শাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। কারণ একটাই, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ আজ এক অনুসরণীয় মডেল হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। ১৭ অক্টোবর ছিল বিশ্বব্যাংক ঘোষিত বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। এই দিবসে সাধারণত প্রতি বছর দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য দেখিয়েছে, এমন একটি দেশকে মডেল হিসেবে উপস্থাপনা করা হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে। গত বছর বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে আফ্রিকার দেশ ঘানায় এই দিবসকে পালন করা হয়। এবার বেছে নেওয়া হল দারিদ্র্য বিমোচনে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখানো বাংলাদেশকে। এর আগে সংস্থাটির চার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করেন। সর্বশেষ রবার্ট জোয়ালিক ২০০৭ সালে সফরে আসেন। অতীতের সফরগুলোর সঙ্গে এবারের সফরের পার্থক্য হচ্ছে অতীতের প্রেসিডেন্টরা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পের পরিদর্শনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সাহায্য নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে সরকারের সামর্থ্য যাচাই করার মধ্যেই তাদের সফর সীমাবদ্ধ রাখলেও এবার সংস্থাটির মূল কর্তাব্যক্তি এসেছেন বাংলাদেশের দারিদ্র্য জয়ের চিত্র নিজের চোখে দেখতে, শিখতে এবং অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তার উপদেশের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ নিয়ে তিনি একটি গণবক্তৃতা করেন। বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি উদ্যোগের প্রশংসা ছিল তার বক্তব্যে।
একসময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ খ্যাত বাংলাদেশ গত এক দশক আগ পর্যন্ত বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি ছাড়া নিজের জাতীয় বাজেট পর্যন্ত যেখানে পেশ করতে পারত না। সেই বাংলাদেশের দিকে আজ তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব। যেখানে সমগ্র পৃথিবীর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের রাজি করানো ছিল এক বিশাল কষ্টসাধ্য বিষয়, আজ সেখানে অনেকটা আমরা না চাইতেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসছে আমাদের কাছে। বিশ্বব্যাংকের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গত এক দশকে বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই তো সেদিন দেশের অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে বাংলাদেশ এখন থেকে আর ছোট কোনো প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য সহজ সুদে বিশ্বব্যাংকের আইডিএর কাছে অর্থ না চেয়ে বড় প্রকল্পের জন্য আইবিআরডির কাছ থেকে বেশি সুদে অর্থায়নের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব করবে, যার অর্থ আমাদের এখন বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সামর্থ্যের পাশাপাশি অধিক ঋণের বোঝা মোকাবেলা করার সামর্থ্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংক নিজেও তা অনুভব করে বলেই সংস্থাটির প্রধান নিজে সফর করে গেলেন কীভাবে সংস্থাটির স্বার্থে বাংলাদেশকে আরও কাছে পাওয়া যায় তা নির্ধারণের জন্য। তার সফরের আগের দিন এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমি গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি বাংলাদেশে যাওয়ার, যে দেশটি এক দশকে দারিদ্র্যসীমায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তাদের এই কৌশল অন্য দেশগুলোও অনুসরণ করতে পারে।’ বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ভবিষ্যত্ বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে এর সম্ভাব্যতা স্বচক্ষে যাচাই করাও তার সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। কারণ এর মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাংক বিশ্বব্যাপী সংস্থাটির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণে বাংলাদেশের সাফল্যকে নিজেদের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে চায়। আর সেজন্যই তিনি এ-ও বলেছেন, ‘আমার জানার খুব আগ্রহ যে বিনিয়োগ ও শাসনব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে বিশ্বব্যাংক কীভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে পারে।’ এই সকল বিষয়ের পাশাপাশি তার নিজের এটাও উপলব্ধি যে সকল কর্মপ্রচেষ্টার সফল বাস্তবায়নে বাংলাদেশের মানবসম্পদ, অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা অর্জন করা অনেক বেশি প্রয়োজন। আর এই উপলব্ধি থেকেই বিশ্বব্যাংক এই সকল খাতেও তাদের সহায়তার ক্ষেত্র আরও বাড়াতে অতীতের চেয়ে অনেক বেশি তত্পর।
জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অনুযায়ী বিশ্বকে দারিদ্র্যমুক্ত করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে। বলা চলে বিশ্বব্যাংকের বড় ধরনের কোনো অর্থায়ন ছাড়াই বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থনৈতিক কৌশল এবং কূটনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে অপরাপর দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা প্রত্যাহারের পরও পদ্মা সেতু নির্মাণে সরকারের দৃঢ় মনোভাব এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এর নির্মাণকাজ এগিয়ে চলা। ২০১১ সাল থেকেই পদ্মা সেতু নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ করে এর অর্থায়নে গড়িমসি করতে থাকার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকার অনেকটা জাতীয় মর্যাদার স্বার্থে নিজ থেকেই বিশ্বব্যাংক থেকে কোনো অর্থ নেওয়া ছাড়াই পদ্মা সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে-সংস্থাটি সম্ভবত এটা কল্পনাও করতে পারেনি। সেই সঙ্গে ইতোমধ্যে পদ্মা সেতুর ২৩ শতাংশ নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়ে গেছে এবং ২০১৮ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ সেতু নির্মাণ সমাপ্ত করার কাজ যখন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে, এ অবস্থার মধ্য দিয়েই গত বছর বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে একটি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে বলে স্বীকৃতি দানের মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত নীতি এবং সিদ্ধান্তসমূহ যে যথার্থ ছিল তার একটা স্বীকৃতিও এর মধ্য দিয়ে পরোক্ষভাবে হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য অনুযায়ী জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার কমে বর্তমানে তা ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে দারিদ্র্যমুক্ত করা। সেই লক্ষ্যে যে সকল কর্মপরিকল্পনা অব্যাহত রয়েছে তা নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই বাংলাদেশকে একটি দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের উদ্দেশ্য হচ্ছে অতীতের সকল তিক্ততা ভুলে গিয়ে সম্পর্ককে আবার সহজ এবং স্বাভাবিক করে তোলা।
আর সেজন্যই গত অর্থবছর থেকেই সংস্থাটি বাংলাদেশে অন্য বছরগুলোর তুলনার প্রকল্প সাহায্য আরও বৃদ্ধি করেছে। অতীতে যেখানে বিভিন্ন প্রকল্প মিলে এক অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন পাওয়া সম্ভব হতো না, সেখানে গত অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ হচ্ছে ১.৬ বিলিয়ন ডলার। সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করে গত ২ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে অতিদারিদ্র্যের হার কমেছে ১২.৯ শতাংশ, যা ২০০৫ সালেও ছিল ৪৩.৩ শতাংশ; অর্থাত্ সংখ্যার হিসাবে অতিদারিদ্র্যের সংখ্যা কমেছে ২ কোটি ৮০ হাজার এবং বর্তমানে আরও ১২.৯ শতাংশ লোক রয়েছে, যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং যাদের দৈনিক আয় ১.৯ ডলার বা ১৪৮ টাকার কম। দারিদ্র্যের হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, পাকিস্তান এবং ভুটানকেও পেছনে ফেলেছে বলে বিশ্বব্যাংকের অভিমত। দেশটিতে ১৯৯০ সালের তুলনায় কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু রোধে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে, আর তৈরি পোশাক রফতানিতে চীনের পর বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রয়োজন নিজের স্বার্থেই এই সকল কাজের স্বীকৃতি দেওয়া। আর তাই সফরের দ্বিতীয় দিনে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে শিশুপুষ্টি খাতে বাংলাদেশকে আগামী ২ বছরে আরও ৮ হাজার কোটি টাকা সহায়তার আশ্বাস ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বাংলাদেশের অব্যাহত প্রচেষ্টায় সংস্থাটির পক্ষ থেকে আরও অধিকতর বিনিয়োগের আগ্রহ দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর ভাষায় বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে চেয়েছিল, সেই একই পরিমাণ অর্থ অন্য প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ করবে, যা এক অর্থে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বব্যাংকের নয়, বরং বিশ্বব্যাংকের প্রতি বাংলাদেশের আস্থা ফিরিয়ে আনার এক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক সম্ভবত পদ্মা সেতু সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে সংস্থাটি নিয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে সেটা অনেকটা দূর করার জন্যই বাংলাদেশকে ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আমাদের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই দিনে ঢাকায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে দারিদ্র্য বিমোচন দিবসের আলোচনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের সাফল্যকে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। সেই সঙ্গে জাতিসংঘ ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অনুসরণ করে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে অতিদারিদ্র্য সম্পূর্ণভাবে রোধ করতে পারবে বলে তার অভিমত প্রকাশ করেন।
