বিশ্বব্যাংক প্রধানের সফর দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য ও স্বীকৃতি

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টদের সফরসূচিতে বাংলাদেশের নাম ঘন ঘন না এলেও বিরল নয়; বিভিন্ন সময়েই বিশ্বের বৃহত্তম এই অর্থকরী প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন প্রধানরা ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু সংস্থাটির পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের এবারের সফর নানা দিক থেকেই বিশেষ তাৎপর্যবাহী। আমরা জানি, নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পেঁৗছেছিল। দীর্ঘ টানাটানির পর একপর্যায়ে প্রকল্প থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করেছিল সংস্থাটি। বৃহত্তম অর্থায়নকারী সংস্থার পিছু হটার পর দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা শঙ্কা তৈরি হলেও প্রায় সবাইকে বিস্মিত করে নিজস্ব অর্থায়নেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নিয়ে চলছে বাংলাদেশ। আমরা আশা করছি, এই সফর দুই পক্ষের জন্যই পদ্মা সেতুর ‘তিক্ত’ স্মৃতি কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে। বস্তুত ‘কেন্দ্র থেকে মাঠ’ পর্যায়ের এই তিন দিনের সফরের আগেই তার সংকেত নানাভাবেই মিলেছে। আমরা দেখেছি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সংস্থাটি বাংলাদেশকে রেকর্ড ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। ঢাকায় নেমে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশকে ঋণ সহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়ানো ছাড়াও অপুষ্টি রোধে আগামী তিন বছরে একশ’ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার ঘোষণা ভবিষ্যতে দুই পক্ষের ঘনিষ্ঠতর ও সম্প্রসারিত সম্পর্কেরই সংকেত বলে আমরা মনে করি। মঙ্গলবার উপকূলীয় অঞ্চল সফর শেষে ঢাকায় ফিরে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা সংক্রান্ত প্রকল্পে যেভাবে দুইশ’ কোটি ডলারের সহায়তার ‘ব্যক্তিগত’ প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তা এবারের সফরে এসে বাংলাদেশের ব্যাপারে তার মুগ্ধতারই প্রমাণ। তার চোখে অবশ্যই মুগ্ধকর দারিদ্র্য বিমোচনে আমাদের সাফল্য। যে কারণে বাংলাদেশ সফরের উপলক্ষ হিসেবে তিনি বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবসকে বেছে নিয়েছিলেন নিজেদের আগ্রহেই। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য সারাবিশ্বের জন্যই শিক্ষণীয়, অন্যদের জন্য অনুসরণীয়। আমরা দেখেছি, বিশ্বব্যাংকের হিসাবেই বাংলাদেশে অতিদারিদ্র্যের হার মাত্র ছয় বছরে ১৮ শতাংশ থেকে কমবেশি ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। দারিদ্র্য নিরসনের এই সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব যে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে, তাও মুক্তকণ্ঠে বলেছেন বিশ্বব্যাংকপ্রধান। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতি তার এবারের সফর। কিন্তু ভুলে যাওয়া চলবে না, ১৬ কোটির বেশি মানুষের দেশে ১২ শতাংশ অতিদরিদ্রও সংখ্যার দিক থেকে কম নয়। এটাও সত্য যে, বাংলদেশের মানুষের মধ্যে যে অমিত সম্ভাবনা রয়েছে, উপযুক্ত নেতৃত্ব পেলে নিজের দেশকে তারা মর্যাদা ও গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারে। যে জাতি মাত্র নয় মাসে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পারে, তারা দারিদ্র্যের দৈত্যকেও পরাভূত করতে বেশি সময় নেবে না।