকা ছাড়েন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট। সফরকালে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আগামী ৩ বছরে বিশ্বব্যাংক থেকে নির্ধারিত কোটার অতিরিক্ত আরও ৩০০ কোটি ডলার সহায়তা দেওয়া হবে বাংলাদেশকে। এর মধ্যে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ২০০ কোটি এবং শিশুদের অপুষ্টি দূর করতে আরও ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জিম ইয়ং কিম।

পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য ঋণ-সহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এবারের ‘বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস’ পালন করতে দুদিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। সফর শেষে তার ঢাকা ত্যাগের আগে গতকাল বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয় রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে।

সংবাদে সম্মেলনে জিম ইয়ং কিম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। জলবায়ুর পরিবর্তনে দরিদ্ররাই সবচেয়ে বেশি তির শিকার হচ্ছে।

‘দুর্যোগ প্রশমন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার েেত্র বাংলাদেশ সামনের কাতারে রয়েছে’ মন্তব্য করে বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঝড়, সাইকোন ও বন্যার তি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ যাতে দুর্যোগ প্রশমনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, সেজন্য বিশ্ব ব্যাংক গ্রুপ সহায়তা করার পরিকল্পনা করেছে।

এছাড়া বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে নিয়ে যেতে হলে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নতকরণে কিছু নীতির সংস্কারের কথা বলেন। এরজন্য সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, সরকারি ব্যাংক, রাজস্ব বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে বলে অভিমত দেন তিনি। উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংক কোনো ছাড় দেবে না বলে সংবাদ সম্মেলনে হুশিয়ার করেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুর্নীতির প্রশ্নে আমাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিশ্বের যে কোনো দেশের েেত্র আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি চলমান। ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বিশেষ করে দরিদ্রদের প্রকল্প থেকে অর্থ চুরি বা অন্যত্র খরচের ব্যাপারে কোনোভাবেই ছাড়া দেবে না বিশ্বব্যাংক।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আমাদের অনেক প্রকল্প চলমান। সেগুলো আমরা পর্যবেণ করছি। এেেত্র কোনো প্রকার অনিয়ম-দুর্নীতি যেন না হয়, সে বিষয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভূয়সী প্রশংসা করে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। বাংলাদেশ অনেক ল্য সামনে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এেেত্র সপ্তম-পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেশকিছু পদপে তারা হাতে নিয়েছেÑ এটি ইতিবাচক।

তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে সফল হতে হলে সরকারের ৩টি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ কম আসছে। এজন্য বেসরকারি বিনিয়োগ খাতকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারের গৃহীত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সরকারি সেবা, বিচার বিভাগ, সরকারি বিভিন্ন ব্যাংক, রাজস্ব বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

দুদিনের সফর শেষে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, আমরা (বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধি দল) দুদিন ধরে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সম্পর্কে জেনেছি। এর পর আমরা বলতে পারি, ভবিষ্যতের উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, অধিক থেকে অধিকতর কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং ব্যক্তি-খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে সব ধরনের সহায়তা করব এবং পাশে থাকব। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান, ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ও যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহরিন আহমেদ মাহবুব উপস্থিত ছিলেন।

বরিশাল, বাবুগঞ্জ ও উজিরপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল বরিশালের বাবুগঞ্জ ও উজিরপুরে দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন করে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যজয় দেখে মুগ্ধ বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট।

জিম ইয়ং কিম গতকাল ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে বরিশাল বিমানবন্দরে অবতরণ করেন সকাল সাড়ে ৮টায়। তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস এমপি। সেখান থেকে গাড়িযোগে কিম সকাল ৯টায় দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামে যান। সেখানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘নতুন জীবন’ প্রকল্পের অধীন গ্রাম সমিতির সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।

এ সময় কিম বলেন, যেসব দরিদ্র নারীর জীবন পরিবর্তন হয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে পেরে আমি খুবই খুশি। বিশ্বব্যাংকের প থেকে অর্থায়ন করার আগে এই নারীরা প্রশিণ পাননি, তাদের সন্তানরা স্কুলে যেত না। তারা এখান থেকে প্রশিণ পেয়ে সবজিচাষ, হাঁস-মুরগি পালন, মাছচাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে ভালো আয় করছেন। তাদের সন্তানরা পড়ালেখা করছে এবং তারা উন্নতির দিকে যাচ্ছে। নারীদের উন্নয়ন ও মতায়নে বিশ্বব্যাংকের প থেকে আরও সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র নারীরা আরও উন্নতি করতে পারেন। পরে বিশ^ব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট ও সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (এসডিএফ) সহযোগিতায় দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিসহ গাভি পালন, হাঁস-মুরগি পালন, মাছ ও সবজিচাষের বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে দেখেন। এরপর ১০টা ১৫ মিনিটে পার্শ্ববর্তী উপজেলা উজিরপুরের ভরসাকাঠি গ্রামে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত ভরসাকাঠি প্রাইমারি স্কুল কাম সাইকোন শেল্টার পরিদর্শন করে সেখানে একটি নারিকেল চারা রোপণ করেন। এ সময় তিনি স্কুলের পার্শ্ববর্তী মমতাজ বেগমের বাড়িতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ (সোলার প্যানেল) ব্যবস্থাও পরিদর্শন করেন। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের এ পরিদর্শনের সময় এসডিএফ চেয়ারম্যান এমআই চৌধুরীসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও উপকারভোগীরা উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় কিম বলেন, বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনে মহিলাদের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। তারা হাঁস-মুরগি ও পশুপালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। আমি এসব দেখতে এসেছি।

বেলা পৌনে ১২টায় বরিশাল বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট।

কর্মব্যস্ত দুই দিনের সফর শেষে গতকাল রাতে ঢাকা ছাড়েন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। তিনি বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরবেন বলে জানান। এর আগে গত রোববার বিকালে এমিরেটসের একটি ফাইটে ঢাকায় পৌঁছান কিম। বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন ৯ সদস্য।