জিম ইয়ং কিম শিখতে এসেছিলেন বাংলাদেশের দারিদ্র্য জয়ের অভিজ্ঞতা। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিলেন বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার এক দেশ। সত্যিই তো তাই, দুইশ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার বেড়াজাল ভেদ করে, ২৪ বছর পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, এমনকি স্বাধীনতা অর্জনের পরও বারবার অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েও বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আজকের এই অর্জন-এটা কেবল বাংলাদেশের মানুষের পক্ষেই সম্ভব। আর তাই কেবল বিশ্বব্যাংক নয়, সমগ্র পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে আজ এক বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে, যে দেশে একের পর এক সফর করছেন বিশ্বনেতারা, অর্থের ডালা নিয়ে আসছেন বিনিয়োগের জন্য এবং সেই সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য। এই তো মাত্র বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সফরের আগের দিন বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন চীনের প্রেসিডেন্ট। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ২৭টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হল, যেখানে আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। গত ১৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের গোয়াতে ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ সম্মেলনে যোগদান করলেন। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বিমসটেকের সদস্য দেশগুলোর আরও বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ সেখানে সমাদৃত হয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতে রাশিয়া বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সেদেশে ভিসামুক্ত চলাচলের অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়া আগামী বছরের প্রথমদিকে বাংলাদেশ সফরে আসছেন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সম্পর্কের একটি নতুন দিগন্ত সেই সময় উন্মোচন হতে পারে বলে অনেকের বিশ্বাস।
জিম ইয়ং কিমের ৩ দিনের সফরের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় দ্বিতীয় দিন অর্থাত্ ১৭ অক্টোবর। সেদিন তিনি জাতির জনকের স্মৃতি বিজড়িত ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে তার সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। তারপরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর দারিদ্র্য বিমোচন দিবসের অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। সফরের শেষদিনে তিনি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বরিশালের প্রত্যন্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। সবশেষে সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তার সফরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন। এ প্রসঙ্গে তার সফরকে যদি একটু ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা হয় তবে বলা যায়, বিশ্বব্যাংক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলেও এতি রাজনীতির বাইরে নয়। কারণ, এর মূল অর্থের জোগানদাতা এবং পরিচালনার দায়িত্ব হচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোর। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যখন আমাদের টানাপড়েন শুরু হয় তখন সময়টা ২০১১ সাল।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন বেশ উত্তপ্ত, পশ্চিমা দেশগুলোর কেউ কেউ নানা অজুহাতে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে শুরু করেছে এবং দেশের তত্কালীন প্রধান বিরোধী দল ওই সকল দেশের সঙ্গে এক ধরনের সম্পর্ক বজায় রেখে পরবর্তী নির্বাচনোত্তর সময়ে নিজেরা সরকার গঠন করলে কতটুকু কার স্বার্থে কাজ করবে তার একটা খসড়া রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে। ঠিক এই সময় পদ্মা সেতু ইস্যুতে বিগড়ে গেল বিশ্বব্যাংক। বিরোধী দলও যেন একটা মোক্ষম সুযোগ পেয়ে বসল, কিন্তু তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় সিদ্ধান্তে পাল্টে গেল সব দৃশ্যপট, আমরা নিজেরাই বর্জন করলাম বিশ্বব্যাংকের সহায়তা। আজ যখন চীন, ভারত, রাশিয়াসহ বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকটা প্রথাগত ধারার বাইরে তখন আমরা দেখতে পাই খোদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেন, সরকারের অর্জনের প্রশংসা করেন, নানা ক্ষেত্রে উন্নয়নে সহযোগিতার আশ্বাস আসে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সফর। তবে যার যা-ই উদ্দেশ্য থাকুক না কেন, বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে বাংলাদেশের মতো করেই। আজও আমরা আর কারও কাছে মাথা নোয়াবার নই।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। সভঁষশধ—ুধযড়ড়.পড়স